যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধে ভয়াবহ ক্ষতির পরিসংখ্যান

মধ্যপ্রাচ্যে টানা ৩৯ দিনের রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান অবশেষে একটি অস্থায়ী যুদ্ধবিরতিতে পৌঁছেছে। এই সংঘাতে এখন পর্যন্ত ৫ হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে এবং বাস্তুচ্যুত হয়েছেন ১০ লাখেরও বেশি সাধারণ মানুষ। পাশাপাশি বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহেও সৃষ্টি হয়েছে তীব্র সংকট।
যুদ্ধ শেষে উভয় পক্ষই নিজেদের বিজয় দাবি করলেও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ও মানবিক বিপর্যয়ের চিত্র স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। প্রায় দেড় মাসের এই সংঘাতে সামরিক অবকাঠামো, বেসামরিক স্থাপনা এবং বিপুল সংখ্যক সেনা ও সাধারণ নাগরিক প্রাণ হারিয়েছেন।
ব্যাপক সামরিক অভিযান : প্রাথমিক পর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্র একদিনেই ইরানের ১,০০০-এর বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালায়। একই সময়ে ইসরায়েলি বিমানবাহিনী আরও ৭৫০টি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানে। পরবর্তী সময়ে ২৬ মার্চ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের হামলার সংখ্যা ১০ হাজার ছাড়িয়ে যায় বলে জানান মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ। এপ্রিল নাগাদ এ সংখ্যা ১৩ হাজারের বেশি হয়।
এছাড়া ইরানের অন্তত ১৫৫টি নৌযান ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বলা হয়, ইরানের নৌবাহিনীর সক্ষমতার ৯০ শতাংশের বেশি ধ্বংস করা হয়েছে।
নেতৃত্ব পর্যায়ে ক্ষয়ক্ষতির দাবি : যুদ্ধে ইসরায়েল ২৫০ জনের বেশি ইরানি সামরিক ও রাজনৈতিক নেতাকে হত্যা করেছে বলে দাবি করেছে। যুদ্ধের প্রথম দিনেই ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির নিহত হওয়ার তথ্যও সামনে আসে।
বিপুল সামরিক ব্যয় : যুদ্ধের প্রথম চার সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র ৮৫০টির বেশি টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে, যার প্রতিটির মূল্য প্রায় ৩.৫ মিলিয়ন ডলার। শুধু প্রথম তিন সপ্তাহেই যুদ্ধের খরচ দাঁড়ায় ১.৪ থেকে ২.৯ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে।
এ সময় যুক্তরাষ্ট্র চারটি এফ-১৫ই যুদ্ধবিমান হারায়। পাশাপাশি উদ্ধার অভিযানে দুটি এমসি-১৩০ বিমান ধ্বংস করতে হয়, যার প্রতিটির মূল্য ১০০ মিলিয়ন ডলারের বেশি। ইরান দাবি করেছে, তারা দুটি মার্কিন ব্ল্যাক হক হেলিকপ্টার ধ্বংস করেছে। এছাড়া ১৩ বিলিয়ন ডলারের বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস জেরাল্ড আর. ফোর্ডে আগুন লাগার পর সেটি মেরামতের জন্য গ্রিসে পাঠানো হয়।
ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা : যুদ্ধের শুরুতেই ইরান ১০০ ঘণ্টার মধ্যে ৫০০টির বেশি ক্ষেপণাস্ত্র ও ২,০০০-এর বেশি ড্রোন নিক্ষেপ করে। বাহরাইন, কুয়েত, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শতাধিক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করে। এই সংঘাতে অন্তত ১৬টি দেশ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িয়ে পড়ে।
মানবিক বিপর্যয় : সব মিলিয়ে যুদ্ধের ছয় সপ্তাহে মোট প্রাণহানি দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫,৩৭২ জনে। এর মধ্যে ইরানে নিহত হয়েছেন ৩,৩৬৩ জন, যার মধ্যে ১,৭০১ জন বেসামরিক নাগরিক এবং অন্তত ২৫৪ জন শিশু।
যুদ্ধের প্রথম দিনেই একটি ইরানি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ১৭৫ জন নিহত হন, যাদের অধিকাংশই ছিল শিক্ষার্থী। প্রাথমিকভাবে ঘটনাটিকে যুক্তরাষ্ট্রের ‘ভুল হামলা’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
লেবাননেও পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নেয়। সেখানে ২ মার্চ থেকে ইসরায়েলি হামলায় ১,৫৩০ জন নিহত হন, যার মধ্যে ১২৯ জন শিশু রয়েছে। একই সময়ে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা ১০ লাখ ছাড়িয়ে যায়, যাদের অনেকেই এখন আশ্রয়কেন্দ্রে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
ভোরের আকাশ/সু.পা