হলি ফ্যামিলির উদ্যোগে প্রথমবার হাম চিকিৎসায় মানসম্মত নির্দেশিকা চালু

ছবি: সংগৃহীত
দেশে প্রথমবারের মতো কোনো চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান নিজস্ব উদ্যোগে কাঠামোবদ্ধ প্রাতিষ্ঠানিক ‘হাম চিকিৎসা নির্দেশিকা’ প্রণয়ন করেছে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশে হাম প্রতিরোধ ও চিকিৎসা ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক অর্জিত হয়েছে।
মঙ্গলবার (১৭ জুন) রাজধানীর হলি ফ্যামিলি রেড ক্রিসেন্ট মেডিকেল কলেজ অডিটোরিয়ামে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রমাণভিত্তিক এই নির্দেশিকার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়। হাসপাতালের অভ্যন্তরে হাম রোগের সুনির্দিষ্ট নির্ণয় ও চিকিৎসা পদ্ধতিকে আরও মানসম্মত ও সমন্বিত করার লক্ষ্যে নির্দেশিকাটি প্রণয়ন করা হয়েছে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রোগভিত্তিক প্রাতিষ্ঠানিক চিকিৎসা নির্দেশিকা দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত থাকলেও বাংলাদেশে এ ধরনের উদ্যোগ এই প্রথম। স্বাস্থ্যসেবা বিশেষজ্ঞ ও শিশুস্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট মহলের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশার বাস্তবায়ন ঘটেছে এই নির্দেশিকার মাধ্যমে।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন হলি ফ্যামিলি রেড ক্রিসেন্ট মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. কে. এম. মজিবুল হক। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সর্দার মো. শাহাদাত হোসেন, এমপি। তিনি এ উদ্যোগকে জাতীয় স্বাস্থ্যখাতের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ উল্লেখ করে কলেজ ও হাসপাতালের জন্য আরও আবাসন, হোস্টেল এবং অবকাঠামোগত সুবিধা সম্প্রসারণের আশ্বাস দেন।
বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ড্যাব)-এর সভাপতি অধ্যাপক ডা. হারুন-অর-রশীদ, মহাসচিব ডা. জহিরুল ইসলাম শাকিল, হলি ফ্যামিলি রেড ক্রিসেন্ট মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক অধ্যাপক ডা. শাহীন রহমান চৌধুরী এবং কলেজের উপাধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. মেহেরুন নেসা।
অনুষ্ঠানে কলেজের কমিউনিটি মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. ফারহানা হক হাসপাতাল-সংশ্লিষ্ট একটি উপস্থাপনা তুলে ধরেন। হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. সায়েম মোহাম্মদ দেশের প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক হাম চিকিৎসা নির্দেশিকা নিয়ে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন।
১৪টি ক্লিনিক্যাল মডিউল নিয়ে প্রণীত ৫০ পৃষ্ঠার এই নির্দেশিকার প্রধান সম্পাদক ছিলেন ডা. ফারহানা হক (এমবিবিএস, এমপিএইচ) এবং ডা. সায়েম মোহাম্মদ (এফসিপিএস স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত, এমআরসিপি-ইউকে)। এ পর্যন্ত বাংলাদেশের কোনো হাসপাতাল বা চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানে হাম ও এর জটিলতা ব্যবস্থাপনার জন্য এ ধরনের মানসম্মত ও প্রমাণভিত্তিক চিকিৎসা প্রোটোকল ছিল না।
মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনায় ডা. সায়েম মোহাম্মদ বিশ্বব্যাপী হাম রোগের পুনরুত্থান নিয়ে আলোকপাত করেন। তিনি জানান, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে বিশ্বজুড়ে প্রায় ১ কোটি ৩ লাখ মানুষ হামে আক্রান্ত হয় এবং ১ লাখ ৭ হাজার ৫০০ জনের মৃত্যু হয়। মৃতদের ৯৫ শতাংশই ছিল পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু। হাম অত্যন্ত সংক্রামক একটি রোগ; এর সংক্রমণ হার (R₀) ১২ থেকে ১৮, যা অধিকাংশ পরিচিত সংক্রামক রোগের তুলনায় অনেক বেশি।
