আইএমইসি: রেলপথের আগেই কি খুলবে নতুন সংযোগের দরজা?

ভারত-মধ্যপ্রাচ্য-ইউরোপ অর্থনৈতিক করিডোর প্রকল্পের মূল পণ্যবাহী রেল সংযোগের আগেই এর ডিজিটাল ও জ্বালানি সংযোগের দরজা উন্মুক্ত হওয়ার জোরালো সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। ভূরাজনৈতিক জটিলতা, বিপুল অর্থায়ন ঘাটতি এবং অবকাঠামোগত চ্যালেঞ্জের কারণে যেখানে মূল রেলপথ নির্মাণ ধীরগতিতে এগোচ্ছে, সেখানে তুলনামূলক কম জটিল ও দ্রুত বাস্তবায়নযোগ্য হওয়ায় ডিজিটাল কেবল, বিদ্যুৎ ও হাইড্রোজেন পাইপলাইন আগে চালু হতে পারে।
২০২৩ সালের জি-২০ সম্মেলনের সময় আইএমইসির ঘোষণা বিশ্বজুড়ে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি করেছিল।
পরিকল্পনাটি ছিল ভারতকে মধ্যপ্রাচ্যের অবকাঠামো ব্যবহার করে ইউরোপের সঙ্গে আরও দ্রুত ও কার্যকরভাবে যুক্ত করা। এর কেন্দ্রে রয়েছে সমুদ্র ও রেলপথের সমন্বিত পণ্য পরিবহন ব্যবস্থা।
কিন্তু প্রকল্পটির পরিধি আসলে আরও বিস্তৃত। ডিজিটাল সংযোগ, বিদ্যুৎ স্থানান্তর এবং পরিচ্ছন্ন হাইড্রোজেন পরিবহনের মতো খাতও এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
এখানেই আইএমইসির বাস্তব মূল্যায়নে একটি মৌলিক পরিবর্তন প্রয়োজন। পুরো করিডোরকে একটি একক অবকাঠামো প্রকল্প হিসেবে দেখলে এর অগ্রগতিকে শুধু রেলপথ নির্মাণের গতির সঙ্গে মেলানো হবে।
অথচ ডিজিটাল কেবল, বিদ্যুৎ সংযোগ কিংবা হাইড্রোজেন অবকাঠামোর বাস্তবায়ন রেলপথের ওপর সরাসরি নির্ভরশীল নয়। ফলে রেলপথ দীর্ঘসূত্রতায় পড়লেও আইএমইসির অন্য অংশগুলো একই সময়ে এগিয়ে যেতে পারে।
আইএমইসি নিয়ে নতুন আগ্রহের পেছনে শুধু অর্থনৈতিক কারণ নেই; এর কেন্দ্রে রয়েছে ভূরাজনীতি। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথে নিরাপত্তা সংকট, জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন এবং সরবরাহব্যবস্থায় অনিশ্চয়তা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যকে নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি করেছে।
এমন পরিস্থিতিতে ভারত থেকে ইউরোপে পণ্য পৌঁছানোর বিকল্প পথের প্রয়োজনীয়তা আগের চেয়ে অনেক বেশি স্পষ্ট। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক সমর্থনও আইএমইসিকে আবার রাজনৈতিক গুরুত্ব দিয়েছে। ওয়াশিংটনের দৃষ্টিতে এটি শুধু বাণিজ্যিক অবকাঠামো নয়; ভারত, উপসাগরীয় আরব দেশ ও ইউরোপকে একই অর্থনৈতিক কাঠামোর মধ্যে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করার একটি কৌশলগত উদ্যোগ।
ইউরোপের জন্যও এর গুরুত্ব কম নয়। এশিয়ার সঙ্গে সরবরাহব্যবস্থা বৈচিত্র্যময় করা, মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক গভীর করা এবং গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক chokepoint-এর ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানো—সবগুলো লক্ষ্যই আইএমইসির সঙ্গে যুক্ত।
কিন্তু রাজনৈতিক সমর্থন কোনো করিডোরকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্যকর করে না। ব্যবসায়ীদের কাছে প্রশ্ন আরও সরল—রুটটি কোথায়, কত টাকা লাগছে এবং কবে ব্যবহার করা যাবে?
