কলম্বিয়ার নতুন প্রেসিডেন্টের প্রথম দিনেই ১০০ কোটি ডলার দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র

কলম্বিয়ার নতুন ডানপন্থী প্রেসিডেন্ট আবেলার্দো দে লা এসপ্রিয়েলা দায়িত্ব নেওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই দেশটিকে ১০০ কোটি ডলার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এই অর্থ নিরাপত্তা খাতে সহায়তা হিসেবে দেওয়া হবে বলে জানিয়েছে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর। দে লা এসপ্রিয়েলা যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ ও সমর্থক হিসেবে পরিচিত। নির্বাচনী প্রচারের সময় তিনি ট্রাম্পের বিভিন্ন নীতির সঙ্গে মিল রেখে বক্তব্য দিয়েছেন। দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম ভাষণেই তিনি মাদক চক্র ও সশস্ত্র গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ‘সর্বাত্মক যুদ্ধের’ ঘোষণা দিয়েছেন।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর বলেছে, এই নিরাপত্তা সহায়তা কলম্বিয়াকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ‘অভিন্ন লক্ষ্য’ অর্জনে সহায়তা করবে। এর মধ্যে সংঘবদ্ধ অপরাধ, মাদক চোরাচালান এবং অবৈধ অভিবাসনের বিরুদ্ধে লড়াই রয়েছে। দে লা এসপ্রিয়েলার নীতির সঙ্গে তার পূর্বসূরি ও বামপন্থী নেতা গুস্তাভো পেত্রোর নীতির বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে। পেত্রো সশস্ত্র সংঘাত বন্ধে আলোচনাকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন। বিপরীতে দে লা এসপ্রিয়েলা অপরাধী ও সশস্ত্র গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে কঠোর সামরিক ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলছেন।
লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশে অর্থনৈতিক সংকট, অপরাধ ও সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সহিংসতা নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে ডানপন্থী রাজনীতির জনপ্রিয়তা বাড়ছে। কলম্বিয়ায় দে লা এসপ্রিয়েলার জয়কে এই পরিবর্তনের সর্বশেষ উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব নেওয়ার পর ট্রাম্পও লাতিন আমেরিকার রাজনীতিতে আরো সক্রিয় হয়েছেন। তিনি রাজনৈতিকভাবে ঘনিষ্ঠ নেতাদের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়িয়েছেন। অন্যদিকে যেসব নেতার সঙ্গে তার মতবিরোধ রয়েছে, তাদের থেকে দূরত্ব বজায় রেখেছেন।
কলম্বিয়ার নির্বাচনের আগে ট্রাম্প প্রকাশ্যে দে লা এসপ্রিয়েলাকে সমর্থন করেন। তিনি বলেছিলেন, দে লা এসপ্রিয়েলার পেছনে ‘যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ণ সমর্থন ও শক্তি’ রয়েছে। জুনে দে লা এসপ্রিয়েলা নির্বাচিত হওয়ার পর ট্রাম্প বলেন, তার নেতৃত্বে যুক্তরাষ্ট্র ও কলম্বিয়ার সম্পর্ক আরো ভালো হবে।
দে লা এসপ্রিয়েলা পেশায় আইনজীবী ও ব্যবসায়ী। নির্বাচনী প্রচারে তিনি নিজেকে প্রচলিত রাজনীতির বাইরের একজন নেতা হিসেবে তুলে ধরেন। অপরাধ দমনে তিনি ‘লোহার মুষ্টি’ নীতি নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। প্রেসিডেন্ট হিসেবে তার প্রথম সরকারি ভাষণেই দে লা এসপ্রিয়েলা কঠোর অবস্থানের কথা জানান। কাছের একটি সামরিক ঘাঁটিতে সেনাদের উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে তিনি সশস্ত্র বিদ্রোহীদের দমন, দেশ পুনর্গঠন এবং ‘যুক্তি দিয়ে অথবা শক্তি প্রয়োগ করে’ গণতন্ত্র রক্ষার প্রতিশ্রুতি দেন। নিজের দেওয়া ডাকনাম ‘এল তিগ্রে’ বা ‘দ্য টাইগার’-এর কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, তার সময়ে অপরাধীদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্র কঠোর অবস্থান নেবে। তিনি বলেন, দেশের এমন কোনো জায়গা থাকবে না, যেখানে অপরাধীরা নিজেদের নিরাপদ মনে করতে পারে।
