হাম আক্রান্ত শিশুদের ৮৫% টিকাবিহীন
হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আক্রান্ত ৫৯% শিশু

ছবি: সংগৃহীত
দক্ষিণ বাংলাদেশের সাম্প্রতিক হামের প্রাদুর্ভাব নিয়ে করা এক গবেষণায় উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে। গবেষণায় দেখা গেছে, হাম আক্রান্ত শিশুদের বড় একটি অংশ সরাসরি আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে নয়, বরং অন্য রোগের চিকিৎসা নিতে গিয়ে স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র, ক্লিনিক ও হাসপাতালে সংক্রমিত হয়েছে। ৩০০ শিশুর ওপর পরিচালিত গবেষণায় ৫৯ দশমিক ৪ শতাংশ শিশুর ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে যাওয়ার পর হামে আক্রান্ত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।
বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের (চমেক) প্রধান কনফারেন্স হলে ‘মেজার্স আউটব্রেক ২০২৬-ইন সাউদার্ন বাংলাদেশ’ শীর্ষক গবেষণার ফলাফল প্রকাশ অনুষ্ঠানে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, আক্রান্ত শিশুদের ৪৮ শতাংশের বয়স ৯ মাসের কম। অর্থাৎ, নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে হামের প্রথম টিকা নেওয়ার বয়স হওয়ার আগেই এসব শিশু সংক্রমিত হয়েছে। আক্রান্ত শিশুদের ৮৫ দশমিক ২ শতাংশ ছিল সম্পূর্ণ টিকাবিহীন। তাদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ তীব্র অপুষ্টিতে ভুগছিল।
চট্টগ্রাম অঞ্চলের সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ৩০০ হাম আক্রান্ত শিশুকে নিয়ে এপিডেমিওলজিক্যাল, ক্লিনিক্যাল ও জিনোমিক গবেষণাটি পরিচালনা করা হয়।
গবেষণাটি করেছে এসপেরিয়া হেলথ রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন (এআরএফ)। এটি প্রতিষ্ঠানটির তৃতীয় বৃহৎ গবেষণা উদ্যোগ। গবেষণায় অংশীদার ছিল চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক) ও চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের পেডিয়াট্রিক রিসার্চ গ্রুপ। গবেষণা প্রকল্পে আর্থিক ও লজিস্টিক সহায়তা দিয়েছে বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড।
গবেষণার ফলাফল উপস্থাপন করেন প্রধান গবেষক চমেকের শিশুস্বাস্থ্য বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. কামরুন নাহার ও সহযোগী গবেষক ডা. সেলিনা হক।
টিকা নেওয়ার আগেই আক্রান্ত
বাংলাদেশের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) অনুযায়ী, শিশুর ৯ মাস বয়সে হামের প্রথম ডোজ এমআর টিকা ও ১৫ মাস বয়সে দ্বিতীয় ডোজ দেওয়ার নিয়ম রয়েছে। তবে গবেষণায় অংশ নেওয়া ৩০০ শিশুর মধ্যে ১১৪ জনের বয়স ছিল ৯ মাসের কম। আক্রান্তদের মধ্যে এক মাসের কম বয়সী শিশুও ছিল।
গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত শিশুদের বয়স ছিল ২ মাস থেকে ১১ বছর পর্যন্ত। অর্থাৎ, টিকাদানের নির্ধারিত বয়সে পৌঁছানোর আগেই আক্রান্ত হওয়া শিশুর সংখ্যা এই প্রাদুর্ভাবে উল্লেখযোগ্য। গবেষণায় অংশ নেওয়া শিশুদের ১৯৮ জন বা ৭৫ দশমিক ৫ শতাংশ এসেছে গ্রামাঞ্চল থেকে। আর ১২৭ জন বা ৬০ দশমিক ৮ শতাংশ ছিল নিম্ন আর্থসামাজিক স্তরের পরিবারের শিশু।
গবেষকদের ধারণা, গ্রামীণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে টিকাদানের ঘাটতি, দারিদ্র্য এবং স্বাস্থ্যসেবায় সীমিত সুযোগ এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
টিকা না নেওয়ার কারণ
গবেষণায় দেখা যায়, ৩০০ শিশুর মধ্যে ১৬৭ জন অর্থাৎ ৮৫ দশমিক ২ শতাংশ ছিল সম্পূর্ণ টিকাবিহীন। তাদের মধ্যে ৪৬ জনের বয়স ছিল টিকাদানের নির্ধারিত বয়সের নিচে।
টিকা নেওয়ার উপযুক্ত বয়স হওয়ার পরও যেসব শিশু টিকা নেয়নি, তাদের টিকা না নেওয়ার কারণও খতিয়ে দেখা হয়েছে। এতে ৫২ দশমিক ৬ শতাংশ শিশুর ক্ষেত্রে সচেতনতার অভাব বা নির্ধারিত তারিখ ভুলে যাওয়ার বিষয়টি সামনে এসেছে। ৩০ শতাংশ শিশুর ক্ষেত্রে টিকা দেওয়ার সময় তারা সাময়িকভাবে অসুস্থ ছিল। ৮ দশমিক ৯ শতাংশের ক্ষেত্রে মায়ের অসুস্থতা এবং ৪ দশমিক ৬ শতাংশের ক্ষেত্রে ইপিআই কার্ড হারিয়ে যাওয়া বা নষ্ট হয়ে যাওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।
