ফের পেঁয়াজ সিন্ডিকেট, সরকার কী করছে?

ঠিক যেন বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের মতোই পর্যাপ্ত মজুত অথচ পেঁয়াজের বাজারে আগুন। ব্যাপক মজুত ও সরবরাহ স্বাভাবিক থাকা সত্ত্বেও অন্যান্য বছরের মতো এবারও নভেম্বর মাস শুরু হতে না হতেই দেশের ব্যবসায়ীদের একটি ‘অসাধু সিন্ডিকেট’ পেঁয়াজ নিয়ে কারসাজির অপচেষ্টা শুরু করেছে। দেশের বাজারে হঠাৎ বাড়তে শুরু করেছে পেঁয়াজের দাম। গত এক সপ্তাহের ব্যবধানে রাজধানীর বাজারগুলোতে খুচরা পর্যায়ে পেঁয়াজের দাম বেড়েছে কেজি প্রতি ৩০ থেকে ৪০ টাকা। এর মধ্যে গত তিন-চার দিনেই বেড়েছে কেজি প্রতি ২০ টাকার ওপরে।
বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে গত মৌসুমের পেঁয়াজের মজুত প্রায় শেষের দিকে হলেও এখনও দাম বৃদ্ধির মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়নি। তবে গত কয়েক দিন দেশের বিভিন্নস্থানে বৃষ্টি হওয়ায় আগাম পেঁয়াজের কিছু জমি আক্রান্ত হয়েছে। এছাড়া বর্তমানে পেঁয়াজ আমদানিও বন্ধ থাকার সুযোগ নিয়ে কিছুসংখ্যক মজুতকারীরা কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির পায়তারা করছেন। এ অবস্থায় সরকারের কঠোর নজরদারি এবং যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বাজারে পেঁয়াজের মজুত ও সরবরাহের তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। যদি আমদানি করার প্রয়োজন হয়, তবে শিগগির অনুমোদন দেওয়া হবে।
এ ব্যাপারে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব মাহবুবুর রহমান ভোরের আকাশকে বলেন, কৃষিসচিব জানিয়েছেন, ১৫ দিনের মধ্যে নতুন পেঁয়াজ বাজারে আসবে। সুতরাং ঘাটতি হবে না। এছাড়া কয়েকটি সংস্থাকে বাজারের তথ্য সংগ্রহ করতে বলা হয়েছে। আর বাজারে সত্যিই যদি পেঁয়াজের ঘাটতি থাকে, তা হলে দ্রুত আমদানির অনুমতি দেওয়া হবে। পেঁয়াজের দাম নিয়ে কোন চক্র কারসাজি করার অপচেষ্টা করলে কঠোর সরকারি পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, দেশে বর্তমানে প্রতিবছর ২৬-২৭ লাখ টন পেঁয়াজের চাহিদা রয়েছে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত মৌসুমে দেশে পেঁয়াজের উৎপাদন হয়েছে ৩৮ লাখ টন। তবে এরপরও প্রতিবছর ৬-৭ লাখ টন পেঁয়াজ আমদানি হয় দেশে।
ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্যানুযায়ী, গত এক সপ্তাহে খুচরা পর্যায়ে পেঁয়াজের দাম কেজিপ্রতি ৪০ টাকা বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ১০০-১২০ টাকা কেজি, যা এক সপ্তাহ আগে ছিল ৭০-৮০ টাকা কেজি। অবশ্য টিসিবি এটিও বলেছে, গত বছর এই সময় পেঁয়াজের দাম ছিল ১৩০-১৫০ টাকা কেজি।
এ ব্যাপারে ডিএইর প্ল্যান্ট কোয়ারেন্টিন উইংয়ের অতিরিক্ত পরিচালক (আমদানি) বনি আমিন খান জানান, এখনও পেঁয়াজ আমদানির কোনো আবেদনই আমাদের কাছে নেই। সরকার আমদানির অনুমোদন দিলে আবেদন নেওয়া হবে। তবে মন্ত্রণালয়ে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
