ইউরোপে তাপদাহ-শীতের তীব্রতায় বছরে ১ লাখেরও বেশি মানুষ মারা যাচ্ছে

ইউরোপে তাপদাহ ও শীতের তীব্রতায় বছরে একলাখেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হচ্ছে। বিশ্বব্যাপী রেকর্ডকৃত তৃতীয় উষ্ণতম এপ্রিল মাস এবং ইউরোপে আরও ভয়াবহ গ্রীষ্মের আবহাওয়ার আশঙ্কার মধ্যে এ তথ্য সামনে এসেছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, অর্থনৈতিক বৈষম্যের কারণে ইউরোপে প্রতি বছর তীব্র তাপদাহ ও শীতে বিপুল সংখ্যক মানুষের মৃত্যুর সঙ্গে আরও একলাখেরও বেশি মৃত্যু যুক্ত হয়।
গবেষণায় দেখা গেছে, গিনি সূচকের পরিমাপ অনুযায়ী ইউরোপের সবচেয়ে সমতাভিত্তিক অঞ্চল স্লোভেনিয়ার মতো বৈষম্যের মাত্রা কমালে তাপমাত্রাজনিত মৃত্যুহার ৩০ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পাবে, যা ১ লাখ ৯ হাজার ৮৬৬ জন মানুষের সমান।
এ তথ্য এমন সময়ে সামনে এসেছে যখন ইউরোপীয় ইউনিয়নের কোপারনিকাস পর্যবেক্ষণ প্রকল্প গত মাসকে বিশ্বব্যাপী রেকর্ডকৃত তৃতীয় উষ্ণতম এপ্রিল হিসেবে স্থান দিয়েছে এবং স্পেনের মতো কিছু দেশ তাদের ইতিহাসে উষ্ণতম এপ্রিল মাস রেকর্ড করেছে। প্রাকৃতিক উষ্ণায়ন ঘটনা এলো নিনোর প্রত্যাবর্তন যা অস্বাভাবিকভাবে শক্তিশালী রূপ নিতে পারে ২০২৬ সালে ইউরোপে এক ভয়াবহ গ্রীষ্মের আশঙ্কা তৈরি করেছে।
গবেষকরা দেখেছেন যে, তাপ ও শীতে উচ্চ মৃত্যুহার দারিদ্র্য এবং ঘর গরম রাখার অক্ষমতার মতো দুর্দশার বিভিন্ন সূচকের সঙ্গে সম্পর্কিত।
গবেষণা অনুসারে, অঞ্চলগুলোর মধ্যে বৈষম্য কমানোর পাশাপাশি, মহাদেশ জুড়ে তীব্র বস্তুগত ও সামাজিক বঞ্চনাকে সবচেয়ে কম বঞ্চিত অঞ্চল মধ্য সুইজারল্যান্ডের পর্যায়ে নামিয়ে আনতে পারলে তাপ ও শীতজনিত মৃত্যু ৫৯ হাজার কমে যাবে।
এটিকে সবচেয়ে বঞ্চিত অঞ্চল দক্ষিণ-পূর্ব রোমানিয়ার পর্যায়ে উন্নীত করতে পারলে তাপমাত্রাজনিত মৃত্যু ১ লাখ ১ হাজার বেড়ে যাবে।
ইউরোপের হাড় কাঁপানো শীত এবং অসহ্য গরমের সময় প্রাণহানির ওপর আর্থ-সামাজিক সমস্যার প্রভাব পরিমাপকারী এটিই প্রথম গবেষণা। গবেষকরা বলেছেন, এটি দুর্বল গোষ্ঠিগুলোকে স্বল্পমেয়াদি ত্রাণ দেওয়ার এবং দীর্ঘমেয়াদে ইউরোপে কাঠামোগত বৈষম্য কমানোর আহ্বানকে আরও জোরালো করেছে।
‘এতে এক ঢিলে দুই পাখি মারা যায়’ বলেছেন বার্সেলোনা ইনস্টিটিউট ফর গ্লোবাল হেলথ-এর বায়োমেডিকেল বিজ্ঞানী এবং এ গবেষণার প্রধান লেখক ব্লাঙ্কা প্যানিয়েলো-ক্যাস্টিলো। যদি নীতিমালায় তা ইউরোপীয়, জাতীয়, স্থানীয় বা যে কোনো ধরনেরই হোক না কেন, সমতার দৃষ্টিকোণকে আরও বেশি অন্তর্ভুক্ত করা হতো, তাহলে আমরা একই সঙ্গে দুটি লক্ষ্য অর্জন করতে পারতাম।
তাপ ও ঠান্ডা শরীরের উপর চাপ সৃষ্টি করে, ফলে শরীর রোগের প্রতি আরও বেশি সংবেদনশীল হয়ে পড়ে এবং রোগ প্রতিরোধের ক্ষমতা কমে যায়। তাপমাত্রা আরামদায়ক পরিসর থেকে বিচ্যুত হলে মৃত্যুহার তীব্রভাবে বৃদ্ধি পায়, বিশেষ করে বয়স্ক বা অসুস্থ ব্যক্তিদের মধ্যে।
এ বিশ্লেষণটি ২০০০ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে ইউরোপের ৬৫৪টি অঞ্চলের দৈনিক মৃত্যুহারের তথ্য পর্যালোচনা করে, প্রতিটি অর্থনৈতিক সূচকের জন্য প্রাপ্ত সর্বোত্তম ও নিকৃষ্টতম মানগুলো যদি সমস্ত অঞ্চলের ওপর প্রয়োগ করা হতো, তবে স্বাস্থ্যগত ধারণা কেমন হতো, তা মডেলিং করে ‘দায়ী মৃত্যুর’ পরিমাণ অনুমান করেছে।
