মোখা দখলের পর বাব আল-মান্দেবের দিকে হুথিরা, উদ্বেগে সৌদি

ইয়েমেনের গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী মোখা নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার পর কৌশলগত কয়েকটি দ্বীপের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীরা। এতে লোহিত সাগরের দক্ষিণ প্রান্তের গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মান্দেব প্রণালি ঘিরে হুথিদের প্রভাব বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এই অগ্রগতি ইয়েমেনের যুদ্ধকে নতুন মাত্রা দেওয়ার পাশাপাশি সৌদি আরবের নিরাপত্তা, তেল রপ্তানি ও আন্তর্জাতিক নৌবাণিজ্য নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিতে নৌযান চলাচল সীমিত হয়ে পড়ায় সৌদি আরবের জন্য লোহিত সাগরের নৌপথ আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ফলে বাব আল-মান্দেবে হুথিদের প্রভাব বাড়লে এর সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে সৌদি তেল রপ্তানি ও বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে।
মোখা দখল, কৌশলগত দ্বীপের দিকে অগ্রসর
১০ সেপ্টেম্বর ইয়েমেনের গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী মোখা নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার পর লোহিত সাগরের উপকূল ধরে আরও দক্ষিণে অগ্রসর হয়েছে হুথি বাহিনী। ইয়েমেন সরকারের সামরিক সূত্রের দাবি, হুথিরা কৌশলগত হানিশ দ্বীপপুঞ্জেও পৌঁছেছে।
এই অগ্রগতির ফলে বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে হুথিদের প্রভাব আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। লোহিত সাগরের সঙ্গে এডেন উপসাগর এবং পরবর্তী সময়ে ভারত মহাসাগরের যোগাযোগ তৈরি করেছে এই প্রণালি। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবহনের জন্য তাই এর কৌশলগত গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। হুথিদের এই অগ্রগতি এমন সময় ঘটছে, যখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন, ইরান যুদ্ধ নভেম্বরের মধ্যবর্তী মার্কিন নির্বাচনের পর শেষ হতে পারে।
বাব আল-মান্দেব কেন গুরুত্বপূর্ণ
হুথিরা যদি বাব আল-মান্দেবের ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারে, তাহলে ইরানের জন্য এটি বড় ধরনের কৌশলগত সুবিধা তৈরি করতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। হরমুজ প্রণালির মতো বাব আল-মান্দেবও বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ পথ। হরমুজ দিয়ে বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবহন হতো। যুদ্ধের কারণে ওই পথ কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সৌদি আরবের জন্য লোহিত সাগরের রুট আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
চলতি বছরের মার্চ থেকে জুলাইয়ের মাঝামাঝি সময়ে বাব আল-মান্দেব দিয়ে সৌদি আরবের সমুদ্রপথে অপরিশোধিত তেল রপ্তানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় আট গুণ বেড়েছে। ২০২৪ সালে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৪১ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল ও পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য এই প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হয়েছে, যা বিশ্বব্যাপী এ ধরনের পণ্যের মোট পরিবহনের প্রায় ৫ শতাংশ। ফলে বাব আল-মান্দেবে বড় ধরনের বাধা সৃষ্টি হলে সৌদি আরবের তেল রপ্তানি ও বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে বড় ধাক্কা আসতে পারে। এর প্রভাব পড়তে পারে আন্তর্জাতিক বাজারেও।
সৌদি জাহাজে হামলার হুমকি
হুথি নিয়ন্ত্রিত ইয়েমেনের মানবিক কার্যক্রম সমন্বয় কেন্দ্র জানিয়েছে, লোহিত সাগরে অন্যান্য নৌযানের চলাচল নিরাপদ থাকবে। তবে সৌদি আরবের জাহাজগুলো এই নিরাপত্তার আওতায় থাকবে না বলে জানানো হয়েছে।
অর্থাৎ সৌদি জাহাজকে লক্ষ্য করে হুথিদের অবরোধ ও হামলার হুমকি অব্যাহত রয়েছে। এরই মধ্যে জুলাইয়ে সৌদি আরবের বিরুদ্ধে নৌ অবরোধের ঘোষণা দিয়েছিল হুথিরা। চলতি মাসে তারা হামলা আরও জোরদার করেছে। হুথিদের হামলার মধ্যে সৌদি আরবের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর খামিস মুশাইতে ২৪ ঘণ্টায় চতুর্থবারের মতো জরুরি সতর্কতা জারি করেছে দেশটির বেসামরিক প্রতিরক্ষা কর্তৃপক্ষ।
জাতিসংঘের সতর্কবার্তা
ইয়েমেন পরিস্থিতি নিয়ে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকে বিশেষ দূত হ্যান্স গ্রুন্ডবার্গ সতর্ক করে বলেছেন, ইয়েমেনের যুদ্ধ আরও নতুন ও বিপজ্জনক পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। মোখার নিয়ন্ত্রণ হুথিদের হাতে যাওয়ায় গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক নৌপথের প্রবেশপথে তাদের সরাসরি উপস্থিতি তৈরি হয়েছে।
