যুদ্ধনীতিতে নতুন বদল, সরাসরি আক্রমণে ইরান

ইরান তাদের দীর্ঘদিনের ‘পাল্টা হামলার’ সামরিক কৌশল বদলে এখন সরাসরি ‘আগ্রাসী বা আগাম আক্রমণাত্মক’ যুদ্ধনীতি গ্রহণ করেছে। ২০২৫ ও ২০২০২৬ সালের সংঘাতগুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে তেহরান এই নতুন সমীকরণ তৈরি করছে, যেন ভবিষ্যতে তাদের ওপর যেকোনো হামলার ক্ষেত্রে প্রতিপক্ষকে চরম মূল্য দিতে হয়।
দেশটির ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) বুধবার নতুন ‘আক্রমণাত্মক’ সামরিক কৌশলের ঘোষণা দিয়ে এ হুঁশিয়ারি দিয়েছে।
এদিকে ইয়েমেনের হুতিদের হামলার প্রেক্ষাপটে সৌদি আরব থেকে যুক্তরাষ্ট্রের কিছু কূটনৈতিক কর্মী ও তাদের পরিবারের সদস্যদের সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে ইরানের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য নতুন হামলার পরিকল্পনা করছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল, এমন খবরও প্রকাশিত হয়েছে বিভিন্ন গণমাধ্যমে।
এমন পরিস্থিতিতে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজে হামলা, তেলের সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ এবং কূটনৈতিক আলোচনা কার্যত অচল হয়ে পড়ায় মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে বড় ধরনের সামরিক সংঘাতের আশঙ্কা বাড়ছে।
বুধবার (২১ অক্টোবর) আইআরজিসি জানিয়েছে, ইরানের প্রতিরক্ষা নীতিতে পরিবর্তন এনে এখন থেকে ‘আক্রমণাত্মক’ কৌশল অনুসরণ করা হবে।
অর্থাৎ, কোনো দেশ ইরানে হামলা চালালে তেহরান শুধু পাল্টা আঘাত করবে না, বরং প্রয়োজনে আক্রমণকারীর বিরুদ্ধে সরাসরি অভিযানও চালাবে।
আইআরজিসির মুখপাত্র হোসেইন মোহেবি বলেন, আগে ইরানের নীতি ছিল- কেউ হামলা করলে জবাব দেওয়া হবে।
এখন সেই নীতিতে পরিবর্তন এসেছে। হামলার জবাব দেওয়ার পাশাপাশি আক্রমণাত্মক পদক্ষেপও নেওয়া হবে।
মোহেবির দাবি, ২০২৫ সালের জুনে ইরান-ইসরায়েলের ১২ দিনের যুদ্ধের পর থেকে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত দেড় গুণ বেড়েছে। ক্ষেপণাস্ত্রের গুণগত মান, পাল্লা, ধ্বংসক্ষমতা ও নির্ভুলতাও উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। তবে ক্ষেপণাস্ত্রের নির্দিষ্ট সংখ্যা জানাননি।
এ ছাড়া ইরান ‘সব বোমার জনক’ নামে পরিচিত একটি নতুন অস্ত্র উন্মোচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে বলেও জানান আইআরজিসির মুখপাত্র। অস্ত্রটির প্রকৃতি বা সক্ষমতা সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু জানাননি তিনি।
বিশ্লেষকদের মতে, ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলাকে আরও ব্যয়বহুল করে তোলাই ইরানের নতুন কৌশলের মূল লক্ষ্য।
সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিসির জ্যেষ্ঠ গবেষক নেগার মোর্তাজাভি কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরাকে বলেন, ২০২৫ ও ২০২৬ সালের যুদ্ধ থেকে শিক্ষা নিয়েছে তেহরান। আগের পাল্টা হামলার কৌশল বারবার আক্রমণ ঠেকাতে ব্যর্থ হওয়ায় এখন নতুন সমীকরণ তৈরি করতে চাইছে ইরান। তাদের লক্ষ্য, ভবিষ্যতে ইরানে হামলা চালানোর আগে প্রতিপক্ষকে সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টি বিবেচনা করতে বাধ্য করা।
প্রচলিত সামরিক শক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পাল্লা দিতে না পারায় ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন এবং হরমুজ প্রণালির ওপর কৌশলগত প্রভাবকে কাজে লাগাতে চাইছে ইরান।
