চেরনোবিল পারমাণবিক বিপর্যয়ের ৪০ বছর পরও বিষাক্ত চিহ্ন বহন করছে প্রকৃতি

আজ ২৬ এপ্রিল ২০২৬। ঠিক ৪০ বছর আগে এই দিনেই বিশ্ব এক ভয়াবহ দুর্ঘটনার সাক্ষী হয়েছিল। ১৯৮৬ সালের ২৬ এপ্রিলের সেই ঘটনা ‘চেরনোবিল পারমাণবিক বিপর্যয়’ নামে পরিচিত। চার দশক আগের এই পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিপর্যয়ের প্রভাব আরও হাজার হাজার বছর স্থায়ী হবে বলে ধারণা করা হয়।
এই বিদ্যুৎকেন্দ্রটি ইউক্রেনীয় সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রের কিয়েভ অঞ্চলের প্রিপিয়াত শহরের কাছে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। বর্তমানে এটি ইউক্রেনের কিয়েভ অঞ্চলের ভিশগোরোদ জেলায় অবস্থিত। ইতিহাসে এটি সবচেয়ে ভয়াবহ পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র দুর্ঘটনা হিসেবে পরিচিত।
চেরনোবিল পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ইতিহাস
১৯৬৬ সালের ২৯ জুন সোভিয়েত ইউনিয়নের মন্ত্রী পরিষদ ১৯৭৭ সালের মধ্যে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালুর একটি পরিকল্পনা অনুমোদন করে, যার মধ্যে ইউক্রেনে একটি কেন্দ্র নির্মাণের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত ছিল। এ জন্য চেরনোবিল শহর থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে ইয়ানোভ রেলস্টেশনের কাছে একটি স্থান নির্বাচন করা হয়।
এর ধারাবাহিকতায় ১৯৭০ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের কর্মীদের জন্য প্রিপিয়াত নামে একটি নতুন শহর নির্মাণ শুরু হয়। শহরটির পরিকল্পিত জনসংখ্যা ছিল প্রায় ৮৫,০০০। একই বছরের মে মাসে প্রথম ইউনিটের ভিত্তি নির্মাণের কাজ শুরু হয়।
১৯৭৭ সালের ১ আগস্ট প্রথম ইউনিটে আরবিএমকে-১০০০ রিয়্যাক্টরে জ্বালানি সংযোজন করা হয় এবং ২৬ সেপ্টেম্বর বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হয়। সবকিছু ঠিক থাকলেও ১৯৮২ সালের ৯ সেপ্টেম্বর প্রথমবারের মতো একটি দুর্ঘটনা ঘটে। এতে একটি জ্বালানি চ্যানেল ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তবে কেউ আহত হয়নি। ক্ষতি মেরামতে প্রায় তিন মাস সময় লাগে।

ভয়াবহ বিস্ফোরণ ও ১৯৮৬ সালের ঘটনা
১৯৮৬ সালের ২৬ এপ্রিল ভোরে চেরনোবিলের ৪ নম্বর ইউনিটে একটি পরীক্ষা চলাকালে জরুরি কুলিং সিস্টেম বন্ধ করা হয়। রিয়্যাক্টরটি নিরাপদভাবে বন্ধ করা সম্ভব হয়নি এবং রাত ১টা ২৩ মিনিটে বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ড ঘটে।
এটি পারমাণবিক শক্তির ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ দুর্ঘটনা। এতে রিয়্যাক্টর সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায়, ভবনের একটি অংশ ধসে পড়ে এবং বিপুল পরিমাণ তেজস্ক্রিয় পদার্থ পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ে। বিস্ফোরণে পাম্প অপারেটর ভ্যালেরি খোদেমচুক নিহত হন এবং পরে প্রকৌশলী ভ্লাদিমির শাশেনোক হাসপাতালে মারা যান।
প্রায় ১০ দিন ধরে আগুন জ্বলতে থাকে এবং প্রায় ১৪ এক্সাবেকেরেল (৩৮ কোটি কিউরি) তেজস্ক্রিয় পদার্থ ছড়িয়ে পড়ে। ২ লাখ বর্গকিলোমিটারের বেশি এলাকা দূষিত হয়, যার প্রায় ৭০ শতাংশ ইউক্রেন, বেলারুশ ও রাশিয়ায় অবস্থিত। এই দূষণ নরওয়ে, ফিনল্যান্ড ও সুইডেন পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে।
বিপর্যয়ের পর সরকারি অবস্থান
১৯৮৬ সালের ২৮ এপ্রিল প্রথম সরকারি সংক্ষিপ্ত বিবৃতি প্রকাশ করা হয়। পরে মিখাইল গর্বাচেভ জানান, আতঙ্ক এড়াতে ১ মে উদযাপন বাতিল করা হয়নি। ১৪ মে তিনি প্রথমবারের মতো দুর্ঘটনার প্রকৃত চিত্র তুলে ধরেন।
উদ্ধার অভিযান ও পুনর্বাসন কার্যক্রম
দুর্ঘটনার পরপরই বিদ্যুৎকেন্দ্রের কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হয়। হেলিকপ্টার থেকে বোরন, সিসা ও ডলোমাইট ফেলে আগুন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হয়। ২৭ এপ্রিল প্রিপিয়াত শহরের প্রায় ৪৭,৫০০ মানুষকে সরিয়ে নেওয়া হয়। পরবর্তীতে মোট প্রায় ১,১৬,০০০ মানুষকে স্থানান্তর করা হয়। তেজস্ক্রিয় নির্গমন নিয়ন্ত্রণে ১৯৮৬ সালে ‘শেল্টার’ নামে একটি কংক্রিট কাঠামো নির্মাণ করে ক্ষতিগ্রস্ত রিয়্যাক্টর ঢেকে দেওয়া হয়।
ভোরের আকাশ/সু.পা