মো. রেজাউর রহিম
প্রকাশ : ১৬ নভেম্বর ২০২৫ ১২:১০ এএম
ছবি- সংগৃহীত
আগামী ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিতব্য ‘জাতীয় সংসদ নির্বাচন’ এবং ‘গণভোট’ সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করতে প্রশাসনে নানা পরিবর্তন ও পুনর্বিন্যাসের কাজ করছে সরকার। সরকারের লক্ষ্য যে কোনো মূল্যে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ‘গ্রহণযোগ্য’ ও সুষ্ঠু এবং সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ নির্বাচন। যদিও একইদিনে সংসদ নির্বাচন এবং গণভোট অনুষ্ঠানের বিষয়টি নিয়ে বড় রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এখনও ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
তবে ফেব্রুয়ারির আসন্ন নির্বাচনকে সুষ্ঠু ও সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ করতে মাঠ ও কেন্দ্রীয় প্রশাসনে ব্যাপক পরিবর্তনের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। গত সপ্তাহে মাঠ প্রশাসনে ২০ জন ডিসিকে রদবদল ও পুনবিন্যাস করা হয়েছে। এছাড়া কেন্দ্রীয় প্রশাসনেও শিগগির আরো ‘বড় পরিবর্তন’ করা হবে বলে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে জানা গেছে। আর নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণেও সরকার বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করবে। আর এসব পরিবর্তনের মূল কারণ সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজন ও সম্পন্ন করা।
প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের একটি সূত্র জানায়, অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের এখন মূল লক্ষ্য ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় সংসদ এবং গণভোট সূষ্ঠুভাবে আয়োজন ও সম্পন্ন করা। এজন্য মাঠ ও কেন্দ্রীয় পর্যায়ে বিতর্কিত এবং ফ্যাসিস্ট আওয়ামী আমলে সুবিধাপ্রাপ্ত কোন কর্মকর্তাকে কোন ‘গুরুত্বপূর্ণ’ পদে না রাখার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এজন্য প্রয়োজন হলে প্রশাসনে যে কোনো ধরনের পরিবর্তন করা হবে।
এদিকে, গত বৃহস্পতিবার অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে আগামী ফেব্রুয়ারি মাসে একইদিনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং গণভোটের ঘোষণা দিয়েছেন। এ অবস্থায় সময় খুব বেশি না থাকায় প্রশাসনে দ্রুত প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনা হচ্ছে।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এ ব্যাপারে ভোরের আকাশকে জানান, আগামী ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং গণভোট যেকোনো মূল্যে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে আয়োজন করার বিষয়ে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের কঠোর নির্দেশনা রয়েছে। এছাড়া প্রশাসনে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন ও পুনর্বিন্যাসের বিষয়টি নিয়মিত প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে মনিটরিং করা হচ্ছে। এছাড়া নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে আয়োজন এবং আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পুলিশ প্রশাসনেও বড় পরিবর্তন চলছে।
তিনি জানান, মাঠ পর্যায়ের পরিবর্তন এবং পুনর্বিন্যাস সম্পন্ন হওয়ার পর কেন্দ্রীয় প্রশাসনে সচিব, অতিরিক্ত সচিব, যুগ্মসচিব এবং উপসচিব পদের পাশাপাশি বিভিন্ন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক পর্যায়েও প্রয়োজনীয় পরিবর্তন ও পুনর্বিন্যাসের কাজ সম্পন্নের জন্য প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে নির্দেশনা রয়েছে।
এদিকে মাঠ প্রশাসনে বড়ধরনের পরিবর্তনের পর গত বৃহস্পতিবার রাতে বিভিন্ন জেলা থেকে প্রত্যাহারকৃত ২০ জন জেলা প্রশাসককে (ডিসি) বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগে উপসচিব হিসেবে পদায়ন করা হয়েছে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে গত বৃহস্পতিবার রাতে এ সংক্রান্ত দুটি পৃথক প্রজ্ঞাপনও জারি করা হয়েছে।
জানা গেছে, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের জারিকৃত প্রথম প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী-চাঁপাইনবাবগঞ্জের ডিসি মোহাম্মদ সোলায়মানকে পরিকল্পনা বিভাগে, মুন্সীগঞ্জের ডিসি ফাতেমা তুল জান্নাতকে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ে, নওগাঁর ডিসি মোহাম্মদ আব্দুল আউয়ালকে কৃষি মন্ত্রণালয়ে, খাগড়াছড়ির ডিসি এবিএম ইফতেখারুল ইসলাম খন্দকারকে স্বাস্থ্য সেবা বিভাগে, লক্ষ্মীপুরের ডিসি রাজীব কুমার সরকারকে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে, চট্টগ্রামের ডিসি সাইফুল ইসলামকে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ে, নেত্রকোনার ডিসি মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ জামানকে ভূমি মন্ত্রণালয়ে এবং কুমিল্লার ডিসি মো. আমিরুল কায়সারকে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগে পদায়ন করা হয়েছে।
