সহিংস ছাত্র আন্দোলনে উত্তাল ফ্রান্স, বন্ধ ৪০০ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান

ফ্রান্সে শিক্ষক সংকট, দীর্ঘ স্কুল সময় ও জরাজীর্ণ অবকাঠামোসহ শিক্ষাব্যবস্থার নানা সমস্যার প্রতিবাদে শুরু হওয়া ছাত্র বিক্ষোভ দেশজুড়ে তীব্র সহিংসতায় রূপ নিয়েছে, যার ফলে নিরাপত্তা নিশ্চিতে দেশটির প্রায় ৪০০টি হাইস্কুল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।
গত সপ্তাহে রাজধানী প্যারিস থেকে শুরু হওয়া এই আন্দোলন দ্রুত পুরো ফ্রান্সে ছড়িয়ে পড়ে। বিক্ষোভ দমনে পুলিশ ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, স্কুলে পড়াশোনার সময় অস্বাভাবিকভাবে দীর্ঘ, শ্রেণিকক্ষের পরিবেশও উপযুক্ত নয়- অনেক কক্ষে অতিরিক্ত গরম ও শিক্ষকসহ বিভিন্ন কর্মীর অনুপস্থিতিও অনেক বেশি।
‘অতি-উগ্র গোষ্ঠীর হাতে জিম্মি’
ফ্রান্সের শিক্ষামন্ত্রী এদুয়ার জেফ্রে বলেছেন, উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলন ‘অতি সহিংস কিছু প্রান্তিক গোষ্ঠীর হাতে জিম্মি’ হয়ে পড়েছেন। তিনি জানান, দেশটির মোট ৩ হাজার ৭০০ উচ্চবিদ্যালয়ের মধ্যে প্রায় ৪০০টি শুক্রবার (২ অক্টোবর) বন্ধ থাকবে। ক্ষতিগ্রস্ত বা অবরোধের কারণে অনেক স্কুলে সরাসরি ক্লাসের পরিবর্তে অনলাইনেও পাঠদান হবে, বিশেষ করে দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর মার্সেইয়ে।
জেফ্রে বিএফএমটিভিকে জানান, আন্দোলন শুরুর পর অন্তত ৬৫ জন শিক্ষা কর্মকর্তা-কর্মী আহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে ৪০ জন উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। আহত শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ১৭০। এছাড়া শতাধিক স্কুলে ‘গুরুতর ক্ষয়ক্ষতি’ হয়েছে।
তিনি অভিভাবকদের উদ্দেশে বলেন, তাদের সন্তানদের বিক্ষোভে না যাওয়ার বিষয়ে স্পষ্টভাবে সতর্ক করতে হবে। কারণ শিক্ষার্থীরা রাস্তায় থাকলে তাদের নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়ছে।
ফরাসি ন্যায়বিচারমন্ত্রী জেরাল্ড দারমানিন জানিয়েছেন, বিক্ষোভ চলাকালে সন্তানদের কারণে কোনো ক্ষয়ক্ষতি হলে সংশ্লিষ্ট অভিভাবকদের দায়ী করা ও তাদের দিয়ে ক্ষতিপূরণ আদায়ের জন্য তিনি প্রসিকিউটরদের নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি আরটিএলকে বলেন, আন্দোলন শুরুর পর প্রায় ২ হাজার মানুষকে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। তাদের ৯০ শতাংশই অপ্রাপ্তবয়স্ক।
‘আমরা জিতে গেছি’
পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর রেনের জ্যাঁ-মাসে উচ্চবিদ্যালয়ের সামনে শুক্রবার সকালেই উত্তেজনা দেখা যায়। কালো পোশাক ও মুখোশ পরা শিক্ষার্থীদের কাছাকাছি ছিল বিপুলসংখ্যক পুলিশ।
নিজের পরিচয় প্রকাশ করতে না চাওয়া ১৬ বছর বয়সী এক শিক্ষার্থী বলে, আমাদের দৃষ্টিতে আমরা জিতে গেছি- আজ সকালে আমাদের স্কুল বন্ধ। পুলিশের বিরুদ্ধে সহিংসতার অভিযোগ তুলে সে বলে, এতে তাদের ক্ষোভ আরও বেড়েছে। শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশ সদস্যদের আঘাত করা কিংবা কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করার কোনো অধিকার নেই বলেও মন্তব্য করে এই শিক্ষার্থী।
পশ্চিমাঞ্চলীয় ব্রেস্ট শহরের কেরিশেন উচ্চবিদ্যালয়ের কাছেও পুলিশ শিক্ষার্থীদের ছত্রভঙ্গ করতে কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করেছে বলে জানিয়েছেন এএফপির একজন আলোকচিত্রী।
প্যারিসে দুই স্কুলের প্রবেশপথে আগুন
শুক্রবার (২ অক্টোবর) প্যারিসেও বিক্ষোভের সময় দুটি উচ্চবিদ্যালয়ের প্রবেশপথ আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। স্কুল দুটি হলো- শহরের দক্ষিণের লিওনার্দ দ্য ভিঞ্চি ও দক্ষিণ-পূর্বের গাস্তোঁ-বাশেলার। আগুন নেভাতে ঘটনাস্থলে দমকল বাহিনী পাঠানো হয়।
সরকার বলছে, শিক্ষার্থীদের উত্থাপিত অভিযোগগুলোর বৈধতা রয়েছে। তবে একই সঙ্গে স্কুলে আগুন দেওয়া, ভাঙচুর ও সংঘর্ষকে ‘শহুরে সহিংসতা’ হিসেবে নিন্দা করেছে সরকার। অন্যদিকে শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করছেন, বিক্ষোভ ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ নিয়মিত কাঁদানে গ্যাসের ক্যানিস্টার ব্যবহার করছে এবং অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগের কারণে অনেকে আহত হয়েছে।
বিক্ষোভের প্রভাব রাজনীতিতেও পড়েছে। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সামনে আর মাত্র ছয় মাসের কিছু বেশি সময় থাকায় আন্দোলনটি নিয়ে রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়ছে। সরকার অভিযোগ করেছে, কট্টর বামপন্থি দল ফ্রান্স আনবো (এলএফআই) এই আন্দোলনের পেছনে রয়েছে। দলটির নেতা জ্যঁ-লুক মেলঁশঁ আবারও প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
তবে এলএফআইয়ের জ্যেষ্ঠ নেতা ম্যানুয়েল বমপার সরকারের এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বলেছেন, সরকার ‘ষড়যন্ত্র তত্ত্বের দিকে নেমে যাচ্ছে’। রাজনৈতিকভাবে বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে সরকার ও এলএফআইয়ের মধ্যে পাল্টাপাল্টি অভিযোগও জোরালো হয়েছে।
পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত করতে শুক্রবার শিক্ষামন্ত্রী জেফ্রে শিক্ষা খাতের ইউনিয়ন এবং উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সংগঠনগুলোর সঙ্গে বৈঠক করেছেন। আন্দোলনের বৈধ দাবিগুলো নিয়ে সংলাপের মাধ্যমে সমাধানের পথ খোঁজার কথা জানিয়েছে সরকার।
তবে বৃহস্পতিবারই আন্দোলনকে ঘিরে প্রায় ১ হাজার ৯৫০ জনকে আটক করা হয়েছিল বলে ফরাসি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। একই সময়ে শতাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অবরোধ এবং বিভিন্ন স্থানে অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটে।
ভোরের আকাশ/আ.র