জেনেভায় শান্তি আলোচনায় রাশিয়া-ইউক্রেন প্রতিনিধিদের বৈঠক

রাশিয়া ও ইউক্রেনের আলোচকরা মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) জেনেভায় দুই দিনের যুক্তরাষ্ট্র-মধ্যস্থ শান্তি আলোচনায় অংশ নিতে একত্রিত হয়েছেন। আলোচনার প্রধান অচলাবস্থার বিষয় হলো ভূখণ্ড। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কিয়েভকে দ্রুত সমঝোতায় পৌঁছাতে চাপ দিচ্ছেন।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপের সবচেয়ে বড় যুদ্ধের অবসান ঘটাতে মস্কো ও কিয়েভকে চুক্তিতে পৌঁছাতে চাপ দিচ্ছেন ট্রাম্প। তবে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি অভিযোগ করেছেন, ছাড় দেওয়ার ক্ষেত্রে তার দেশই সবচেয়ে বেশি চাপে রয়েছে।
আলোচনার আগে রাশিয়া রাতভর ইউক্রেনের বিভিন্ন অঞ্চলে ব্যাপক বিমান হামলা চালায়। দক্ষিণের বন্দরনগরী ওডেসা -তে বিদ্যুৎ অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে বলে জানান জেলেনস্কি। এতে হাজার হাজার মানুষ তাপ ও পানির সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়েছে।
জেলেনস্কি তার মিত্রদের প্রতি আহ্বান জানান, রাশিয়ার ওপর আরও কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ এবং ইউক্রেনকে অস্ত্র সরবরাহ বাড়িয়ে একটি “বাস্তব ও ন্যায্য” শান্তি চুক্তির জন্য চাপ বৃদ্ধি করতে।
‘ইউক্রেনকে দ্রুত আলোচনায় আসতে হবে’ — ট্রাম্প
জেনেভায় অনুষ্ঠিতব্য আলোচনার বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প ইউক্রেনের দিকে ইঙ্গিত করেন। সুইজারল্যান্ডের এই শহরে একই সকালে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের কর্মকর্তাদের মধ্যে পৃথক বৈঠকও অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা।
এয়ার ফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, “আমাদের বড় আলোচনা আছে। এটা খুব সহজ হবে। এখন পর্যন্ত আমি শুধু বলছি, ইউক্রেনকে দ্রুত আলোচনায় আসতে হবে।”
রাশিয়া দাবি করছে, পূর্বাঞ্চলীয় ডোনেৎস্ক অঞ্চলের বাকি ২০ শতাংশ, যা এখনো তাদের নিয়ন্ত্রণে আসেনি, তা ইউক্রেনকে ছেড়ে দিতে হবে। তবে কিয়েভ এ দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে।
ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভের সোমবার সাংবাদিকদের বলেন, “এবারের লক্ষ্য হলো মূল বিষয়গুলোসহ বিস্তৃত নানা ইস্যু নিয়ে আলোচনা করা। এসব মূল বিষয়ের মধ্যে রয়েছে ভূখণ্ড এবং আমাদের উত্থাপিত অন্যান্য দাবি।”
এর আগে সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবি -তে দুই দফা আলোচনা হলেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি। এবার স্থান পরিবর্তন করে আলোচনা হচ্ছে জেনেভা-তে।
ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষে মার্কিন দূত স্টিফেন উইটকফ এবং জ্যারেড কুশনার অংশ নেবেন বলে একটি সূত্র জানিয়েছে।
২৪ ফেব্রুয়ারি রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসনের চতুর্থ বার্ষিকীর ঠিক কয়েক দিন আগে এই জেনেভা বৈঠক অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ২০২২ সালে রাশিয়া ইউক্রেনে পূর্ণাঙ্গ আক্রমণ শুরু করে। এতে হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছে, লাখো মানুষ ঘরছাড়া হয়েছে এবং বহু শহর-গ্রাম ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।
বর্তমানে রাশিয়া ইউক্রেনের প্রায় ২০ শতাংশ ভূখণ্ড দখলে রেখেছে, যার মধ্যে রয়েছে ক্রিমিয়া এবং পূর্বাঞ্চলীয় ডনবাস অঞ্চলের অংশবিশেষ, যা ২০২২ সালের আগেই দখল করা হয়েছিল। সাম্প্রতিক সময়ে জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলার ফলে কঠোর শীতের মধ্যে লাখো ইউক্রেনীয় বিদ্যুৎ ও তাপ থেকে বঞ্চিত হয়েছে।
বড় ধরনের অগ্রগতির সম্ভাবনা কম
ক্রেমলিন জানিয়েছে, রুশ প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেবেন প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের উপদেষ্টা ভ্লাদিমি মেডিনস্কি।
ইউক্রেনীয় প্রতিনিধিরা অতীতে মেডিনস্কির বিরুদ্ধে ইতিহাস নিয়ে বক্তৃতা দিয়ে রাশিয়ার আগ্রাসনকে ন্যায্যতা দেওয়ার অভিযোগ তুলেছেন, যা জেনেভায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতির সম্ভাবনাকে আরও কমিয়ে দিয়েছে।
রাশিয়ার সামরিক গোয়েন্দা প্রধান ইগর কোস্টিউকভ আলোচনায় অংশ নেবেন। পাশাপাশি অর্থনৈতিক বিষয়ক পৃথক ওয়ার্কিং গ্রুপে থাকবেন পুতিনের বিশেষ দূত কিরিল দিমিত্রিয়েভ।
গত শনিবার মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলনে জেলেনস্কি বলেন, তিনি আশা করেন জেনেভার আলোচনা হবে “গুরুত্বপূর্ণ ও বাস্তবসম্মত… তবে কখনও কখনও মনে হয়, দুই পক্ষ সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা বলছে।”
কিয়েভের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেবেন ইউক্রেনের জাতীয় নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা কাউন্সিলের সচিব রুস্তেম উমেরভ এবং জেলেনস্কির চিফ অব স্টাফ কিরিলো বুদানভ। এছাড়া প্রেসিডেন্টের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা সেরহি কিসলিৎসিয়া উপস্থিত থাকবেন।
জেনেভায় রওনা হওয়ার আগে উমেরভ বলেন, “টেকসই ও স্থায়ী শান্তি” প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ইউক্রেনের অবস্থান অপরিবর্তিত রয়েছে।
ভূখণ্ড ইস্যুর পাশাপাশি, জাপোরিঝিয়া পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নিয়ন্ত্রণ এবং যুদ্ধ-পরবর্তী ইউক্রেনে পশ্চিমা সেনাদের সম্ভাব্য ভূমিকা নিয়েও রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে বড় ধরনের মতপার্থক্য রয়ে গেছে।
ভোরের আকাশ/তা.কা