ঝুঁকিতে ৭০ শতাংশ ওয়েবসাইট, বন্ধ হচ্ছে সরকারি-বেসরকারি সেবা

বিশ্বজুড়ে ব্যবহৃত পিএইচপি (PHP) প্রোগ্রামিং ভাষায় গুরুতর নিরাপত্তাত্রুটি শনাক্ত হওয়ার পর সাইবার হামলার ঝুঁকিতে পড়েছে বিশ্বের প্রায় ৭০ শতাংশ ওয়েবসাইট। এই নিরাপত্তাঝুঁকি মোকাবিলা ও সুরক্ষাব্যবস্থা জোরদার করতে ইউরোপসহ বিশ্বজুড়ে এবং বাংলাদেশেও বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি অনলাইন সেবা ও ওয়েবসাইট সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে।
ত্রুটি দুটি কাজে লাগিয়ে সাইবার অপরাধীরা ওয়েবসাইটে অননুমোদিত প্রবেশ করতে পারে। এমনকি পাসওয়ার্ডসহ সংবেদনশীল তথ্য হাতিয়ে নেওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থা (এনএসএ) ও ইউরোপের সাইবার নিরাপত্তা সংস্থা প্রতিষ্ঠানগুলোকে দ্রুত নিরাপত্তা হালনাগাদ করার পরামর্শ দিয়েছে।
যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশের ওয়েবসাইটে প্রভাববৃহস্পতিবার যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষ হাউজ অব লর্ডসে দেশটির সরকারি মন্ত্রী এলিজাবেথ লয়েড জানান, নিরাপত্তা হালনাগাদের কারণে প্রায় তিন ডজন সরকারি সেবা বন্ধ রয়েছে। আরও চারটি সেবা আংশিকভাবে অকার্যকর।
যুক্তরাজ্য সরকার জানিয়েছে, গুরুত্বপূর্ণ জনসেবাগুলোর বড় কোনোটি এই কার্যক্রমে ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। তবে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কিছু সীমিত সেবা সাময়িকভাবে বন্ধ থাকতে পারে।
ইউরোপের ফ্রান্স, ডেনমার্ক, ফিনল্যান্ড ও নেদারল্যান্ডসেও কয়েকটি সরকারি ওয়েবসাইট সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। এর মধ্যে নেদারল্যান্ডসের সাইবার নিরাপত্তা সংস্থার ওয়েবসাইটও রয়েছে।
জাপানেও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইট ও অনলাইন সেবায় প্রভাব পড়েছে। দেশটির বিমান সংস্থা এএনএ, রেল পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান জেআর ওয়েস্ট এবং বৃহত্তম ব্যাংকগুলোর একটি এমইউএফজিও কিছু ওয়েবসাইট ও সেবা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার কথা জানিয়েছে।
আয়ারল্যান্ডের জনপ্রিয় সংবাদমাধ্যম দ্য জার্নালও নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করতে বৃহস্পতিবার সকালে সাময়িকভাবে অফলাইনে চলে যায়।
পিএইচপি কী, ত্রুটি কতটা বিপজ্জনকপিএইচপি একটি বহুল ব্যবহৃত প্রোগ্রামিং ভাষা। ওয়েবসাইটের বিভিন্ন ফিচার পরিচালনা, তথ্য প্রক্রিয়াকরণ ও অনলাইন সেবা চালাতে এটি ব্যবহৃত হয়।
ওয়ার্ডপ্রেস ও ড্রুপালের মতো কনটেন্ট ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থার সঙ্গেও পিএইচপির ব্যবহার রয়েছে। ফলে এই ভাষার নিরাপত্তাত্রুটি বিপুলসংখ্যক ওয়েবসাইটের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
ত্রুটি দুটিকে একত্রে ‘পিএইচপি২শেল’ (PHP2Shell) নামে উল্লেখ করা হয়েছে। এগুলো ব্যবহার করে আক্রমণকারীরা দূর থেকে ওয়েবসাইটের সিস্টেমে কোড চালাতে পারে। এতে সেবা অচল হওয়া, তথ্য ফাঁস এবং গ্রাহকের সংবেদনশীল তথ্য চুরির আশঙ্কা রয়েছে।
ক্লাউডফ্লেয়ারসহ সাইবার নিরাপত্তা খাতের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ত্রুটি মোকাবিলায় কাজ করছে। পিএইচপি ফাউন্ডেশনও নিরাপত্তা ত্রুটি সংশোধনের জন্য প্যাচ প্রকাশ করেছে। ওয়েবসাইট পরিচালনাকারীদের দ্রুত সেটি ইনস্টল করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
ত্রুটি খুঁজে পেতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা এআইয়েরসাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান উইজ, ওপেনএআই এবং ক্যালিফ নামের আরেকটি প্রতিষ্ঠান ত্রুটি শনাক্ত করার কাজে যুক্ত ছিল। গবেষকদের দাবি, এআইয়ের সহায়তায় পিএইচপির কোডে বহু বছর ধরে লুকিয়ে থাকা দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করা সম্ভব হয়েছে।
উইজের গবেষকেরা জানিয়েছেন, উন্নত এআই মডেল ও প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত সরঞ্জাম ব্যবহার করে এক সপ্তাহে এমন কাজ করা গেছে, যা আগে দক্ষ গবেষকদের একটি দলের করতে কয়েক মাস লেগে যেতে পারত।
গবেষণায় গুগলের জেমিনি ৪ আর্গন, উইজ অ্যাটলাস এবং ওপেনএআইয়ের জিপিটি-৫.৬ সল ব্যবহার করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
গবেষকেরা আগস্টের শেষ দিকে ত্রুটিগুলো শনাক্ত করেন। তবে সংশোধনের ব্যবস্থা নেওয়ার পর বুধবার এগুলো জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়।
উইজের গবেষকদের মতে, এ ঘটনা সাইবার নিরাপত্তায় এআইয়ের ভূমিকার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। কারণ, এআই শুধু ত্রুটি শনাক্ত করতেই নয়, সেই ত্রুটি ব্যবহার করে কীভাবে আক্রমণ চালানো সম্ভব, তা বুঝতেও সহায়তা করেছে।
বিশ্বনেতাদের সতর্কবার্তানেদারল্যান্ডসের প্রধানমন্ত্রী রব জেটেন জানিয়েছেন, তার সরকার পিএইচপির নিরাপত্তাত্রুটি পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।
জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিজেদের ওয়েবসাইটে পিএইচপি ব্যবহার করা হচ্ছে কি না, তা পরীক্ষা করতে বলেছেন। প্রয়োজন হলে ঝুঁকি কমাতে সেবা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার বিষয়টিও বিবেচনা করার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
তার আহ্বান, নিরাপত্তা সংশোধনী প্রকাশের পর যত দ্রুত সম্ভব তা কার্যকর করতে হবে। উইকিপিডিয়া পরিচালনাকারী উইকিমিডিয়া ফাউন্ডেশনও জানিয়েছে, তারা পিএইচপির নিরাপত্তাত্রুটি মোকাবিলায় কাজ করছে। সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে তাদের কিছু সিস্টেম সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে।
ভোরের আকাশ/আ.র