পতাকা হাতে ইরানি তরুণীর অটল ঘোষণা—‘এ পতাকা কখনও মাটিতে পড়বে না’

এক ইরানি তরুণীর দেশপ্রেমের গল্প আর নাগরিক হিসেবে পারস্যের জনগণ কতটা দৃঢ়চেতা তা মেহের নিউজ এজেন্সির মেহের ম্যাগাজিনের এক প্রবন্ধে উঠে এসেছে। বসন্ত এসে গেছে, আর গাছগুলোতে ধীরে ধীরে তুঁত ফল ধরতে শুরু করেছে। বৃষ্টির ফোঁটা আমার মুখে পড়ছে, আর আমি একটা চৌরাস্তার দিকে যাচ্ছি—এই দিনগুলোতে যার নাম রাখা হয়েছে ‘জিহাদ চৌরাস্তা’।
শহরের কেন্দ্রের এই চৌরাস্তার গল্প শুরু হয়েছে ৯ ফারভার্দিন (২৯ মার্চ) থেকে—যখন কিছু মানুষ কঠিন সময়েও দেশের মাটিকে রক্ষা করার সংকল্প নিয়ে এক প্রতীকী উদ্যোগ নেয়। তারা একটি বড় ইরানি পতাকা তৈরি করে, যাতে যুদ্ধ যতই দীর্ঘ হোক মাস বা বছর, এই পতাকা যেন কখনও মাটিতে না পড়ে, সেই অঙ্গীকার নিয়ে সেটিকে উঁচুতে রাখার চেষ্টা করে।
চৌরাস্তার দিকে যেতে যেতে আমি পথচারীদের মুখের দিকে তাকাই। মনে হয়, তাদের মুখে থাকা প্রতিটি রেখা যেন ৬০ দিনেরও বেশি সময়ের এক অবিরাম প্রতিরোধের গল্প বলছে। যারা কিছুদিন আগেও দৈনন্দিন জীবনের সাধারণ চিন্তায় ব্যস্ত ছিল, এখন তাদের মুখে যুদ্ধের উদ্বেগ আর অস্থিরতার ছাপ।
ফেরদৌসি স্কয়ার পার হওয়ার সময় আমার পা ধীর হয়ে আসে। যেসব ভবন একসময় আকাশ ছুঁয়ে দাঁড়িয়ে ছিল, এখন তাদের ধ্বংস ও শূন্যতা স্পষ্ট। মনে হয়, এই শহরের শরীর এখন যুদ্ধের নির্মম আঘাতে ক্ষতবিক্ষত। তবুও সেই ক্ষতের মাঝেই প্রতিটি গলি, প্রতিটি পথে মানুষের মুখে মুখে ঘুরে বেড়াচ্ছে ত্যাগ আর প্রতিরোধের গল্প।
চৌরাস্তার দিকে এগোনোর সঙ্গে সঙ্গে ভিড় বাড়ে। মানুষের চলাচল, ব্যস্ততা—সব মিলিয়ে শহরের প্রাণ আবারও স্পন্দিত মনে হয়। যুদ্ধের কারণে যে নীরবতা নেমে এসেছিল, তা যেন ধীরে ধীরে কেটে যাচ্ছে। মানুষের দ্রুত পদচারণা আর সন্ধ্যার হালকা বাতাস যেন নতুন দিনের আশার বার্তা বয়ে আনছে।
আমি কিছুক্ষণ থেমে দূরের দিকে তাকাই। ধুলো আর বাতাসের মাঝে একটি ত্রিবর্ণ পতাকা—ইরানের পতাকা—উড়তে দেখি। কাছে যেতেই দেখি, এক তরুণী শক্ত হাতে পতাকাটি ধরে রেখেছে, আর সেটি বাতাসে দুলছে।
ঠিক তখনই মনে পড়ে যায় শহীদ বেহেশতির সেই কথা, ‘আমরা কঠিন ও সমস্যার বোঝায় নত হব না। আমরা ইতিহাসে চিরকাল সোজা দাঁড়িয়ে থাকা মানুষ হয়ে থাকব। কেবল তখনই আমরা দাঁড়িয়ে থাকি না, যখন আমরা নিহত হই বা আহত হয়ে পড়ে যাই; নইলে কোনো শক্তিই আমাদের পিঠ বাঁকাতে পারে না।’
আমি তার দৃঢ় ভঙ্গি ও উষ্ণ হাসির দিকে তাকাই যা বসন্তের প্রথম দিনের মতোই কোমল ও প্রাণবন্ত—আর সেই হাতগুলোর দিকে, যেগুলোর শক্তি যেন কখনও শেষ হওয়ার নয়। আমি তাকে ডাক দিয়ে তার দৃষ্টি আকর্ষণ করি। তার নাম ফারিদে।
আমি তাকে জিজ্ঞেস করি, ‘প্রায় তিন মাস ধরে এই কঠিন সময় চলছে—এক দিনের অক্লান্ত কাজের পরও কী আপনাকে এমন দৃঢ়ভাবে ইরানের পতাকা হাতে ধরে রাখতে উৎসাহ দেয়?’
