চড়া সবজির বাজারে নাভিশ্বাস, বেড়েছে মাছ-মুরগি-ডিমের দাম

নিত্যপণ্যের বাড়তি দামের চাপের মধ্যেই হঠাৎ চড়া হয়ে উঠেছে সবজির বাজার। সপ্তাহের ব্যবধানে কোনো কোনো সবজির দাম কেজিতে ২০ থেকে ৪০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। শিমের কেজি ২২০ থেকে ২৩০ টাকা, গোল বেগুন ১৬০ টাকা ও কাঁচামরিচ ১৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
বিক্রেতাদের দাবি, বর্ষা শেষ হওয়ার পরপরই সবজির বাজারে এমন ঊর্ধ্বগতি দেখা যায়। উৎপাদন ও সরবরাহে প্রভাব পড়ায় এ সময় দাম বাড়া স্বাভাবিক।
শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর বিভিন্ন কাঁচাবাজার ঘুরে ক্রেতা-বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে এমন চিত্র পাওয়া গেছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, বাজারে সবচেয়ে বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে শিম। প্রতি কেজি শিম ২২০ থেকে ২৩০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা গত সপ্তাহে ছিল ২০০ টাকা। কাঁচামরিচের দামও কেজিতে ৪০ টাকা বেড়ে ১৬০ টাকায় উঠেছে।
দাম বেড়েছে গোল বেগুনেরও। সাদা গোল বেগুন ১৬০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। তবে লম্বা বেগুনের কেজি ১০০ টাকা। গত সপ্তাহে বেগুনের দাম ছিল ১০০ থেকে ১৪০ টাকা।
এ ছাড়া প্রতি কেজি টমেটো ১২০, ধুন্দল ৮০, ফুলকপি ৮০ থেকে ৯০, দেশি বা হাইব্রিড শসা ৭০ থেকে ৮০, গাজর ১৪০, করলা ১০০, কাঁকরোল ৮০, পটল ৬০, ঢেঁড়স ৬০, কচুর মুখি ৭০ থেকে ৮০ ও চিচিঙ্গা ৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আকারভেদে লাউয়ের দাম ৬০ থেকে ৮০ টাকা। লেবুর হালি ৬০ টাকা। তুলনামূলক কম দামে প্রতি কেজি পেঁপে ৩০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
রামপুরা কাঁচাবাজারের ব্যবসায়ী শাহ আলম বলেন, বর্ষার মৌসুম শেষ হলেও এখনও মাঝেমধ্যে বৃষ্টি হচ্ছে। এতে খেত থেকে সবজি সংগ্রহ ও বাজারে পরিবহনে নানা সমস্যা হচ্ছে। ফলে সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হলে খুচরা বাজারেও দাম বেড়ে যায়।
বারিধারা ডিওএইচএস সংলগ্ন কাঁচাবাজারের সবজি বিক্রেতা মো. ফিরোজ বলেন, এ সময়ে সবজির বাজারে দাম বাড়া নতুন কিছু নয়। বর্ষার প্রভাব কমে গেলে এবং শীতকালীন সবজি পর্যাপ্ত পরিমাণে বাজারে এলে দাম কমতে পারে।
এদিকে বাড়তি দামে বিপাকে পড়েছেন ক্রেতারা। তাদের অভিযোগ, বাজারে প্রায় সব ধরনের সবজির দামই চড়া। বিশেষ করে বেগুন ও শিমের মতো কিছু সবজি সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে।
জোয়ার সাহারা বাজারে সবজি কিনতে আসা রায়হান হোসেন বলেন, চাকরিজীবী হওয়ায় তিনি একসঙ্গে কয়েক দিনের সবজি ও মাছ কেনেন। তবে গত সপ্তাহের তুলনায় শনিবারের বাজারে প্রায় সবকিছুর দামই বেশি মনে হয়েছে। কিছু পণ্যে তাকে ২০ থেকে ৩০ টাকা বেশি গুনতে হয়েছে। দাম বাড়লেও খাওয়া তো বাদ দেওয়া যাবে না—এমন আক্ষেপও জানান তিনি।
বিক্রেতারা জানান, পাইকারি বাজারে দাম কমলে খুচরা বাজারেও এর প্রভাব পড়বে। তবে আপাতত বর্ষা-পরবর্তী সরবরাহ পরিস্থিতির কারণে সবজির বাড়তি দাম অব্যাহত থাকতে পারে।
সবজির পাশাপাশি রাজধানীর বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় আরও কয়েকটি পণ্যের দাম চড়া। বিশেষ করে মাছ, মুরগি, ডিম ও ভোজ্যতেলের বাড়তি দামে ক্রেতাদের মধ্যে অস্বস্তি দেখা গেছে।