এতে নৌযান চলাচলের স্বাধীনতা নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি জেনিফার নাইডহার্ট ডি অর্টিজ হুথিদের ইরানের ‘এজেন্ট ও হাতিয়ার’ হিসেবে অভিযুক্ত করেছেন। তাঁর দাবি, হুথিদের উত্তেজনা বৃদ্ধি গ্রহণযোগ্য নয় এবং যারা তাদের কর্মকাণ্ডে সহায়তা করছে, তাদের পরিণতির দায় নিতে হবে।
ইরান-সৌদি সংঘাতের নতুন মাত্রা
ইরান ও সৌদি আরব দীর্ঘদিন ধরে মধ্যপ্রাচ্যে প্রভাব বিস্তার নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছে। ইরান সরাসরি সৌদি আরবের সঙ্গে সংঘাতে না গিয়ে ইয়েমেন, লেবানন ও ইরাকের মতো দেশে মিত্র ও সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর মাধ্যমে প্রভাব ধরে রেখেছে বলে মনে করা হয়। হুথিদের সাধারণত ইরান-সমর্থিত ‘প্রতিরোধ অক্ষের’ অংশ হিসেবে দেখা হলেও তাদের নিজস্ব সংগঠন, স্বার্থ ও রাজনৈতিক লক্ষ্যও রয়েছে। ইয়েমেনের দীর্ঘ যুদ্ধে তারা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহারে উল্লেখযোগ্য সক্ষমতা তৈরি করেছে।
২০১৪ সালে হুথিরা ইয়েমেনের রাজধানী সানা দখল করার পর সংঘাত বড় আকার নেয়। ২০১৫ সালে সৌদি আরবের নেতৃত্বে একটি সামরিক জোট হুথিদের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করে। লক্ষ্য ছিল তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আবদ-রাব্বু মনসুর হাদির সরকারকে পুনরায় ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনা। ২০২২ সালে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় বড় ধরনের লড়াই বন্ধ হলেও এবার নতুন করে সংঘাত তীব্র হয়েছে। চলতি সপ্তাহে হুথিদের হামলায় সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চলের তেল স্থাপনাও লক্ষ্যবস্তু হয়েছে এবং কয়েক ডজন মানুষ আহত হয়েছেন।
তেলের বাজারে তাৎক্ষণিক প্রভাব
হুথিদের অগ্রগতির খবর প্রকাশের পর আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দ্রুত বেড়েছে। বৃহস্পতিবার ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম একপর্যায়ে ব্যারেলপ্রতি ১০৫ ডলারের ওপরে উঠে যায়, যা প্রায় ৪ শতাংশ বৃদ্ধি। যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের জাতীয় গড় দামও প্রথমবারের মতো গ্যালনপ্রতি ৬ ডলার ছাড়িয়েছে বলে জানিয়েছে গ্যাসবাডি। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দুই নৌপথ—হরমুজ ও বাব আল-মান্দেব—একই সময়ে সংঘাতের ঝুঁকিতে পড়ায় জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
পাকিস্তানের সতর্কবার্তা, ইরানের অস্বীকার
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পাকিস্তান ইরানকে হুথিদের নিয়ন্ত্রণে রাখার আহ্বান জানিয়েছে বলে সৌদি, পাকিস্তানি ও ইরানি সূত্রের বরাত দিয়ে জানা গেছে। সৌদি আরবের পক্ষ থেকে পাকিস্তান এই সতর্কবার্তা তেহরানের কাছে পৌঁছে দেয়। তবে এক জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তা বলেছেন, ইরান হুথিদের নিয়ন্ত্রণ করে না।
এদিকে সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের সাম্প্রতিক মক্কা চুক্তিও পরিস্থিতিকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। চুক্তি অনুযায়ী, কোনো একটি সদস্য দেশ হামলার শিকার হলে সেটিকে সব সদস্যের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করার কথা বলা হয়েছে। এরই মধ্যে সৌদি আরবে পাকিস্তানের সেনা ও যুদ্ধবিমান মোতায়েনের খবরও এসেছে।
সামনে আরও বড় সংকটের আশঙ্কা
ইয়েমেন উপকূলে হুথিদের অগ্রগতি এমন এক সময়ে ঘটছে, যখন ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের কারণে উপসাগরীয় নৌপথে বড় ধরনের উত্তেজনা চলছে। হরমুজ প্রণালির পাশাপাশি এখন বাব আল-মান্দেব ও লোহিত সাগরও সংঘাতের ঝুঁকিতে রয়েছে।
হুথিরা বাব আল-মান্দেবে প্রভাব বাড়াতে পারলে সৌদি আরবের তেল রপ্তানি, আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল ও বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে তেলের দাম বাড়লে ইরান যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসার জন্য ট্রাম্প প্রশাসনের প্রচেষ্টাও আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
সব মিলিয়ে ইয়েমেনের পশ্চিম উপকূলে হুথিদের অগ্রগতি এখন আর শুধু একটি দেশের গৃহযুদ্ধের বিষয় নয়। এটি সৌদি আরবের নিরাপত্তা, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হয়ে পড়েছে। সূত্র: রয়টার্স, আল-জাজিরা, বিবিসি
ভোরের আকাশ/সু.পা