ফারিদে উত্তর দেওয়ার আগে একটু পতাকাটি হাতে ঠিক করে নেয়। তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বিনা দ্বিধায় বলে, ‘দেশের প্রতি ভালোবাসাই আমাকে বাধ্য করে, অন্তত একবার হলেও এখানে এসে এই কাজটা করতে।’
আমি মাথা নেড়ে সম্মতি দিই। তার কথাগুলো ছোট হলেও এতটাই আত্মবিশ্বাসে ভরা যে, যে কেউ তা শুনে নিশ্চিত হয়ে যাবে। আবারও আমি ফারিদেকে জিজ্ঞেস করি, ‘এই বিশেষ পরিস্থিতিতে কয়েক মিনিটের জন্যও পতাকা উড়ানোর অনুভূতিটা কেমন?’
সে থেমে না গিয়ে বলে, ‘আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, আমি আমার দেশের জন্য কিছু করছি। আমার কাছে এটা এক ধরনের জিহাদ—আমাদের দেশকে শত্রুর হাত থেকে রক্ষা করার প্রচেষ্টা।’
এই সময় চারপাশে গাড়ির হর্ন আর মোটরসাইকেলের শব্দ ভেসে আসে। কিন্তু সেই সব বিশৃঙ্খলার মাঝেও আমি স্পষ্টভাবে শুধু ফারিদের কণ্ঠই শুনতে পাই—তার কণ্ঠে এমন এক বিশ্বাস, যা প্রশ্ন করার জায়গাই রাখে না।
আমাদের সংক্ষিপ্ত কথোপকথন শেষ হলে আমি তাকে ধন্যবাদ দিই এবং কয়েক পা পিছিয়ে যাই। নিজের মনে ভাবি—এই পৃথিবীর কোথায় এমন মানুষ পাওয়া যায়, যারা দেশের প্রতি এমন ভালোবাসা নিয়ে যুদ্ধের সমস্ত কষ্ট সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত লড়াই করে?
চলতে শুরু করার আগে আমি আবার একবার ফারিদের দিকে তাকাই। এই অদ্ভুত সময়ে আমি তার মধ্যে শুধু শান্তি, সৌন্দর্য আর গর্বই দেখি। যেন যুদ্ধের সব কঠিনতার পর এই শহরে নতুন এক প্রাণ সঞ্চার হয়েছে—যা পোস্টার বা ব্যানারে নয় বরং ফারিদের মতো নারীদের হাতেই জীবন্ত।
আমি যত দূরে যাই, মনে হয় শহীদ বেহেশতির কথা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে, ‘এই জাতি কখনো মাথা নত করে না—যতক্ষণ না তারা নিহত হয় বা আহত হয়ে পড়ে। অন্যথায় কোনো শক্তিই ইরানিদের মেরুদণ্ড বাঁকাতে পারে না। আর এই অস্থির সময়েও, ভবিষ্যতের প্রতি আশা বহন করছে সেই মানুষগুলো, যারা মিথ্যা ধারণার বিরুদ্ধে নিজেদের পতাকা আরও উঁচুতে ধরে রাখে—সবচেয়ে উঁচুতে।’
সূত্র: মেহর নিউজ এজেন্সি
ভোরের আকাশ/এনএস