ডেঙ্গু নয়, তবু ডেঙ্গুর মতো উপসর্গে মৃত্যু, বাড়ছে উদ্বেগ

ছবি: সংগৃহীত
প্রচণ্ড জ্বর, হঠাৎ রক্তচাপ কমে যাওয়া, শরীর দুর্বল হয়ে পড়া, প্লাটিলেট কমে যাওয়া, জন্ডিস এবং শেষ পর্যন্ত কিডনিসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ বিকল হয়ে যাওয়া—সব উপসর্গই ছিল ডেঙ্গুর মতো। কিন্তু একাধিকবার পরীক্ষায় ডেঙ্গু নেগেটিভ আসায় চিকিৎসা নিয়ে তৈরি হয় জটিলতা। শেষ পর্যন্ত পাঁচ দিনের লড়াই শেষে মারা যান চট্টগ্রামের এক নারী।
চিকিৎসকদের একটি অংশ বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে এমন কিছু রোগী পাওয়া যাচ্ছে, যাদের শরীরে ডেঙ্গুর প্রায় সব ক্লিনিক্যাল লক্ষণ থাকলেও পরীক্ষার ফল আসছে নেগেটিভ। এতে রোগ শনাক্তকরণ ও চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় জটিলতা তৈরি হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত গবেষণা প্রয়োজন।
ঘটনাটি ঘটে গত ২১ জুলাই। চট্টগ্রামের দেওয়ানহাট এলাকার ওই নারী হঠাৎ প্রচণ্ড জ্বরে আক্রান্ত হন। শুরুতে জ্বর নিয়ন্ত্রণে তিনি প্যারাসিটামল জাতীয় ওষুধ সেবন করেন। পরে রোববার দুপুরের পর তার শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি হতে থাকে। শরীর নিস্তেজ হয়ে গেলে পরিবারের সদস্যরা স্থানীয় এক ওষুধ বিক্রেতাকে বাসায় নিয়ে আসেন। তিনি পরীক্ষা করে দেখতে পান, রোগীর রক্তচাপ অস্বাভাবিকভাবে কমে গেছে।
এরপর তাকে চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হলেও ডেঙ্গু পরীক্ষার ফল আসে নেগেটিভ। রোগীর শরীরে পর্যাপ্ত ফ্লুইড দেওয়া হলেও রক্তচাপ স্বাভাবিক হচ্ছিল না। পরে রক্তচাপ বাড়ানোর জন্য ওষুধ দেওয়া হয়।
২৪ জুলাই রক্ত পরীক্ষায় প্লাটিলেটের মাত্রা কমে যাওয়ার বিষয়টি ধরা পড়ে। এরপর প্লাটিলেট বাড়াতে সহায়ক ওষুধ শুরু করা হয়। তবে পরিবারের সদস্যরা লক্ষ্য করেন, পরদিন থেকেই রোগীর শরীর হলুদ হয়ে যায়। পরীক্ষায় ধরা পড়ে জন্ডিস। ওই সময় তার বিলিরুবিনের মাত্রা ছিল ২৪, যা স্বাভাবিক মাত্রার তুলনায় অনেক বেশি।
চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালে অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় এবং অতিরিক্ত ফ্লুইড দেওয়ার পর হার্টের জটিলতা দেখা দিলে তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সিসিইউতে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে কিছু সময় রাখার পর তাকে ডেঙ্গু ওয়ার্ডে পাঠানোর পরামর্শ দেওয়া হয়। যদিও ডেঙ্গু পরীক্ষার ফল ছিল নেগেটিভ।
পরে ডেঙ্গু ওয়ার্ডে গেলে যাচাই শেষে তাকে মেডিসিন ওয়ার্ডে রাখার কথা বলা হয়। আবার মেডিসিন ওয়ার্ড থেকে তাকে ডেঙ্গু ওয়ার্ডে পাঠানোর পরামর্শ দেওয়া হয়। এভাবে চিকিৎসা নিয়ে এক ধরনের অনিশ্চয়তার মধ্যে কেটে যায় একটি দিন। পরিবারের অভিযোগ, রোগীর সব লক্ষণ ডেঙ্গুর মতো হলেও শুধুমাত্র পরীক্ষার ফল নেগেটিভ হওয়ায় পূর্ণাঙ্গ ডেঙ্গু চিকিৎসা পাওয়া নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়।
এরপর বৃহস্পতিবার বিকেলে রোগীর প্রস্রাব বন্ধ হয়ে যায় এবং তিনি অচেতন হয়ে পড়েন। উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে নগরীর একটি বেসরকারি হাসপাতালের আইসিইউতে নেওয়া হয়। সেখানে ডায়ালাইসিস শুরু করা হলেও একপর্যায়ে তার শরীরের একাধিক অঙ্গ বিকল হয়ে পড়ে। শুক্রবার বিকেলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের এক বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বলেন, বর্তমানে কিছু রোগীর ক্ষেত্রে এনএস-১, এমনকি আইজিজি-আইজিএম পরীক্ষাতেও ডেঙ্গু শনাক্ত হচ্ছে না। অথচ রোগীর শরীরে ডেঙ্গুর সব ধরনের উপসর্গ দেখা যাচ্ছে। ফলে সঠিক সময়ে চিকিৎসা শুরু করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
তিনি বলেন, এ ধরনের ঘটনা বাড়ছে। তবে এর কারণ জানতে গবেষণা প্রয়োজন। এটি ভাইরাসের পরিবর্তনজনিত কারণে হচ্ছে, নাকি ব্যবহৃত পরীক্ষার কিটের মান বা সংরক্ষণ ব্যবস্থার সমস্যার কারণে হচ্ছে, তা নিশ্চিত নয়। এ বিষয়ে মেডিসিন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহ বলেন, অনেক সময় পরীক্ষায় ডেঙ্গু নেগেটিভ এলেও রোগীর শরীরে ডেঙ্গু থাকতে পারে। তাই চিকিৎসকদের রোগীর উপসর্গ ও শারীরিক অবস্থার ওপর ভিত্তি করে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দিতে হবে।
তিনি আরও বলেন, ডেঙ্গু ভাইরাসের ধরনে পরিবর্তন আসতে পারে। তবে পরীক্ষায় নেগেটিভ ফল আসার প্রকৃত কারণ জানতে অবশ্যই গবেষণা প্রয়োজন। এদিকে দেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক রয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে আরও তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে চলতি মাসে ডেঙ্গুতে মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩৫ জনে। চলতি বছরে এ পর্যন্ত মোট মৃত্যু হয়েছে ৫৩ জনের।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ৪৬৭ জন ডেঙ্গু রোগী দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ জুলাই পর্যন্ত হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৫ হাজার ১৫৭ জনে। এর মধ্যে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ১৩ হাজার ৯৩৫ জন। বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ১ হাজার ১৬৯ জন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গতকাল মারা যাওয়া তিনজনের মধ্যে একজন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন, একজন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এবং একজন খুলনা সিটি করপোরেশনের বাইরের এলাকার বাসিন্দা। ২০০০ সাল থেকে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী ও মৃত্যুর তথ্য সংরক্ষণ করছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এর মধ্যে ২০২৩ সালে সর্বোচ্চ ৩ লাখ ২১ হাজার ১৭৯ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হন এবং ওই বছরই সর্বোচ্চ ১ হাজার ৭০৫ জনের মৃত্যু হয়।
ভোরের আকাশ/সু.পা



