বিলিয়ন ডলারের গার্মেন্ট শিল্পে দুরবস্থা

বাংলাদেশের গার্মেন্ট শিল্প অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি। বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি আয়, বিদেশি বাজারে স্থিতিশীল চাহিদা এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে এই খাতের অবদান অতুলনীয়। বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি রেমিট্যান্স এবং পোশাক শিল্পের সূচনা করেছিলেন শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। জিয়ার হাত ধরেই গড়ে উঠা সেদিনের শিশু গার্মেন্ট শিল্প আজ দেশের অন্যতম প্রধান রপ্তানি খাত। দেশের জনসংখ্যার অর্ধেক নারী। এই বিপুল সংখ্যক নারীকে কর্মহীন রেখে কোনভাবেই যে সদ্য স্বাধীন একটি জনবহুল দেশের উন্নয়ন সম্ভব নয় সেটা উপলব্ধি করে শহীদ জিয়া নারীদেরকে দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করে দেশের সার্বিক উন্নয়নের চাকাকে গতিশীল করার জন্য মহিলা বিষয়ক মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা করে নারীদের ক্ষমতায়ন ও সমাজে তাদের যথাযথ সম্মান নিশ্চিত করেছিলেন। অথচ এই বিশাল সাফল্যের পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা নারী শ্রমিকদের জীবনমান আজও রয়ে গেছে নানা বঞ্চনা, অবহেলা ও অযত্নে নিমজ্জিত। শিল্পের এবং মালিকের বহুমাত্রিক উন্নয়ন হলেও শ্রমিকের মৌলিক অধিকার, নিরাপত্তা ও ন্যায্য মজুরি নিশ্চিতকরণ যেন এখনও দুরাশা।
গার্মেন্ট শ্রমিকরা দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম ভিত্তি হলেও তাদের কাজের পরিবেশে অনিয়ম এখনো স্পষ্ট। অনেকে এখনও দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, অতিরিক্ত কাজের চাপ, বিশ্রামের স্বল্পতা ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে কাজ করতে বাধ্য হন। মজুরি কাঠামোতে সাম্প্রতিক কিছু সংশোধন হলেও তা বাজারমূল্যের সাথে তাল মিলিয়ে চলছেনা, এমন দাবি তুলছেন শ্রম অধিকার বিশেষজ্ঞরা। বিশেষত জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, আবাসন ব্যয়, চিকিৎসা ও শিক্ষার ব্যয় বহন করার জন্য বর্তমান মজুরি অনেক ক্ষেত্রেই অপ্রতুল হয়ে পড়ে। বিষয়টি আরও উদ্বেগজনক হয় যখন দেখি, দেশের গার্মেন্টস শিল্প আন্তর্জাতিক বাজারে ‘কম খরচে উচ্চ উৎপাদনশীল’ হিসেবে পরিচিত। অর্থাৎ কম খরচের মূল উপাদান হচ্ছে শ্রম। এই কম খরচ টেকাতে গিয়ে শ্রমিকেরা যে অমানবিক চাপ, শারীরিক ও মানসিক ক্লান্তি এবং ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা বয়ে বেড়ান- তা প্রায়ই আড়ালে পড়ে থাকে।
আবার বড় দুর্ঘটনা বা শিল্পকারখানা বন্ধের ঘটনায় দেখা যায় শ্রমিকরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, অথচ তাদের সুরক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা সময়মতো গৃহীত হয় না। কেবল অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিই কোনো শিল্পের সাফল্য নিশ্চিত করে না; সেই সমৃদ্ধির ন্যায্য বণ্টনও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। গার্মেন্টস শিল্পে বৈদেশিক বিনিয়োগ ও অর্ডার বৃদ্ধির পাশাপাশি শ্রমিকের অধিকার রক্ষায় নিয়োগকর্তা, মালিকপক্ষ এবং সরকারের সমন্বিত পদক্ষেপ অত্যাবশ্যক। শ্রম আইন প্রয়োগ, ভবন নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং মাতৃত্বকালীন সুবিধাসহ বিভিন্ন মৌলিক অধিকারকে নিশ্চিত করা দরকার।