অন্যদিকে, ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, গত মৌসুমের পেঁয়াজের ১০ থেকে ১৫ শতাংশ মজুত রয়েছে। বাকি প্রায় ৯০ শতাংশই শেষ। আর নতুন মৌসুমের মুড়িকাটা জাতের পেঁয়াজ আবাদ শুরু হয়েছে। বাজারে আসতে এখনো এক থেকে দেড় মাস লাগবে।
এদিকে, গতকাল রাজধানীর মিরপুর, হাতিরপুল, কারওয়ানবাজারসহ বিভিন্ন খুচরা বাজারে ছোট আকারের পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে ১০০ থেকে ১০০ টাকা টাকা কেজি দরে। তবে কিছুটা বড় আকারের এবং ভালোমানের পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে ১২০ টাকা কেজি। এক সপ্তাহ আগে এই পেঁয়াজের দাম ছিল ৮০-৮৫ টাকা কেজি। সে হিসাবে এক সপ্তাহে দাম বেড়েছে কেজি প্রতি ২০-৩৫ টাকা।
রাজধানীর মিরপুর-১ নম্বর কাঁচাবাজারের পেঁয়াজ বিক্রেতা রওশন আলম বলেন, এত দিন দেশি পেঁয়াজের সরবরাহ ভালো থাকায় দাম স্থিতিশীল ছিল। কিন্তু বর্তমানে মোকামগুলোয় পেঁয়াজের সরবরাহ কমেছে, যার প্রভাব পড়েছে দামে। শনিবার থেকে গতকাল বুধবার পর্যন্ত কেজিপ্রতি ১৫-২৫ টাকা বেড়েছে পেঁয়াজের দাম বেড়েছে বলে জানান তিনি।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, পাইকারি পর্যায়ে পেঁযাজের গত কয়েকদিনের তুলনায় আবার নিম্নমুখী। গতকাল রাজধানীর পেঁয়াজের আড়ত শ্যামবাজারে পাইকারি পর্যায়ে পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে ৯০-৯৫ টাকা কেজি, যা বুধবার ছিল ৯৫-১০০ টাকা কেজি এবং মঙ্গলবার ছিল ৯০-৯৫ টাকা কেজি। তবে এক সপ্তাহ আগে এই পেঁযাজ বিক্রি হয়েছে ৬৫-৭০ টাকা কেজি দরে। সে হিসাবে গত এক সপ্তাহে শ্যামবাজারে পাইকারি পর্যায়ে পেঁয়াজের দাম কেজিপ্রতি ২৫ টাকা বেড়েছে।
উল্লেখ্য, চলতি বছর ডিসেম্বরের মাঝামাঝি কিংবা শেষার্ধে দেশে মুড়িকাটা পেঁয়াজের উত্তোলন শুরু হবে। ফলে আগামী অন্তত দেড় মাস দেশে পেঁয়াজের সরবরাহ ধারাবাহিকভাবে কমবে। এতে অনেক ব্যবসায়ী আমদানির পরামর্শ দিয়েছেন। এর আগে গত সেপ্টেম্বরের শুরুতে বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন সুপারিশ করেছিল, পেঁয়াজের দাম কেজিপ্রতি ৯০ টাকা পার হলেই আমদানির অনুমতি দিতে হবে। সেই সঙ্গে শুল্ক-কর ছাড় দেওয়ারও সুপারিশ করেছে কমিশন।
রাজধানীর শ্যামবাজারের পেঁয়াজের আড়তদার অপু ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী মিঠুন হোসেন জানান, কৃষকদের কাছে থাকা আগের মওসুমের পেয়াজের মজুতের পরিমাণ দিন দিন কমে আসছে। এতে ফরিদপুর, রাজবাড়ী, পাবনাসহ বিভিন্ন অঞ্চলের হাটগুলোতে পেঁয়াজের দাম বাড়ছে, যার প্রভাব পাইকারি ও খুচরায় পড়ছে। তবে বাজারে সরবরাহ ভালো থাকলে দাম কিছুটা কমে, সরবরাহ কমে গেলে দাম বাড়ে।
তিনি বলেন, দেশে নতুন পেঁয়াজ উঠতে এখনো এক থেকে দেড় মাস সময় লাগবে। সেই পর্যন্ত মানুষ যদি বর্তমান দামে পেঁয়াজ খেতে পারে, তবে আমদানি করার প্রয়োজন নেই। আর সরকার দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে আমদানির অনুমতি দিতে পারে।
জানা গেছে, ফরিদপুর, পাবনাসহ বিভিন্ন হাটে গত বৃহস্পতিবার প্রতি মণ পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে ৪ হাজার ২০০ টাকা, যা গতকাল কিছুটা কমে ৩ হাজার ৮০০ টাকায় নেমেছে।
কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, দেশে দুই ধাপে পেঁয়াজ উৎপাদন হয়। রবি মৌসুমের শুরুতে মুড়িকাটা পেঁয়াজ রোপণ করা হয়। এ জাতের পেঁয়াজ দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করা যায় না। মুড়িকাটা পেঁয়াজ উত্তোলন শেষ হলে একই জমিতে কৃষক হালি বা বীজ পেঁয়াজ রোপণ করেন। এ পেঁয়াজ মাচা বা বিভিন্নভাবে সংরক্ষণ ঘরে দীর্ঘদিন মজুত রাখা হয়, যা এখন বাজারে পাওয়া যাচ্ছে।
অনুসন্ধাানে আরো জানা গেছে, চলতি বছর বাজারে প্রায় পুরোটাই চাহিদা মিটিয়েছে দেশীয় পেঁয়াজ। তবে প্রতিবারের মতো এবারও মৌসুমের শেষ সময়ে এসে পেঁয়াজের বাজারে কিছুটা অস্থিরতা শুরু হয়েছে। সপ্তাহের ব্যবধানে চট্টগ্রামের পাইকারি বাজারে প্রতি কেজিতে দাম বেড়েছে ২০-২৫ টাকা।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, চলতি বছর পুরোটাই দেশীয় পেঁয়াজ বাজারে ছিল। এখন মৌসুম শেষ পর্যায়ে হওয়ায় দাম বাড়ছে। নতুন ফলন বাজারে আসা পর্যন্ত বাজারে অস্থিরতা থাকবে। তবে আমদানির সুযোগ দিলে এ দাম কমে যাবে।
ব্যবসায়ীরা আরও বলছেন, বছরে দেশে পেঁয়াজের চাহিদা থাকে ৩২ লাখ টনের মতো। চাহিদার চেয়ে বেশি পেঁয়াজ দেশে উৎপাদিত হয়। উৎপাদন হলেও সংরক্ষণের অভাবে বড় অংশ পেঁয়াজ নষ্ট হয়। বিগত বছরগুলোতে চাহিদার অবশিষ্ট পেঁয়াজ ভারত থেকে আমদানি করা হতো। পাশাপাশি বিগত বছরগুলোতে পাকিস্তান, চীন, মিয়ানমার থেকেও পেঁয়াজ আমদানি করা হয়েছে।
আড়তদাররা বলছেন-দেশের পাবনা, রাজবাড়ী, নাটোর, কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহ, সিরাজগঞ্জ, মাগুরা ও চুয়াডাঙ্গা জেলায় বেশি পেঁয়াজ উৎপাদন হয়। এসব জেলার কৃষকদের হাতে এখনো কিছু পেঁয়াজ রয়েছে। তবে মৌসুমের শেষ সময় হওয়ায় ওখানকার ব্যবসায়ীরা সুযোগ নিচ্ছেন।
চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জের মেসার্স জামেনা ট্রেডিংয়ের পরিচালক মো. আজগর হোসেন বলেন, বর্তমানে বাজারে সবগুলোই দেশি পেঁয়াজ। মৌসুমের শেষ সময় হওয়ায় বাজারে সরবরাহ কম, এজন্য দাম কিছুটা বাড়ছে। তবে সরকার দেশের বাইরে থেকে আমদানির জন্য আইপি (আমদানি অনুমতি) দিলে বাজারে দাম কমে যাবে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
তিনি বলেন, এবার পুরো বছর দেশি পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে। দাম বাড়লেও এসব টাকা আমাদের কৃষকদের হাতে যাচ্ছে। কৃষকরা লাভবান হলে তারা আরও বেশি চাষে উৎসাহী হবেন। আর ডিসেম্বর মাস এলে ‘মুড়িকাটা’ নতুন পেঁয়াজ বাজারে চলে আসবে। তখন দাম কমে যাবে।
বিশ্লেষকদের মতে, পেঁয়াজ এর দাম নিয়ে যাতে কোন অসাধু চক্র কোনো ‘কারসাজি’ করে জনভোগান্তি সৃষ্টি না করতে পারে-সেজন্য সরকারকে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। আর এজন্য নিয়মিত বাজার মনিটরিং এবং সরবরাহ ও চাহিদার বিষয়টি মাথায় রেখে গোয়েন্দা সংস্থাসহ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে তৎপর থাকার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি বলে মনে করেন তারা।
ভোরের আকাশ/এসএইচ