সবচেয়ে বড় পরীক্ষা রেলপথে
আইএমইসির সবচেয়ে কঠিন অংশ সম্ভবত পণ্যবাহী রেল সংযোগ। ভারতের বন্দর থেকে পণ্য জাহাজে উপসাগরীয় অঞ্চলে যাবে। এরপর তা রেলপথে মধ্যপ্রাচ্য অতিক্রম করে ভূমধ্যসাগরীয় বন্দরে পৌঁছাবে এবং সেখান থেকে আবার সমুদ্রপথে ইউরোপে পাঠানো হবে।
এই মডেল কাগজে আকর্ষণীয় হলেও বাস্তবে এর প্রতিটি ধাপে সম্ভাব্য খরচ ও সময় যুক্ত হবে। একটি কনটেইনারকে জাহাজ থেকে ট্রেনে, আবার ট্রেন থেকে জাহাজে স্থানান্তর করতে হবে। ফলে প্রচলিত সমুদ্রপথের তুলনায় আইএমইসির সুবিধা কী—এই প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর দিতে হবে।
বর্তমানে ভারত, মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের মধ্যে সমুদ্রপথে বাণিজ্যিক যোগাযোগ বিদ্যমান। তাই আইএমইসির প্রকৃত প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা তৈরি হবে তার স্থলভাগের অংশে। কিন্তু সেই স্থলপথ এখনও পুরোপুরি প্রস্তুত নয়।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের রেল নেটওয়ার্ক সৌদি সীমান্ত পর্যন্ত পৌঁছালেও ইউরোপমুখী নিরবচ্ছিন্ন রেল সংযোগ তৈরির জন্য সৌদি আরব, জর্ডান ও ইসরায়েলের মধ্যকার অবকাঠামোগত ঘাটতি পূরণ করতে হবে। ২০২৫ সালের আটলান্টিক কাউন্সিলের এক গবেষণায় সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে হাইফা পর্যন্ত প্রয়োজনীয় রেল অবকাঠামোর ক্ষেত্রে প্রায় ৪ দশমিক ৮৬ থেকে ৫ দশমিক ১৮ বিলিয়ন ডলারের অর্থায়ন ঘাটতির ধারণাগত হিসাব তুলে ধরা হয়েছিল।
এটি পুরো আইএমইসির বাজেট নয়; বরং একটি নির্দিষ্ট অংশের সম্ভাব্য অর্থায়ন চ্যালেঞ্জ। কিন্তু সংখ্যাটি একটি বিষয় স্পষ্ট করে—করিডোরটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্থলভাগের সংযোগ তৈরি করতে বিপুল বিনিয়োগ প্রয়োজন।
রেললাইন তৈরি করাই শেষ কথা নয়
আইএমইসির বাণিজ্যিক সাফল্যের ক্ষেত্রে অবকাঠামোর পাশাপাশি প্রশাসনিক সমন্বয়ও গুরুত্বপূর্ণ। বিভিন্ন দেশের সীমান্তে শুল্ক, ট্রানজিট অনুমোদন, নিরাপত্তা পরীক্ষা, কাগজপত্র ও চার্জের ব্যবস্থায় সমন্বয় না থাকলে আধুনিক রেলপথও ধীরগতির বাণিজ্যপথে পরিণত হতে পারে।
ব্যবসায়ীদের জন্য নির্ভরযোগ্যতা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কোনো রুটে পণ্য পাঠিয়ে তা কখন পৌঁছাবে—এ বিষয়ে অনিশ্চয়তা থাকলে অতিরিক্ত খরচ সত্ত্বেও প্রতিষ্ঠানগুলো প্রচলিত সমুদ্রপথেই থাকতে চাইবে।
অর্থাৎ আইএমইসির চ্যালেঞ্জ শুধু ট্র্যাক বসানো নয়; একটি সম্পূর্ণ বাণিজ্যিক পরিষেবা তৈরি করা। এর জন্য প্রয়োজন নির্দিষ্ট সময়সূচি, প্রতিযোগিতামূলক ভাড়া, দ্রুত কাস্টমস ব্যবস্থা এবং বিভিন্ন দেশের রেল ও বন্দর কর্তৃপক্ষের সমন্বিত পরিচালনা।
ডিজিটাল কেবল হতে পারে দ্রুততম সাফল্য
এই জায়গাতেই আইএমইসির ডিজিটাল অংশটি তুলনামূলকভাবে দ্রুত ফল দেওয়ার সম্ভাবনা রাখে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের ‘গ্লোবাল গেটওয়ে’ উদ্যোগের নথিতে প্রায় ৯ হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ ‘ব্লু রামান’ সাবমেরিন কেবলের পরিকল্পনা রয়েছে। এতে প্রায় ৪০ কোটি ইউরো বিনিয়োগের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যার মধ্যে ইইউর অর্থায়ন প্রায় ৩ কোটি ৭০ লাখ ইউরো।
