স্বাস্থ্য সেবা

নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত না হলে স্বাস্থ্যব্যবস্থায় কখনো সুফল অর্জন সম্ভব নয়

ছবি: সংগৃহীত

একটি দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার ভিত্তি শুধু হাসপাতাল, চিকিৎসক কিংবা আধুনিক চিকিৎসা প্রযুক্তি নয়; এর অন্যতম প্রধান ভিত্তি নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্য। একটি জাতি যদি নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়, তবে যত উন্নত হাসপাতালই নির্মাণ করা হোক না কেন, রোগীর চাপ ক্রমাগত বাড়তেই থাকবে। ফলে স্বাস্থ্যখাতে বিনিয়োগের কাঙ্ক্ষিত সুফল অর্জন করা কঠিন হয়ে পড়বে।

বাংলাদেশে বর্তমানে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, কিডনি রোগ এবং ক্যানসারের মতো অসংক্রামক রোগ দ্রুত বাড়ছে। এর পেছনে বিভিন্ন কারণ থাকলেও ভেজাল, রাসায়নিক-দূষিত ও নিম্নমানের খাদ্যের বিস্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য সমস্যা। ফল ও সবজিতে অতিরিক্ত কীটনাশক, মাছ-মাংসে ক্ষতিকর রাসায়নিক, দুধ ও অন্যান্য খাদ্যপণ্যে ভেজাল এবং অতিমাত্রায় প্রক্রিয়াজাত খাবারের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার মানুষের শরীরে দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে।

এর প্রভাব ব্যক্তি, পরিবার এবং রাষ্ট্র—সব ক্ষেত্রেই পড়ছে। একদিকে রোগীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হচ্ছে, অন্যদিকে চিকিৎসা ব্যয় বাড়ায় অনেক পরিবার অর্থনৈতিক সংকটে পড়ছে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রের স্বাস্থ্য ব্যয়ও বাড়ছে, যা সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

একটি কার্যকর স্বাস্থ্যনীতি কেবল চিকিৎসানির্ভর হতে পারে না; সেটি অবশ্যই প্রতিরোধভিত্তিক হতে হবে। নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যব্যবস্থার অন্যতম কার্যকর ভিত্তি। মানুষ যদি নিরাপদ খাদ্য পায়, তবে অনেক রোগের ঝুঁকি কমবে, হাসপাতালের ওপর চাপ হ্রাস পাবে, ওষুধের ব্যবহার কমবে এবং জনগণের কর্মক্ষমতা ও জীবনমান উন্নত হবে।

এ লক্ষ্য অর্জনে কয়েকটি বিষয়কে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া জরুরি—

  1. খাদ্যে ভেজাল ও ক্ষতিকর রাসায়নিক ব্যবহারের বিরুদ্ধে বিদ্যমান আইনের কঠোর ও নিয়মিত প্রয়োগ।
  2. কৃষক, উৎপাদক ও ব্যবসায়ীদের নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন ও সংরক্ষণে প্রশিক্ষণ ও প্রণোদনা প্রদান।
  3. বাজার তদারকি জোরদার করা এবং খাদ্য পরীক্ষাগারের সক্ষমতা বৃদ্ধি।
  4. জনসচেতনতা বাড়িয়ে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলা।
  5. জাতীয় স্বাস্থ্যনীতিতে খাদ্য নিরাপত্তাকে অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা।

স্বাস্থ্য খাতে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় করেও যদি মানুষ প্রতিদিন অনিরাপদ বা দূষিত খাদ্য গ্রহণ করতে বাধ্য হয়, তবে সেই বিনিয়োগের দীর্ঘমেয়াদি সুফল সীমিত হয়ে যাবে। হাসপাতাল রোগের চিকিৎসা দিতে পারে, কিন্তু রোগের উৎপত্তির মূল কারণ দূর করতে পারে না। সেই কাজটি করতে হলে খাদ্য নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।

খাদ্য নিরাপত্তা শুধু কৃষি বা ভোক্তা অধিকারের বিষয় নয়; এটি জনস্বাস্থ্য, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং জাতীয় উন্নয়নের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হলে ভবিষ্যতে রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি, চিকিৎসা ব্যয়ের ঊর্ধ্বগতি এবং দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতার চাপ স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে আরও কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলতে পারে। সুস্থ, কর্মক্ষম ও উৎপাদনশীল জাতি গড়তে হলে চিকিৎসার পাশাপাশি রোগ প্রতিরোধে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। আর সেই প্রতিরোধের প্রথম ধাপই হলো—প্রতিটি মানুষের জন্য নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্য নিশ্চিত করা।

ভোরের আকাশ/সু.পা

নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত না হলে স্বাস্থ্যব্যবস্থায় কখনো সুফল অর্জন সম্ভব নয় | স্বাস্থ্য কথা | ভোরের আকাশ