যুদ্ধ থামার ইঙ্গিত?
যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে যাচ্ছে জেরাল্ড আর ফোর্ড

বিশ্বের বৃহত্তম বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস জেরাল্ড আর. ফোর্ড টানা ৩০০ দিনেরও বেশি সময় মোতায়েন থাকার পর অবশেষে যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে যাচ্ছে। বুধবার (২৯ এপ্রিল) দুই মার্কিন কর্মকর্তা জানান, এই রেকর্ড সৃষ্টিকারী অভিযানে জাহাজটি ইরানের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং ভেনেজুয়েলার নেতা নিকোলাস মাদুরোকে গ্রেপ্তারের মিশনে অংশ নিয়েছিল।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কর্মকর্তারা জানান, আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই ফোর্ড মধ্যপ্রাচ্য ত্যাগ করবে এবং মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে ভার্জিনিয়ায় তার নিজস্ব ঘাঁটিতে পৌঁছাবে। এ খবরটি প্রথম প্রকাশ করে দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট।
গত সপ্তাহে ইউএসএস জর্জ এইচ. ডব্লিউ. বুশ মধ্যপ্রাচ্যে পৌঁছানোর ফলে বর্তমানে ওই অঞ্চলে তিনটি মার্কিন বিমানবাহী রণতরী মোতায়েন রয়েছে—যা ২০০৩ সালের পর এই প্রথম। এছাড়া তেহরানের সঙ্গে উত্তেজনা বৃদ্ধির পর গত জানুয়ারি থেকে ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনও সেখানে অবস্থান করছে।
চলতি মাসেই ফোর্ড একটি নতুন রেকর্ড গড়েছে। গত জুনে নরফোক নেভাল স্টেশন থেকে যাত্রা শুরু করার পর প্রায় ১০ মাস সমুদ্রে অবস্থান করে এটি ভিয়েতনাম যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ের দীর্ঘতম মোতায়েনের রেকর্ড ভেঙেছে।
ইউএস নেভাল ইনস্টিটিউট নিউজের তথ্য অনুযায়ী, সমুদ্রে ফোর্ডের ২৯৫তম দিনটি গত ৫০ বছরের মধ্যে যেকোনো রণতরীর দীর্ঘতম অবস্থানের রেকর্ড অতিক্রম করে। এর আগে ২০২০ সালে করোনা মহামারীর সময় ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন ২৯৪ দিন সমুদ্রে অবস্থান করে এই রেকর্ড গড়েছিল।
ফোর্ডের এই দীর্ঘ মোতায়েন নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে দীর্ঘ সময় পরিবারের বাইরে থাকার কারণে নাবিকদের মানসিক চাপ এবং জাহাজের যন্ত্রপাতির ওপর অতিরিক্ত চাপ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে জাহাজটিতে একবার আগুন লাগার ঘটনা ঘটে, যার ফলে দীর্ঘ সময় ধরে মেরামতের কাজ করতে হয়েছে।
হাউজ আর্মড সার্ভিসেস কমিটির এক শুনানিতে এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ জানান, তিনি নৌবাহিনীর সঙ্গে আলোচনা করেছেন এবং কর্মকর্তারা রণতরীর প্রস্তুতি ও রক্ষণাবেক্ষণসংক্রান্ত কিছু সমস্যার কথা উল্লেখ করেছেন।
তিনি বলেন, সাউথকম (ল্যাটিন আমেরিকা) এবং সেন্টকম (মধ্যপ্রাচ্য)—উভয় অঞ্চলে জরুরি ভিত্তিতে অতিরিক্ত সামরিক শক্তির প্রয়োজন হওয়ায় কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়ে বারবার রণতরীর মোতায়েনের সময় বাড়ানো হয়েছে।
ফোর্ড তার যাত্রা শুরু করেছিল ভূমধ্যসাগর থেকে। পরে গত অক্টোবরে বৃহৎ নৌ-তৎপরতার অংশ হিসেবে সেটিকে ক্যারিবীয় সাগরে পাঠানো হয়। এই রণতরীটি ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে গ্রেপ্তারের সামরিক অভিযানে অংশ নেয়। পরবর্তীতে ইরানের সঙ্গে উত্তেজনা বৃদ্ধি পেলে এটি মধ্যপ্রাচ্যের দিকে মোড় নেয়।
ফোর্ড ভূমধ্যসাগর থেকে ইরান সংশ্লিষ্ট সংঘাতের শুরুর দিকে অভিযানে অংশ নেয় এবং পরে সুয়েজ খাল অতিক্রম করে মার্চের শুরুতে লোহিত সাগরে প্রবেশ করে। জাহাজটির একটি লন্ড্রি কক্ষে আগুন লাগার ফলে শত শত নাবিকের থাকার স্থান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর ফলে জাহাজটিকে মেরামতের জন্য পুনরায় ভূমধ্যসাগরে ফিরে যেতে হয়।
তবে ফোর্ডের ২৯৫ দিনের এই রেকর্ড স্নায়ুযুদ্ধকালীন একটি রেকর্ড ভাঙতে পারেনি। বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত ইউএসএস মিডওয়ে ১৯৭২-৭৩ সালে টানা ৩৩২ দিন মোতায়েন থেকে সেই রেকর্ড ধরে রেখেছে। সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান
এই রণতরীর প্রত্যাহারকে অনেক বিশ্লেষক সম্ভাব্য উত্তেজনা কমার ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন। যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধের সমাপ্তি বা স্থায়ী যুদ্ধবিরতির ঘোষণা এখনো আসেনি, তবুও বড় সামরিক সম্পদ সরিয়ে নেওয়া পরিস্থিতির পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয় বলে মনে করা হচ্ছে।
ভোরের আকাশ/সু.পা