তিনি আরও বলেন, গত বছর বিশ্বব্যাপী প্রায় ২ কোটি ২০ লাখ শিশু তাদের প্রথম ডোজ টিকা পায়নি এবং প্রায় ৪ কোটি ৬০ লাখ শিশু কোনো টিকাই গ্রহণ করেনি। ১৭ কোটিরও বেশি জনসংখ্যার বাংলাদেশে বিভিন্ন এলাকায় হামের প্রাদুর্ভাব দেখা যাচ্ছে, বিশেষ করে শহুরে বস্তি, অনুন্নত ও কম টিকাদান কভারেজসম্পন্ন অঞ্চলে।
এতদিন দেশে হাম চিকিৎসার জন্য কোনো জাতীয় বা প্রাতিষ্ঠানিক নির্দেশিকা না থাকায় চিকিৎসকদের অনেক ক্ষেত্রে মানসম্মত দিকনির্দেশনা ছাড়াই চিকিৎসা সিদ্ধান্ত নিতে হতো। ফলে নিউমোনিয়া, এনসেফালাইটিস এবং মারাত্মক পানিশূন্যতার মতো জটিলতার ব্যবস্থাপনায় অসামঞ্জস্য দেখা দিত এবং প্রতিরোধযোগ্য মৃত্যুর ঘটনাও ঘটত।
নতুন নির্দেশিকায় তিন-স্তরবিশিষ্ট ক্লিনিক্যাল ট্রায়াজ ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর মাধ্যমে রোগীদের হাসপাতালে প্রবেশের সময়ই নির্ধারিত মানদণ্ড অনুযায়ী বাড়িতে চিকিৎসা, আইসোলেশন ওয়ার্ড অথবা জরুরি বিভাগ/আইসিইউতে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে। এছাড়া পরীক্ষার ফলাফলের জন্য অপেক্ষা না করে তাৎক্ষণিকভাবে ভিটামিন-এ প্রদানের নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।
নির্দেশিকায় হামজনিত নিউমোনিয়ার জন্য অক্সিজেন ব্যবস্থাপনার ধাপভিত্তিক নির্দেশনা, এনসেফালাইটিস ও খিঁচুনির চিকিৎসা, অন্ধত্ব প্রতিরোধে চোখের জটিলতা ব্যবস্থাপনা, গুরুতর পানিশূন্যতার চিকিৎসা এবং হাসপাতালের আইসোলেশন কক্ষে কঠোর সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। হাম বায়ুবাহিত রোগ হওয়ায় স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য সাধারণ সার্জিক্যাল মাস্কের পরিবর্তে বাধ্যতামূলকভাবে N95 রেসপিরেটর ব্যবহারের নির্দেশনাও এতে উল্লেখ করা হয়েছে।
নির্দেশিকায় কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তাও রয়েছে। এর মধ্যে হামজনিত নিউমোনিয়ায় কর্টিকোস্টেরয়েড ব্যবহার না করা, চোখের জটিলতায় স্টেরয়েড ড্রপ ব্যবহার থেকে বিরত থাকা এবং গুরুতর পানিশূন্যতায় শুধুমাত্র ডেক্সট্রোজ স্যালাইন ব্যবহার না করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। আয়োজকদের মতে, অতীতে এসব ভুল চিকিৎসার কারণে বহু রোগীর জীবনহানি ঘটেছে।
হলি ফ্যামিলি রেড ক্রিসেন্ট মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ডা. ফারহানা হক এবং ডা. সায়েম মোহাম্মদ এই নির্দেশিকাকে জাতীয় হাম চিকিৎসা প্রোটোকল হিসেবে গ্রহণের জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। পাশাপাশি হাসপাতাল স্বীকৃতি প্রক্রিয়ায় আইসোলেশন কক্ষ ও সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণসংক্রান্ত মানদণ্ড বাধ্যতামূলক করার সুপারিশও করা হয়েছে।
মূল প্রবন্ধে জেলা পর্যায়ের হাসপাতালে শিশু আইসিইউ সক্ষমতা বৃদ্ধি, সম্মুখসারির স্বাস্থ্যকর্মীদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা যাচাই বাধ্যতামূলক করা এবং রোগের প্রাদুর্ভাবসংক্রান্ত তথ্য দ্রুত কেন্দ্রীয় পর্যায়ে পৌঁছাতে রিয়েল-টাইম ইলেকট্রনিক রিপোর্টিং ব্যবস্থা চালুর আহ্বান জানানো হয়।
ডা. সায়েম মোহাম্মদ বলেন, “বাংলাদেশে হামে প্রতিটি মৃত্যু প্রতিরোধযোগ্য। এই নির্দেশিকা আমাদের প্রতিষ্ঠানের অঙ্গীকার। আমরা সরকারের প্রতি আহ্বান জানাই, এটিকে জাতীয় হাম চিকিৎসা নির্দেশিকা হিসেবে গ্রহণ করা হোক।”
রাজধানীর অন্যতম শীর্ষ শিক্ষণ হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজ হিসেবে হলি ফ্যামিলি রেড ক্রিসেন্ট মেডিকেল কলেজ দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসা শিক্ষা ও রোগীসেবায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। নতুন এই নির্দেশিকা প্রকাশের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি কেবল রোগীর চিকিৎসাই নয়, বরং বাংলাদেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা নির্ধারণেও অগ্রণী ভূমিকা রাখার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে।
ভোরের আকাশ/সু.পা