বাংলাদেশ আজ বৈশ্বিক রপ্তানি মানচিত্রে মর্যাদার আসনে। কিন্তু এই মর্যাদা তখনই অর্থবহ হবে, যখন শিল্পের মূল চালিকাশক্তি- শ্রমিকরা প্রাপ্য সম্মান, নিরাপত্তা ও ন্যায্য মজুরি পাবেন। গার্মেন্টস খাতের এই বিশাল সাফল্যের ভেতর লুকিয়ে থাকা অবহেলা ও অযত্নের পর্দা সরিয়ে মানবিকতাকে প্রাধান্য দিতে হবে। কারণ উন্নয়ন তখনই টেকসই হবে, যখন এর প্রতিটি স্তম্ভ সমানভাবে সুদৃঢ় ও সম্মানিত হবে। প্রায় ৪৭ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি আয়ের মধ্যে গার্মেন্টস খাত একাই বহন করে ৮৪ শতাংশের বেশি। কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে প্রায় ৫০ লক্ষ মানুষের। যাদের বেশিরভাগই নারী অর্থাৎ ৫৫ শতাংশই নারী। শুধু তাই নয়, দেশের বৈদেশিক মুদ্রার স্থিতি, ব্যাংকিং প্রবাহ, বাণিজ্য ভারসাম্য- সবকিছুর মূলে গার্মেন্টস শিল্পের শ্রমিকদের ঘাম-শ্রম জড়িয়ে আছে। কিন্তু এতো বিপুল অর্থনৈতিক অবদানের পরও শ্রমিকদের জীবনমান সবসময় উপেক্ষিত ও অবহেলিত।
বর্তমানে ঘোষিত ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধি পেলেও তা প্রকৃত জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে তাল মেলাতে ব্যর্থ। ঢাকায় নিম্ন আয়ের শ্রমিক পরিবারের প্রতি মাসের ন্যূনতম ব্যয় যেখানে ১৮,০০০ থেকে ২২,০০০ টাকা, সেখানে অনেকে এখনও মূল বেতন পান তার অর্ধেকেরও কম। শ্রমিকদের অভিযোগ- ওভারটাইমের ওপর নির্ভর না করলে নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয় মেটানো অসম্ভব। ফলে কর্মদিবস প্রায়ই হয়ে দাঁড়ায় ১০-১২ ঘণ্টা, যা আন্তর্জাতিক শ্রম আইনের পরিপন্থি। রানা প্লাজা ও তাজরীন ফ্যাশনসের দুর্ঘটনার পর ভবন নিরাপত্তা, অগ্নিনিরাপত্তা ও শ্রম অধিকার নিয়ে যথেষ্ট উদ্যোগ গ্রহণ করা হলেও ত্রুটিবিচ্যুতি এখনো বহু স্থানে দৃশ্যমান। শ্রমিকদের স্বাস্থ্য সমস্যা- বিশেষ করে শ্বাসযন্ত্রের সমস্যা, চর্মরোগ, দৃষ্টিশক্তির দুর্বলতা ও মানসিক চাপ নিয়মিত দেখা যায়। কিন্তু শিল্প কাঠামোতে স্বাস্থ্য সুরক্ষা বরাদ্দ এখনও নগণ্য।
যেখানে গার্মেন্টস খাত প্রতি বছর বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে স্থিতিশীল রাখে, সেখানে শ্রমিকেরা ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা, কর্মসংস্থান হারানোর ভয় ও সুবিধাবঞ্চনা নিয়েই জীবনযাপন করেন। বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্পে প্রতিবছর নতুন কারখানা, নতুন অর্ডার, বাড়তি রপ্তানি- সবকিছুরই প্রতিফলন দেখা যায় জাতীয় অর্থনীতিতে। কিন্তু সেই অগ্রগতির সুফল সরাসরি শ্রমিকের কাছে পৌঁছায় না। বাস্তবতা হলো- বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের যে মর্যাদা, তা শ্রমিকের ঘামের ওপর নির্ভরশীল; অথচ সেই শ্রমিকই সবচেয়ে কম মূল্যায়িত।
শ্রমিকের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিশ্চিত করতে প্রয়োজন
১. ন্যায্য মজুরি কাঠামো আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করা
২. শ্রম আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ
৩. নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্য সুবিধা বাড়ানো
৪. স্বচ্ছ সাপ্লাই-চেইন নীতিমালা প্রণয়ন
৫. নারী শ্রমিকবান্ধব কর্মপরিবেশ নিশ্চিত
৬. পণ্যের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করতে ক্রেতাদের সামাজিক দায়বদ্ধতা বৃদ্ধি।
বাংলাদেশের গার্মেন্ট শিল্প শুধু অর্থনীতির নয়- রাষ্ট্রের সামাজিক ও মানবিক কাঠামোর মূল চালিকা। এই খাত টেকসই হতে হলে এর ভিত্তি শ্রমিক-নিরাপদ, স্বচ্ছ ও সম্মানজনক পরিবেশে থাকতে হবে। বিলিয়ন ডলারের রপ্তানির পেছনে যে শ্রম, ত্যাগ ও মানবিক মূল্য আছে, তার সঠিক প্রতিদান নিশ্চিত করাই সময়ের দাবি। শিল্পের উন্নয়ন টেকসই হবে তখনই, যখন শ্রমিকের জীবনমান উন্নত হবে। অন্যথায় আমাদের অর্থনৈতিক অগ্রগতি থাকবে এক প্রান্ত উজ্জ্বল, অন্য প্রান্ত অন্ধকারে।
লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিষ্ট
ভোরের আকাশ/এসএইচ