দে লা এসপ্রিয়েলার এই নীতির সঙ্গে এল সালভাদরের প্রেসিডেন্ট নায়িব বুকেলে এবং ইকুয়েডরের প্রেসিডেন্ট দানিয়েল নোবোয়ার নেওয়া কঠোর নিরাপত্তা নীতির তুলনা করা হচ্ছে। তারাও অপরাধ ও সশস্ত্র গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান চালিয়েছেন। দে লা এসপ্রিয়েলার নিরাপত্তা নীতি তার পূর্বসূরি গুস্তাভো পেত্রোর নীতির প্রায় পুরোপুরি বিপরীত। পেত্রো দেশের দীর্ঘদিনের সশস্ত্র সংঘাত বন্ধ করতে ‘পূর্ণ শান্তি’ কৌশল নিয়েছিলেন। এই সংঘাতে গেরিলা গোষ্ঠী, রাষ্ট্রীয় বাহিনী ও মাদক চক্র জড়িত ছিল। পেত্রোর কৌশলে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে আলোচনা এবং শান্তি প্রতিষ্ঠাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। একই সঙ্গে কৃষকদের কোকা চাষ বন্ধ করতে উৎসাহ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।
তবে এই নীতির সমালোচকেরা বলছেন, এতে প্রত্যাশিত ফল আসেনি। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর সদস্যসংখ্যা বেড়েছে। গত বছর কলম্বিয়া-ভেনেজুয়েলা সীমান্তে প্রতিদ্বন্দ্বী বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে ভয়াবহ সংঘর্ষ হয়। এতে কয়েক হাজার মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হন। ট্রাম্পও কলম্বিয়া থেকে যুক্তরাষ্ট্রে মাদক পাচার ও অবৈধ অভিবাসন বাড়ার জন্য পেত্রোর সরকার ও তার নীতিকে বারবার দায়ী করেছেন। পেত্রো লাতিন আমেরিকায় ট্রাম্পের প্রভাবেরও কঠোর সমালোচনা করেছেন। ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে মাদকসংক্রান্ত অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্রে বিচারের মুখোমুখি করার জন্য আটক করার সমালোচনাও করেন তিনি।
পেত্রোর অভিযোগ ছিল, যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপের মাধ্যমে মার্কিন কম্পানিগুলোর জন্য ভেনেজুয়েলার তেল সম্পদ ব্যবহারের সুযোগ তৈরি করা হয়েছে। পেত্রো আরেক মেয়াদে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অংশ নিতে পারেননি। তার সমর্থিত বামপন্থী প্রার্থী ইভান সেপেদাও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে স্বাধীন অবস্থানের কথা বলেছেন। তাদের বক্তব্য ছিল, কলম্বিয়াকে যুক্তরাষ্ট্রের আরেকটি ‘অধীন রাষ্ট্র’ হওয়া উচিত নয়।
দে লা এসপ্রিয়েলার অবস্থান এর সম্পূর্ণ বিপরীত। দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই তিনি জানান, কলম্বিয়া ট্রাম্প প্রতিষ্ঠিত ‘আমেরিকার ঢাল’ নিরাপত্তা জোটে যোগ দেবে। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে। দপ্তরটি বলেছে, দে লা এসপ্রিয়েলার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিমুখী কর্মসূচি দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য বাড়ানো এবং অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরো গভীর করার সুযোগ তৈরি করেছে।
দে লা এসপ্রিয়েলার নেতৃত্বে কলম্বিয়া এখন ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি করা লাতিন আমেরিকার ডানপন্থী সরকারগুলোর কাতারে যুক্ত হলো। এর মধ্যে রয়েছে আর্জেন্টিনা। দেশটির উদারপন্থী প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলে দে লা এসপ্রিয়েলার পছন্দের নেতাদের একজন। আর্জেন্টিনা যুক্তরাষ্ট্রের কোষাগার থেকে ২০০০ কোটি ডলারের আর্থিক সহায়তা পেয়েছে।