একটি সাবমেরিন কেবলের বাণিজ্যিক সাফল্যের জন্য রেলপথ বা বন্দর অবকাঠামো সম্পূর্ণ হওয়া অপরিহার্য নয়। দুই প্রান্তে সংযোগ, পর্যাপ্ত সক্ষমতা এবং অর্থপ্রদানে আগ্রহী গ্রাহক থাকলেই এটি কার্যকর হতে পারে।
একই যুক্তি বিদ্যুৎ ও হাইড্রোজেন অবকাঠামোর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। অর্থায়ন ও ক্রেতা নিশ্চিত করা গেলে এসব প্রকল্প রেলপথের চেয়ে আলাদা গতিতে এগোতে পারে।
হরমুজের প্রশ্নও এড়ানো যাবে না
আইএমইসিকে বিকল্প বাণিজ্যপথ হিসেবে উপস্থাপন করা হলেও এটি সমুদ্রপথের সব ঝুঁকি দূর করবে না। উপসাগরীয় অঞ্চলে প্রবেশের ক্ষেত্রে হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা পরিস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকবে।
বিকল্প হিসেবে ওমানের সঙ্গে সংযোগের বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। কিন্তু সেটিও নতুন অবকাঠামো, অর্থায়ন এবং আন্তঃদেশীয় সমন্বয়ের প্রশ্ন তৈরি করবে। ফলে একটি ঝুঁকি এড়াতে গিয়ে অন্য একটি অবকাঠামোগত নির্ভরতা তৈরি হলে আইএমইসির মূল উদ্দেশ্য আংশিকভাবে দুর্বল হতে পারে।
পূর্ণ করিডোর নয়, প্রকল্পভিত্তিক অগ্রগতিই বাস্তবসম্মত
আইএমইসির ভবিষ্যৎ মূল্যায়নের সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি হতে পারে প্রকল্পভিত্তিক অগ্রগতি পরিমাপ। একটি ডিজিটাল কেবল চালু হলে সেটিকে সাফল্য হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। কোনো বিদ্যুৎ সংযোগ কার্যকর হলে সেটিও আলাদা অর্জন। হাইড্রোজেন পরিবহনের কোনো অংশ বাণিজ্যিকভাবে চালু হলেও একইভাবে সেটির নিজস্ব মূল্য রয়েছে।
আর রেলপথ যদি কয়েক বছর বেশি সময় নেয়, তাহলে পুরো আইএমইসিকে ব্যর্থ বলা বাস্তবসম্মত হবে না।
বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত-কোন অংশে বিনিয়োগ হচ্ছে, কোন অংশে নির্মাণ চলছে, কোথায় গ্রাহক তৈরি হয়েছে এবং কোন অংশ এখনো কাগজে রয়েছে?
ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেন ২০২৬ সালের এপ্রিলে হরমুজ প্রণালির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে বিকল্প সংযোগ প্রকল্প এগিয়ে নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেছিলেন। এই রাজনৈতিক বার্তা আইএমইসির জন্য নতুন গতি তৈরি করতে পারে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এর সাফল্য নির্ভর করবে অর্থায়ন, অবকাঠামো এবং বাজারের বাস্তব চাহিদার ওপর।
আইএমইসির সামনে তাই এখন সবচেয়ে বড় পরীক্ষা কোনো নতুন ঘোষণা নয়; বরং ঘোষণাকে বাস্তব বাণিজ্যিক সক্ষমতায় রূপ দেওয়া। রেললাইন হয়তো পুরো করিডোরের সবচেয়ে আলোচিত অংশ, কিন্তু সেটিই একমাত্র মাপকাঠি নয়। যদি ডিজিটাল সংযোগ, বিদ্যুৎ ও হাইড্রোজেন প্রকল্প আগে বাস্তব রূপ পায়, তাহলে আইএমইসি একটি ‘একদিনে চালু হওয়া করিডোর’ না হয়ে ধাপে ধাপে গড়ে ওঠা একটি বহুমাত্রিক অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে।
আর সেই বাস্তবতা থেকেই আইএমইসির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি বদলে যায়-করিডোরটি কবে পুরোপুরি চালু হবে, তার চেয়ে এখন বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো, এর কোন অংশটি আগে সত্যিকার অর্থে কাজ শুরু করছে।
ভোরের আকাশ/আ.র