এছাড়া গত বৃহস্পতিবার রাতের পৃথক আরেকটি প্রজ্ঞাপন প্রজ্ঞাপনে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়-পাবনার ডিসি মোহাম্মদ মফিজুল ইসলামকে ভূমি মন্ত্রণালয়ে, রংপুরের ডিসি মোহাম্মদ রাবিউল ফয়সালকে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগে, মাদারীপুরের ডিসি আফছানা বিলকিসকে কৃষি মন্ত্রণালয়ে, বাগেরহাটের ডিসি আহমেদ কামরুল হাসানকে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ে, যশোরের ডিসি মো. আজহারুল ইসলামকে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগে, ভোলার ডিসি মো. আজাদ জাহানকে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ে, মো. ইসরাইল হোসেনকে স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগে, কুড়িগ্রামের ডিসি সিফাত মেহনাজকে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগে, বরগুনার ডিসি মোহাম্মদ শফিউল আলমকে স্থানীয় সরকার বিভাগে, সিরাজগঞ্জের ডিসি মুহাম্মদ নজরুল ইসলামকে বিদ্যুৎ বিভাগে, বরিশালের ডিসি মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেনকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে এবং রাঙামাটির ডিসি মোহাম্মদ হাবিব উল্লাহকে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ে পদায়ন করা হয়েছে। জনস্বার্থে জারি করা এসব আদেশ অবিলম্বে কার্যকর হবে বলেও প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়েছে।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্র জনায়, মাঠ প্রশাসনের এসব পরিবর্তন এবং পুনর্বিন্যাসের কাজসম্পন্ন হলে বেশ কয়েকজন সচিব পদমর্যাদার কর্মকর্তাকে তাদের দপ্তর পরিবর্তন করা হতে পারে। এছাড়া বেশ কয়েকজন কর্মকর্তাকে অবসরেও পাঠানো হতে পারে। পাশাপাশি অতিরিক্ত সচিব পদমর্যাদার এবং বেশ কয়েকটি অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) পদেও পরিবর্তন আনার জন্য প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের নিদেশনা রয়েছে।
এছাড়া যুগ্মসচিব এবং উপসচিব পদমর্যাদার বেশ কিছুসংখ্যক কর্মকর্তার দপ্তর পরিবর্তন ও পুনর্বিন্যাসের কাজও চলছে। তবে এসব ক্ষেত্রে আওয়ামী ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে সুবিধাপ্রাপ্ত এবং ‘ভালো পোস্টিং’ এ থাকা কর্মকর্তাদের বড় ধরনের রদবদল করা হবে বলে জানান জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা।
তিনি জানান, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মূল লক্ষ্য জনবান্ধব এবং নিরপেক্ষ, সৎ ও মেধাবী কর্মকর্তাদের মূল্যায়ন করা। এছাড়া আগামী নির্বাচন ও গণভোট সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে আয়োজন ও সম্পন্নের বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার মাঠ ও কেন্দ্রীয় প্রশাসনে এসব পরিবর্তন করছে।
নির্বাচনকালে ৯ দিনের জন্য বিশেষ আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা : স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা
এদিকে, স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেছেন, আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে ৯ দিনের জন্য বিশেষ আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা কার্যকর করা হবে।
স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, নির্বাচনের আগে পাঁচ দিন, নির্বাচনের দিন এবং পরে আরও তিন দিন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মাঠে কঠোর অবস্থানে থাকবে। প্রয়োজন হলে দেশের পরিস্থিতি অনুযায়ী সময়সীমা ‘সমন্বয়’ করা হতে পারে বলেও জানান তিনি। গতকাল শনিবার দুপুরে পটুয়াখালী সার্কিট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী এসব কথা বলেন।
উপদেষ্টা বলেন, বর্তমানে ৩০ হাজার সেনা সদস্য মাঠে থাকলেও নির্বাচনের সময় তা বাড়িয়ে প্রায় এক লাখ করা হবে। এছাড়া প্রায় দেড় লাখ পুলিশ সদস্য, ৩৫ হাজার বিজিবি সদস্য, পাঁচ হাজার নৌবাহিনীর সদস্য, চার হাজার কোস্টগার্ড সদস্য, আট হাজার র্যাব সদস্য এবং আনুমানিক সাড়ে পাঁচ লাখ আনসার সদস্য নির্বাচনী দায়িত্ব পালন করবেন। নিরাপত্তা জোরদারে আনসার সদস্যদের অস্ত্র ও বডি ক্যামেরা সরবরাহ করা হবে। এ সময় নির্বাচন খুবই শান্তিপূর্ণ ও নিরপেক্ষভাবে অনুষ্ঠিত হবে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
ভোরের আকাশ/এসএইচ