তারা আরও দেখেছেন ধনী অঞ্চলগুলোতে ঠান্ডাজনিত মৃত্যু কম হয়েছে। সম্ভবত তাপ-নিরোধক বাড়ি, উন্নত স্বাস্থ্যসেবা এবং কম জ্বালানি দারিদ্র্যের কারণে কিন্তু গরমকালে মৃত্যু বেশি হয়েছে। তারা ধারণা করেছেন যে এটি নগর তাপ দ্বীপ প্রভাবের ফল হতে পারে, যেখানে শহরগুলো অধিক সম্পদশালী হওয়া সত্ত্বেও পিচঢালা রাস্তা এবং সবুজ স্থানের অভাবে উচ্চ তাপমাত্রার শিকার হয়।
তারা ধারাবাহিকভাবে দেখেছেন যে উচ্চ তাপমাত্রাজনিত মৃত্যুহার গিনি সূচকের মতো বিভিন্ন সূচকের সঙ্গে সম্পর্কিত, যা একটি জনগোষ্ঠীর আয় বণ্টনের অসমতা, ঘর গরম রাখার অসুবিধা এবং বস্তুগত ও সামাজিক বঞ্চনা পরিমাপ করে। তারা শীতাতপ নিয়ন্ত্রণের ব্যবহারকে একটি চালক হিসেবে স্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।
ড্রেক্সেল ইউনিভার্সিটির ডর্নসাইফ স্কুল অব পাবলিক হেলথের মহামারি বিশেষজ্ঞ উসামা বিলাল, যিনি এ গবেষণার সঙ্গে জড়িত ছিলেন না, তিনি বলেছেন গবেষণাটি উচ্চমানের ছিল এবং এতে নির্ভরযোগ্য পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে, যদিও দারিদ্র্যকে জলবায়ুর অন্যান্য দিক থেকে আলাদা করা কঠিন হতে পারে।
তিনি আরও বলেন, আমার মতে প্রধান সীমাবদ্ধতাগুলো হলো সামাজিক চালকগুলোর পরিমাপের স্তর এবং এ সত্য যে, পূর্ব ইউরোপ বাদে ইউরোপে এবং আরও অনেক জায়গায় উষ্ণ জলবায়ু ও দারিদ্র্যের মধ্যে একটি সম্পর্ক রয়েছে।
বর্তমানে মানব স্বাস্থ্যের জন্য তাপের চেয়ে ঠান্ডা অনেক বড় হুমকি, যদিও বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন যে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফলে তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এ সম্পর্কটি উল্টে যাবে। গত মাসে বিজ্ঞানীরা দেখেছেন যে, জীবাশ্ম জ্বালানির দূষণের চাদরে পৃথিবী ঢেকে যাওয়ার কারণে ১৯৯০-এর দশকের মাঝামাঝি থেকে ইউরোপের তাপমাত্রা প্রতি দশকে শূন্য দশমিক ৫৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে। যা পৃথিবীর অন্য যেকোনো মহাদেশের চেয়ে দ্রুততর।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের বৈজ্ঞানিক উপদেষ্টাদের এ সতর্কবার্তার পরই এ ফলাফলগুলো সামনে এসেছে, মহাদেশটি জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে সঠিকভাবে খাপ খাইয়ে নিতে ব্যর্থ হচ্ছে।
লন্ডন স্কুল অব হাইজিন অ্যান্ড ট্রপিক্যাল মেডিসিনের মহামারী বিশেষজ্ঞ ম্যালকম মিস্ট্রি, যিনি এ গবেষণার সাথে জড়িত ছিলেন না, তিনি বলেছেন যে এ ফলাফলগুলো জলবায়ু অভিযোজন নীতি নির্ধারণে সহায়ক হবে এবং ফলাফলগুলো রক্ষণশীল হতে পারে।
তিনি বলেন, উদাহরণস্বরূপ, যদিও গবেষকরা সঙ্গত কারণেই তাদের গবেষণাটি কোভিড-১৯ মহামারির পূর্ববর্তী বছরগুলোতে সীমাবদ্ধ রেখেছেন, জ্বালানি দারিদ্র্যের হার যা এ গবেষণায় একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্ধারক হিসেবে চিহ্নিত বিশেষ করে ২০২১-২২ সালের পর ইউরোপের অনেক দেশে বেশ তীব্রভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এখানে উপস্থাপিত আনুমানিক ধারণা বর্তমান মানদণ্ড অনুযায়ী বেশ রক্ষণশীল হতে পারে।
ভোরের আকাশ/ইউএম