ট্রাম্প বলেছেন, মিলের পরিবর্তে কোনো বামপন্থী নেতা আর্জেন্টিনার ক্ষমতায় এলে দেশটির প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনের বিষয়টি তিনি ‘অনেকটাই ভিন্নভাবে’ বিবেচনা করবেন। অন্যদিকে ভেনেজুয়েলার মাদুরো সরকারের বিরুদ্ধে নেওয়া কঠোর অবস্থানের মতো কিউবার কমিউনিস্ট সরকারের বিরুদ্ধেও একই ধরনের পদক্ষেপ নেওয়ার হুমকি দিয়েছেন ট্রাম্প।
দে লা এসপ্রিয়েলার উত্থান এবং পেরুর কেইকো ফুজিমোরির রাজনৈতিক উত্থানের ফলে লাতিন আমেরিকায় বামপন্থী নেতাদের রাজনৈতিক অবস্থান আরো কঠিন হচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভার ওপরও। এই অঞ্চলে বামপন্থী সরকারের সংখ্যা কমে যাওয়ায় লুলা আগের তুলনায় কম রাজনৈতিক মিত্র পাচ্ছেন। অক্টোবরে ব্রাজিলের রাজনীতিতে নতুন বড় লড়াই হতে পারে। ওই নির্বাচনে লুলার বিরুদ্ধে লড়বেন ফ্লাভিও বলসোনারো।
তিনি কারাগারে থাকা সাবেক প্রেসিডেন্ট জাইর বলসোনারোর ছেলে। জাইর বলসোনারো কট্টর ডানপন্থী জনতুষ্টিবাদী নেতা এবং ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত। দে লা এসপ্রিয়েলা যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি ইসরায়েলের সঙ্গেও শক্তিশালী সামরিক সম্পর্ক গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এ ক্ষেত্রেও তার অবস্থান পেত্রোর নীতির বিপরীত। গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান নিয়ে পেত্রো ইসরায়েল সরকারের তীব্র সমালোচনা করেন। একপর্যায়ে তিনি ইসরায়েলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করেন। একই সঙ্গে ফিলিস্তিনিদের অধিকার সমর্থন করেন তিনি।
আবেলার্দো দে লা এসপ্রিয়েলা নিজেকে ‘এল তিগ্রে’ বা ‘দ্য টাইগার’ নামে পরিচয় দেন। তিনি একজন আইনজীবী ও ধনী ব্যবসায়ী। গণমাধ্যমে তার ভালো উপস্থিতি রয়েছে। নির্বাচনী প্রচারে তিনি নিজেকে প্রচলিত রাজনৈতিক ব্যবস্থার বাইরে থাকা একজন ‘বহিরাগত’ হিসেবে তুলে ধরেন। তিনি বলেছিলেন, সরকার পরিচালনায় তিনি ‘চিরাচরিত সন্দেহভাজনদের’ ওপর নির্ভর করবেন না। এর মাধ্যমে তিনি পেত্রোর আগের কলম্বিয়ার রাজনৈতিক অভিজাতদের বোঝান।
দে লা এসপ্রিয়েলা রাজধানী বোগোটায় নয়, দেশের পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর ক্যালিতে প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। এর মাধ্যমে তিনি কলম্বিয়ার প্রচলিত ও কেন্দ্রভিত্তিক রাজনৈতিক সংস্কৃতি থেকে নিজেকে আলাদা হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করেন। রাজনীতিতে আসার আগে তিনি আইনজীবী হিসেবে সফল ক্যারিয়ার গড়ে তোলেন। একসময় মাদক পাচারের সঙ্গে জড়িত সশস্ত্র গোষ্ঠীর সদস্যদের পক্ষেও তিনি আইনজীবী হিসেবে কাজ করেছেন। এখন প্রেসিডেন্ট হিসেবে তিনি একই ধরনের অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলছেন।
আরেক রক্ষণশীল প্রার্থী গুলিতে নিহত হওয়ার প্রায় এক মাস পর দে লা এসপ্রিয়েলা নিজের প্রেসিডেন্ট প্রার্থিতা ঘোষণা করেন। এরপর নির্বাচনী প্রচারে তাকে প্রায়ই কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে দেখা যায়। কখনো তিনি বুলেটপ্রুফ কাচের আড়াল থেকে বক্তব্য দিয়েছেন। কখনো পরেছেন বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট। আবার কখনো কলম্বিয়ার জাতীয় ফুটবল দলের জার্সি পরে প্রচারে অংশ নিয়েছেন।
দে লা এসপ্রিয়েলা বহু বছর মিয়ামিতে বসবাস ও কাজ করেছেন। ২০২৩ সাল থেকে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক। দে লা এসপ্রিয়েলার শপথ অনুষ্ঠানে যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাটর্নি জেনারেল টড ব্লঁশ উপস্থিত ছিলেন। আন্তর্জাতিক ফুটবল সংস্থার সভাপতি জিয়ানি ইনফান্তিনোও অনুষ্ঠানে অংশ নেন। ইনফান্তিনোর সঙ্গে দক্ষিণ আমেরিকার ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রধানও অনুষ্ঠানে ছিলেন।
ভোরের আকাশ/এসএইচ