অপুষ্টিতে বাড়ছে জটিলতা
হাম আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে ৩১ দশমিক ৯ শতাংশ তীব্র অ্যাকিউট অপুষ্টিতে ভুগছিল। গবেষণার ফলাফলে গুরুতর জটিলতার সঙ্গে তীব্র অপুষ্টির সম্পর্কও পাওয়া গেছে।
গত ছয় মাসে সরকারি ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল পেয়েছিল মাত্র ৩২ দশমিক ১ শতাংশ বা ৬৩ জন শিশু। যারা ভিটামিন ‘এ’ পায়নি, তাদের ৫৯ শতাংশের মধ্যে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়াসহ গুরুতর শারীরিক জটিলতা দেখা গেছে। গবেষকেরা তীব্র অপুষ্টিকে হাম আক্রান্ত শিশুদের গুরুতর জটিলতার অন্যতম প্রধান স্বাধীন কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
চিকিৎসা নিতে গিয়ে সংক্রমণ
গবেষণার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো হামের সম্ভাব্য সংক্রমণস্থল। আক্রান্ত ৩০০ শিশুর মধ্যে মাত্র ৩২ জন বা ১৬ দশমিক ৩ শতাংশের ক্ষেত্রে আগে সরাসরি হাম আক্রান্ত রোগীর সংস্পর্শে আসার তথ্য নিশ্চিত করা গেছে।
অন্যদিকে, ৫৯ দশমিক ৪ শতাংশ শিশু অন্য রোগের চিকিৎসার জন্য কোনো না কোনো স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র, ক্লিনিক বা হাসপাতালে যাওয়ার পর হামে আক্রান্ত হয়েছে বলে গবেষণায় উঠে এসেছে।
এই তথ্য হাসপাতাল ও অন্যান্য স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে আরও গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছে। দ্রুত রোগী শনাক্ত করা, সংক্রমিত রোগীকে আলাদা রাখা এবং স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে পর্যাপ্ত বায়ু চলাচল নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন গবেষকেরা।
ভাইরাসের একই জিনোটাইপ
গবেষণায় হামের ভাইরাসের জিনোম বিশ্লেষণও করা হয়েছে। আক্রান্ত শিশুদের নমুনার হোল জিনোম সিকোয়েন্সিংয়ে ১০০ শতাংশ ক্ষেত্রে ‘বি-৩’ জিনোটাইপ শনাক্ত হয়েছে।
গবেষকেরা জানান, এর আগে আইইডিসিআর ও আইসিডিডিআর,বি’র গবেষণাতেও বাংলাদেশে বি-৩ জিনোটাইপের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। বর্তমান গবেষণার ফলাফলও সেই ধারাবাহিকতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। গবেষকদের ভাষ্য, গবেষণাকালীন সময়ে বিদেশ থেকে নতুন কোনো হামের স্ট্রেইন দেশে প্রবেশ করেছে—এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
টিকা নেওয়া শিশুদের মধ্যে মৃত্যু নেই
গবেষণায় মায়েদের হামের বিরুদ্ধে রোগ প্রতিরোধক্ষমতার বিষয়টিও পরীক্ষা করা হয়েছে। পরীক্ষা করা ১১ জন মায়ের মধ্যে ৯৪ দশমিক ৮ শতাংশের মিজলস আইজিজি পজিটিভ পাওয়া গেছে।
তবে মায়ের মেটারনাল আইজিজি স্ট্যাটাসের সঙ্গে শিশুর নিউমোনিয়া বা অতি-তীব্র জটিলতার সরাসরি পরিসংখ্যানগত তাৎপর্য পাওয়া যায়নি। যেসব মায়ের হামের টিকা নেওয়ার ইতিহাস ছিল না, তাদের ৫৫ শতাংশ শিশুর গুরুতর জটিলতা দেখা গেছে। আর যেসব মায়ের আইজিজি নেগেটিভ ছিল, তাদের ৪০ শতাংশ শিশুর গুরুতর জটিলতা হয়েছিল।
গবেষণায় টিকাদানের সঙ্গে মৃত্যুর একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্কও পাওয়া গেছে। আগে হামের অন্তত একটি টিকা নেওয়া শিশুদের মধ্যে কোনো মৃত্যু হয়নি। অন্যদিকে, টিকাবিহীন শিশুদের গুরুতর জটিলতায় আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা টিকা নেওয়া শিশুদের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ ছিল।
‘এটি আমাদের জন্য সতর্কবার্তা’
