হরমুজ দিয়ে সার পরিবহনে ব্যর্থতা বৈশ্বিক খাদ্যসংকট ডেকে আনতে পারে: জাতিসংঘ

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে বৈশ্বিক সার পরিবহন সংক্রান্ত একটি চুক্তি না হলে এশিয়া ও আফ্রিকার বিস্তৃত অঞ্চলে মারাত্মক খাদ্য নিরাপত্তা সংকট দেখা দিতে পারে বলে সতর্ক করেছেন জাতিসংঘের এক শীর্ষ কর্মকর্তা। জাতিসংঘের প্রস্তাবিত এই মেকানিজমটি তদারকির দায়িত্বে থাকা উপ-মহাসচিব জর্জে মোরেইরা দা সিলভা এ বিষয়ে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। রয়টার্সের প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সংঘাতের কারণে কৌশলগত দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে সারবাহী জাহাজের চলাচল বন্ধ রয়েছে। এ পথ দিয়ে নিরাপদে সার সরবরাহের লক্ষ্যে গত মার্চ মাসে একটি বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন করেছিল জাতিসংঘ। ব্যাংককে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সম্মেলনের ফাঁকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে মোরেইরা দা সিলভা জানান, ওয়াশিংটন ও তেহরানের সম্মতি পেলে মাত্র ৭ থেকে ১০ দিনের মধ্যে জাতিসংঘের এই বিশেষ ব্যবস্থা চালু করা সম্ভব।
তিনি বলেন, ‘আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে এই চুক্তিতে পৌঁছানো অত্যন্ত জরুরি। তা না হলে কৃষক সম্প্রদায় আসন্ন ফসল রোপণের মৌসুম হারিয়ে ফেলবে। আর রোপণ মৌসুম হাতছাড়া হলে কৃষির উৎপাদনশীলতা ভয়াবহভাবে ধসে পড়বে এবং খাদ্যপণ্যের দাম হু হু করে বাড়বে।’
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন ও ইসরাইলি বিমান হামলার পর থেকে হরমুজ প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ জোরদার করে তেহরান। ওয়াশিংটনকে চাপে ফেলতে এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথের চলাচলে কড়াকড়ি আরোপ করেছে তারা। যার বিপরীতে মার্কিন বাহিনীও ইরানি বন্দরগুলোতে নৌ-অবরোধ জারি রেখেছে। সংঘাতের আগে বিশ্বের ইউরিয়া সার বাণিজ্যের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এবং রাসায়নিক কাঁচামাল সালফারের প্রায় অর্ধেক এই প্রণালি দিয়েই পরিবহন করা হতো।
ওয়াশিংটনভিত্তিক দ্য ইন্টারন্যাশনাল ফুড পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, সংঘাত শুরুর ছয় মাসের বেশি সময় পার হলেও উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে সার রপ্তানি অনেকটাই স্তব্ধ রয়েছে। জুন থেকে জুলাইয়ের মাঝামাঝি সময়ে সাময়িক যুদ্ধবিরতি চলাকালেও নামমাত্র সার পরিবহন সম্ভব হয়েছিল।
ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, হরমুজ প্রণালিতে এই অচলাবস্থা অব্যাহত থাকলে শস্যের দাম ৮১ শতাংশ, ভোজ্যতেলের মূল কাঁচামালের দাম ৬৬ শতাংশ এবং প্রাণিজ পণ্যের দাম ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে।
জাতিসংঘের প্রস্তাবিত পরিকল্পনা অনুযায়ী, ওমানে একটি সমন্বয় কেন্দ্র খোলা হবে যেখানে পণ্যবাহী জাহাজ নিবন্ধিত হবে এবং জাতিসংঘের পর্যবেক্ষকেরা উপসাগরীয় বন্দরগুলোতে সারের চালান তদারকি করবেন। মোরেইরা দা সিলভা জানান, প্রতিদিন মাত্র পাঁচটি সারবাহী জাহাজ নিরাপদে যাতায়াত করতে পারলেই এশিয়া ও আফ্রিকার চরম ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোতে জরুরি সার পৌঁছে দেয়া সম্ভব হবে।
জুন মাসের সাময়িক যুদ্ধবিরতি ভেঙে যাওয়ার পর থেকে তৃতীয় দেশের মধ্যস্থতায় প্রস্তাব আদান-প্রদান করছে ওয়াশিংটন ও তেহরান। কিন্তু পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধে ওয়াশিংটনের তাগিদ এবং তেহরানের নিজস্ব শর্তের কারণে হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালুর বিষয়ে এখনো চুক্তি হয়নি। জাতিসংঘের উপ-মহাসচিব উভয় পক্ষকে রাজনৈতিক আলোচনার পাশাপাশি জরুরি সারের জাহাজ চলাচলের অনুমতি দেয়ার আহ্বান জানান।
একই সঙ্গে কৃষ্ণসাগর অঞ্চলে নতুন হামলা এবং লোহিত সাগরে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের আগ্রাসনের কারণে বৈশ্বিক খাদ্য নিরাপত্তার ক্ষেত্রে এক বহুমুখী ট্র্যাজেডি তৈরি হয়েছে উল্লেখ করে জাতিসংঘের এই শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা একসঙ্গে কয়েকটি সংকটের মুখোমুখি হয়েছি—জলবায়ু সংকট এবং একই সঙ্গে কৃষ্ণসাগর, লোহিত সাগর ও হরমুজ প্রণালির মতো প্রধান সমুদ্রপথগুলোর রুদ্ধ হয়ে পড়া।’
ভোরের আকাশ/এনএস