শনিবার ঢাকার মুগদা, মানিকনগর, কমলাপুর, খিলগাঁও ও বাসাবো এলাকার বাজার ঘুরে দেখা যায়, ফার্মের মুরগির ডিমের এক ডজন ১৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আগস্টের শুরুতে দাম বাড়ার পর থেকে ডিমের দাম আর আগের অবস্থায় ফেরেনি। এর আগে এক ডজন ডিম ১৩০ থেকে ১৪০ টাকায় বিক্রি হতো।
একইভাবে ব্রয়লার মুরগির দাম কেজিতে ১৯০ থেকে ২০০ টাকা। আগে এর দাম ছিল ১৭০ থেকে ১৮০ টাকা। সোনালি মুরগির দাম আরও বেশি। গত সপ্তাহের তুলনায় কেজিতে প্রায় ৩০ টাকা বেড়ে সোনালি মুরগি ৩৪০ থেকে ৩৬০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। আগে এর দাম ছিল ৩০০ থেকে ৩৩০ টাকা।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, গত কয়েক মাসের বন্যা, অতিবৃষ্টি ও অতিরিক্ত গরমে অনেক খামারে মুরগি মারা গেছে। পরে অনেক খামারি নতুন করে মুরগি পালন শুরু করেননি। সাম্প্রতিক লোডশেডিংয়েও উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। এতে বাজারে মুরগির সরবরাহ কমে দাম বেড়েছে। মুরগির সংখ্যা কমে যাওয়ায় ডিমের উৎপাদনও কমেছে।
বাংলাদেশ পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের (বিপিআইএ) মহাসচিব এম সাফির রহমান বলেন, মুরগি ও ডিমের দাম মূলত জোগান ও চাহিদার ওপর নির্ভর করে। সাম্প্রতিক ভয়াবহ বন্যায় দেশের অসংখ্য লেয়ার খামারি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। অনেক খামারির মুরগি ও ডিম ভেসে গেছে। এতে বাজারে হঠাৎ করে জোগানের বড় ঘাটতি তৈরি হওয়ায় দাম বেড়েছে।
মাছের বাজারেও স্বস্তি নেই। রুই, কাতলা, পাবদা, তেলাপিয়া ও পাঙাশসহ বেশির ভাগ মাছের দাম গত সপ্তাহের তুলনায় কেজিতে প্রায় ২০ থেকে ৩০ টাকা বেড়েছে। চাষের পাঙাশ আকারভেদে ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা এবং তেলাপিয়া ২৫০ থেকে ২৮০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। আড়াই থেকে তিন কেজি ওজনের রুইয়ের কেজি ৪০০ টাকা এবং কাতলা ৪২০ টাকা।
মাংসের বাজারেও ক্রেতাদের জন্য স্বস্তি নেই। রাজধানীতে গরুর মাংস কেজি ৮০০ থেকে ৮৫০ টাকা এবং খাসির মাংস ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। ফলে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের জন্য নিয়মিত মাছ-মাংস কেনা কঠিন হয়ে পড়েছে।
ভোজ্যতেলের বাজারে দাম বাড়ার পাশাপাশি সরবরাহ সংকটও দেখা দিয়েছে। গত ২ সেপ্টেম্বর কোম্পানিগুলো বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম লিটারে ৫ টাকা বাড়িয়েছে। ফলে এক লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেল কিনতে ভোক্তাকে ১৯৯ টাকার পরিবর্তে ২০৪ টাকা ব্যয় করতে হচ্ছে।
তবে দাম বাড়ানোর পরও রাজধানীর অনেক খুচরা দোকানে পর্যাপ্ত বোতলজাত তেল পাওয়া যাচ্ছে না। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, অর্ডার দেওয়ার পরও কয়েক দিন অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
মানিকনগর পুকুরপাড়ের মুদি দোকানি রফিকুল ইসলাম বলেন, অর্ডার দেওয়ার পরও কোম্পানির কাছ থেকে চাহিদা অনুযায়ী তেল পাওয়া যাচ্ছে না। বর্তমানে তাঁর দোকানে কোনো বোতলজাত সয়াবিন তেল নেই। ফলে তেল কিনতে এসে অনেক ক্রেতাকেই খালি হাতে ফিরতে হচ্ছে। কেউ কেউ বাধ্য হয়ে খোলা তেল কিনে বাড়ি ফিরছেন।
সার্বিকভাবে বাজারে কিছু পণ্যে তুলনামূলক স্বস্তি থাকলেও মাছ, মুরগি, ডিম ও তেলের বাড়তি দাম সামগ্রিক বাজারে চাপ তৈরি করছে। এতে অনেক ক্রেতা প্রয়োজনীয় পণ্যের পরিমাণ কমিয়ে দিচ্ছেন। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের মানুষের খাদ্য তালিকায় মাছ-মাংস-ডিমসহ দাম বেড়ে যাওয়া পণ্যের পরিমাণ কমিয়ে পরিস্থিতি সামাল দিতে হচ্ছে।
ভোরের আকাশ/জেআ