গবেষণার ফলাফল প্রকাশ অনুষ্ঠানে চসিক মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, ‘প্রায় অর্ধেক শিশু টিকার বয়সের আগেই আক্রান্ত হচ্ছে, এটি আমাদের টিকাদান কৌশল পুনর্মূল্যায়নের ইঙ্গিত দেয়। কোনো শিশুর হামে মৃত্যু গ্রহণযোগ্য নয়।’ রুটিন টিকাদানের কভারেজ ৯৫ শতাংশ বা তার ওপরে নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, বস্তি, দুর্গম এলাকা ও সুবিধাবঞ্চিত পরিবারের শিশুদের জন্য প্রয়োজনে বাড়ি বাড়ি গিয়ে বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি জোরদার করা হবে।
চমেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. মো. তসলিম উদ্দীন বলেন, হাসপাতাল থেকে প্রায় ৬০ শতাংশ শিশু সংক্রমিত হওয়ার তথ্য সতর্কবার্তা দিচ্ছে। হাসপাতালগুলোতে র্যাপিড ট্রায়াজ, তাৎক্ষণিক আইসোলেশন ও পর্যাপ্ত বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
চমেকের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. মো. জসিম উদ্দীন বলেন, ‘চিকিৎসাবিজ্ঞানের গবেষণাকে মাঠপর্যায়ে প্রয়োগ করাই মূল লক্ষ্য।’ গবেষণার উপাত্ত ও সুপারিশ নীতিনির্ধারকদের জন্য দিকনির্দেশনামূলক ভূমিকা রাখবে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
এসপেরিয়া হেলথ কেয়ার ও এআরএফের চেয়ারম্যান গোলাম বাকী মাসুদ বলেন, গবেষণার সাফল্য শুধু বৈজ্ঞানিক প্রতিবেদন প্রকাশের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়। গবেষণার তথ্যকে বাস্তবমুখী জনস্বাস্থ্য পদক্ষেপে রূপান্তর করতে হবে। গবেষণা থেকে পাওয়া ফলাফলকে কর্মপদক্ষেপে রূপ দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। এআরএফ ভবিষ্যতেও মহামারি প্রতিরোধ ও জনস্বাস্থ্য গবেষণায় প্রমাণভিত্তিক সমাধান তৈরিতে কাজ করবে বলে জানান।
৬ মাসে টিকা দেওয়ার সুপারিশ
গবেষণার ফলাফলের ভিত্তিতে দক্ষিণ বাংলাদেশে হামের প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে একাধিক সুপারিশ করেছেন গবেষকেরা। দেশের সব অঞ্চলে টিকাদানের হার ৯৫ শতাংশের ওপরে নিশ্চিত করার পাশাপাশি গ্রামীণ, দুর্গম ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর বাদ পড়া শিশুদের খুঁজে বের করে বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি চালুর কথা বলা হয়েছে। বাড়ি বাড়ি গিয়ে বাদ পড়া শিশু শনাক্ত করে টিকা দেওয়া এবং পরবর্তী টিকাদান নিশ্চিত করতে ট্র্যাকিং ব্যবস্থা চালুর সুপারিশ করা হয়েছে।
৯ মাস বয়সের আগে হাম আক্রান্ত শিশুদের সংখ্যা বিবেচনায় নিয়ে দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ, আইসোলেশন এবং পোস্ট-এক্সপোজার প্রোফাইল্যাক্সিস চালুর কথাও বলেছেন গবেষকেরা। বিশেষ মহামারি পরিস্থিতিতে ৬ মাস বয়সে প্রথম এমআর টিকা দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনার সুপারিশ করা হয়েছে।
শিশুদের অপুষ্টি কমাতে জাতীয় পুষ্টি কর্মসূচির সঙ্গে সমন্বয় করে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল বিতরণ জোরদার করার পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র ও হাসপাতালে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে র্যাপিড ট্রায়াজ, পৃথক আইসোলেশন ইউনিট এবং পর্যাপ্ত বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা নিশ্চিত করার সুপারিশ করা হয়েছে।
বস্তি ও নিম্ন আয়ের ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় বিশেষ জনস্বাস্থ্য প্যাকেজ চালু, ল্যাবরেটরিনির্ভর দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ ও নজরদারি জোরদার এবং প্রজননক্ষম নারী ও মায়েদের জন্য এমআর/এমএমআর টিকাদান কর্মসূচি নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে। পাশাপাশি হামের সামগ্রিক টিকাদান সূচি পর্যালোচনার সুপারিশ করেছেন গবেষকেরা।
গবেষকদের মতে, হাম প্রতিরোধযোগ্য রোগ। তাই টিকাদান, দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ, পুষ্টি সহায়তা ও কার্যকর নজরদারির সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে শিশুদের গুরুতর অসুস্থতা ও মৃত্যু কমানো সম্ভব।
ভোরের আকাশ/সু.পা



