মে মাসে ভ্যাট ও শুল্ক কর আদায়ে ধ্বস

চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের মে মাসে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সার্বিক রাজস্ব আদায়ে কিছুটা প্রবৃদ্ধি হলেও মূল্য সংযোজন কর (মূষক) এবং আমদানি শুল্ক কর আদায়ে বড় ধরণের নিম্নমূখি প্রবণতা দেখা গেছে। গত বছরের তুলনায় মূষক বা ভ্যাট আদায় কমেছে শুন্য দশমিক ১৫ শতাংশ এবং শুল্ক কর আদায় কমেছে ৯ দশমিক ৪৯ শতাংশ। ঐতিহ্যগতভাবে বছরের শেষ দুই মাসে (মে এবং জুন) রাজস্ব আদায়ে বড় ধরণের উত্থান দেখা গেলেও এবার তার ব্যতিক্রম হয়েছে বলে মনে করছেন সংস্থাটির কর্মকর্তারা।
কর্মকর্তারা বলছেন, সরকারের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মকান্ডে ধীর গতি, উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের ভোগ কমে যাওয়া, সার্বিক ব্যবসা-বানিজ্য পরিস্থিতি এখনো স্বাভাবিক হয়নি। ফলে মুষক বা ভ্যাট আদায়ে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি হয়েছে। তাছাড়া প্রস্তাবিত বাজেটে শিল্পায়ন বাড়াতে বেশ কিছু কাঁচামাল আমদানিতে ছাড় দেওয়া হয়েছে, যার পূর্বাভাস আগে থেকেই ব্যবসায়ীরা বুঝতে পারে এবং তারা ঐ সকল পণ্য আমদানি কমিয়ে দিয়েছিল। এ কারণে শুল্ক কর আদায় কমে গেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এনবিআরের এক কর্মকর্তা বলেন, “বর্তমানে ব্যবসায়ী পর্যায়ে জ্বালানি তেলে মূল্য সংযোজন হচ্ছে না। বকেয়া আদায়েও ছিল ধীর গতি। ফলে মে মাসে ভ্যাট আদায় অন্তত ৫ হাজার কোটি টাকা কম হয়েছে। যার প্রভাব সার্বিক রাজস্ব আদায়ে পড়েছে।”
এনবিআরের সর্বশেষ তথ্যমতে, মে মাসে মোট রাজস্ব আহরণ হয়েছে ৩২ হাজার ১৮৫ কোটি টাকা, যা আগের অর্থবছরের একই মাসের তুলনায় ২ দশমিক ৮৬ শতাংশ বেশি। তবে মাসটির জন্য নির্ধারিত ৩৩ হাজার ১০৫ কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় আদায় কম হয়েছে ৯১৯ কোটি ৯৫ লাখ টাকা।
তথ্য অনুযায়ী, মে মাসে রাজস্ব আদায়ে সবচেয়ে বেশি প্রবৃদ্ধি এসেছে আয়কর ও ভ্রমণ কর খাতে। এ খাতে আদায় হয়েছে ৯ হাজার ৩৪৮ কোটি টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৯ দশমিক ৬৫ শতাংশ বেশি। তবে এ খাতেও নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়নি। লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১১ হাজার ১৮৫ কোটি টাকা।
অন্যদিকে স্থানীয় পর্যায়ের ভ্যাট খাতে আদায় হয়েছে ১৩ হাজার ৩৭৬ কোটি টাকা, যা নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার প্রায় সমান। তবে গত বছরের মে মাসের তুলনায় এ খাতে শুন্য দশমিক ১৫ শতাংশ ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধি হয়েছে।
আমদানি ও রপ্তানি শুল্ক খাতে আদায় হয়েছে ৯ হাজার ৪৬১ কোটি টাকা। যদিও লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় আদায় বেশি হয়েছে, তবে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এ খাতে প্রবৃদ্ধি ঋণাত্মক ৯ দশমিক ৪৯ শতাংশ। আমদানি পর্যায়ে শুল্ক কমানো এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যের ধীরগতির প্রভাব এ খাতে রাজস্ব প্রবৃদ্ধিকে নেতিবাচক করেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এ বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক মূখ্য অর্থনীতিবিদ ড জাহিদ হোসেন বলেন, মে মাসে প্রবৃদ্ধি ইতিবাচক থাকলেও তা প্রত্যাশার তুলনায় কম। বিশেষ করে মূসক ও শুল্ক খাতে কাঙ্ক্ষিত গতি না থাকায় সামগ্রিক রাজস্ব আহরণ লক্ষ্যমাত্রার নিচে নেমে এসেছে।
ব্যবসা-বাণিজ্যের ধীরগতি, আমদানি হ্রাস এবং কর প্রশাসনের কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এর অন্যতম কারণ বলেও মনে করেন তিনি।
তবে চলতি অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে রাজস্ব আদায়ের চিত্র তুলনামূলকভাবে ইতিবাচক। জুলাই-মে সময়ে মোট রাজস্ব আদায় হয়েছে ৩ লাখ ৬০ হাজার কোটি টাকা, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ১০ দশমিক ০২ শতাংশ বেশি।
এনবিআরের কর্মকর্তারা বলছেন, অর্থবছরের শেষ মাস জুনে বড় করদাতাদের কাছ থেকে আয়কর, মূসক ও বকেয়া রাজস্ব আদায়ের মাধ্যমে ঘাটতি কমিয়ে আনার চেষ্টা চলছে। তবে নির্ধারিত বার্ষিক লক্ষ্যমাত্রা অর্জন এখনও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে।
ভোরের আকাশ/এনএস