আরব সেন্টারের অনাবাসিক জ্যেষ্ঠ গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক রামি খুরি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল এবং তাদের সামরিক অভিযানকে সমর্থন দেওয়া আঞ্চলিক দেশগুলোর ওপরও সংঘাতের মূল্য চাপিয়ে দিতে চায় তেহরান। এর প্রভাব মধ্যপ্রাচ্যের বাইরেও ছড়িয়ে পড়তে পারে- জ্বালানি সরবরাহ, পরিবহন, বিমা ব্যয় ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাণিজ্যে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে আলোচনা ও যুদ্ধের ভবিষ্যৎ নিয়ে পরস্পরবিরোধী ইঙ্গিত দিয়েছেন। বুধবার তিনি বলেন, তেহরানের সঙ্গে ওয়াশিংটনের আলোচনা এখন আর চলছে না।
পরিস্থিতির বিষয়ে শিগগিরই কোনো সিদ্ধান্ত আসতে পারে বলেও জানান তিনি।
দক্ষিণ ক্যারোলাইনায় এক নির্বাচনী সমাবেশে ট্রাম্প বলেন, চাইলে যুক্তরাষ্ট্র এখনই যুদ্ধ শেষ করতে পারে। তবে তিনি এমন সমাধান চান, যাতে দীর্ঘমেয়াদে সংঘাতের অবসান নিশ্চিত হয়।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছেন, শান্তিচুক্তিতে পৌঁছানো অত্যন্ত কঠিন। তার দাবি, হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা বন্ধ করতে হবে ইরানকে। পাশাপাশি ইরান যাতে কখনও পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সুযোগ না পায়, এমন নিশ্চয়তাও চায় ওয়াশিংটন।
অন্যদিকে ইরানের দাবি, পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তির (এনপিটি) আওতায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার অধিকার তাদের রয়েছে।
হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করতে সাত দিনের একটি প্রস্তাবও দিয়েছে তেহরান। বিনিময়ে ইরানের বন্দরগুলোতে মার্কিন অবরোধ প্রত্যাহার, নিষেধাজ্ঞা শিথিল এবং জব্দ করা সম্পদ ছাড়ের দাবি জানিয়েছে দেশটি।
বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, নতুন করে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলার সম্ভাবনা বাড়ছে। তবে কূটনীতির পথ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়নি।
মোর্তাজাভি বলেন, দুই পক্ষই সম্ভাব্য নতুন সংঘাতের প্রস্তুতি নিচ্ছে। হরমুজ প্রণালিতে উত্তেজনা পরিস্থিতিকে আরও বিপজ্জনক করে তুলছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আসন্ন নির্বাচন সামরিক পদক্ষেপের সময় নির্ধারণে প্রভাব ফেলতে পারে বলেও মনে করেন তিনি।
ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব মোহসেন রেজাই বুধবার বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে যেকোনো পদক্ষেপের মূল্য দিতে হবে। কূটনীতির মাধ্যমে প্রতিপক্ষকে এ বার্তা বোঝানো সম্ভব হলে তেহরান সেই পথই পছন্দ করবে। যুদ্ধ চলতে থাকলে জবাব দেওয়ার সক্ষমতা ইরানের রয়েছে।
খুরির মতে, নতুন করে হামলা হলে ইরানের বিদ্যুৎব্যবস্থা, পরিবহন অবকাঠামো, সেতু ও জরুরি পরিষেবাগুলো লক্ষ্যবস্তু হতে পারে। বড় ধরনের নতুন হামলা মোকাবিলা করে সমপরিমাণ ক্ষতি করার সক্ষমতা ইরানের কতটা রয়েছে, তা এখনও স্পষ্ট নয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যে নতুন যুদ্ধ অনিবার্য, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সময় এখনও আসেনি। পাল্টাপাল্টি হুমকি, সামরিক প্রস্তুতি ও হরমুজ প্রণালিতে সংঘাতের বিস্তার পরিস্থিতিকে আরও বিপজ্জনক করে তুলছে।
ভোরের আকাশ/আ.র