যুদ্ধের মধ্যে নির্বাচন হলে ইউক্রেন ধ্বংসের ঝুঁকি আছে: জেলেনস্কি

যুদ্ধ চলাকালে ইউক্রেনে নির্বাচন আয়োজন করা হলে দেশটি বিভক্ত হয়ে ধ্বংসের ঝুঁকিতে পড়তে পারে বলে সতর্ক করেছেন প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। তার দাবি, রাশিয়া বিপুলসংখ্যক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র মজুত করছে এবং আরও তিন লাখ সেনা সমাবেশের প্রস্তুতি নিচ্ছে। খবর দ্য গার্ডিয়ানের।
শনিবার কয়েকজন নির্বাচিত সাংবাদিকের সঙ্গে এক ব্রিফিংয়ে প্রথমবারের মতো যুদ্ধের মধ্যে নির্বাচন আয়োজনের দাবির বিষয়ে সরাসরি মন্তব্য করেন জেলেনস্কি। ব্রিফিংয়ের বিস্তারিত রোববার (২৩ আগস্ট) প্রকাশ করা হয়।
জেলেনস্কি বলেন, রাশিয়ার পক্ষ থেকে যুদ্ধবিরতির কোনো আগ্রহ দেখা যাচ্ছে না। এমন পরিস্থিতিতে নির্বাচন আয়োজনের চিন্তা বাস্তবসম্মত নয়।
তিনি বলেন, আমরা যদি দেশকে ধ্বংস করতে চাই, তাহলে এমন যুদ্ধের মধ্যেই নির্বাচন আয়োজন করতে পারি।
জেলেনস্কির মতে, এই যুদ্ধের মধ্যে নির্বাচন বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করবে। এখন নির্বাচন ইউক্রেনের জন্য একটি সুনামির মতো হবে, যা দেশটিকে বিভক্ত করে ফেলবে।
তিনি বলেন, তার মূল লক্ষ্য যুদ্ধের অবসান ঘটানো এবং ইউক্রেনকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে টিকিয়ে রাখা।
রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন শুরুর পর সামরিক আইন জারি হওয়ায় ইউক্রেনে নির্বাচন স্থগিত রয়েছে। জেলেনস্কির পাঁচ বছরের প্রেসিডেন্ট মেয়াদ ২০২৪ সালের মে মাসে শেষ হয়েছে। তবে যুদ্ধ চলাকালে নির্বাচন আয়োজনের পক্ষে ইউক্রেনে এতদিন বড় ধরনের চাপ দেখা যায়নি।
সম্প্রতি বরখাস্ত হওয়া সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী মিখাইলো ফেদোরভ নতুন নির্বাচনের দাবি তোলার পর বিষয়টি আবার সামনে আসে। এক মাস আগে বরখাস্ত হওয়া জনপ্রিয় এই মন্ত্রীর দাবি ছিল, ইউক্রেনে নতুন করে নির্বাচন হওয়া উচিত। রুশ আগ্রাসন শুরুর পর দেশের ভেতর থেকে জেলেনস্কির নেতৃত্বের বিরুদ্ধে এটিকে অন্যতম প্রকাশ্য চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
জেলেনস্কি বলেন, ইউক্রেনের মিত্ররা যদি নিরাপদ, বৈধ ও গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচন আয়োজনের জন্য সুনির্দিষ্ট শর্ত তৈরি করতে পারে, তাহলে তিনি নির্বাচনের পক্ষে থাকবেন।
তবে সে ক্ষেত্রে সামরিক বাহিনীর সদস্যদেরও ভোট দেওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। সম্মুখসারিতে থাকা সেনাদের পাশাপাশি বিদেশে যুদ্ধের কারণে আশ্রয় নেওয়া লাখো ইউক্রেনীয় নাগরিককেও ভোটের আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ও গোলাবর্ষণের ঝুঁকি ছাড়া নিরাপদ পরিবেশে নির্বাচন আয়োজন করতে হবে।
ফেদোরভের বরখাস্তের বিষয়ে জেলেনস্কি বলেন, তিনি এমন কিছু দায়িত্ব নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন, যা সামরিক বাহিনীর আওতাভুক্ত। এ কারণে তাকে পদ থেকে সরানো হয়েছে।
জেলেনস্কি জানান, ফেদোরভকে সরকারের চারটি বিকল্প পদ দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হলেও তিনি কোনোটি গ্রহণ করেননি। তবে ফেদোরভের প্রতি তার ব্যক্তিগত শ্রদ্ধা রয়েছে বলেও জানান ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট।
এ ছাড়া জেলেনস্কি দাবি করেছেন, রাশিয়ার হাতে বর্তমানে ৬০০ থেকে ৬৩০টি উচ্চগতির ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে। শীতের আগে প্রতি মাসে আরও ১০০টির কিছু বেশি ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির চেষ্টা করছে মস্কো। রাশিয়ার বছরে সর্বোচ্চ এক হাজার ৩০০টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে।
এসব ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে ইউক্রেনের অবকাঠামো, গুদাম ও রাজধানী কিয়েভে হামলা চালানো হয়েছে। এতে বেসামরিক হতাহতের সংখ্যাও বেড়েছে। ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকাতে কার্যকর প্রতিরোধব্যবস্থার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রের ঘাটতি রয়েছে বলেও জানান জেলেনস্কি।
তিনি বলেন, শীতকালীন প্রতিরক্ষা পরিকল্পনার জন্য ইউক্রেন ৩০০টি প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র চেয়েছে। দেশটির বিমানবাহিনীর চাহিদা ৩৬০টি। তবে বছরে প্রায় ৬০০টি সবচেয়ে সক্ষম প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন হওয়ায় এত বড় সরবরাহ নিশ্চিত করা কঠিন বলেও স্বীকার করেন তিনি।
জেলেনস্কি জানান, ফ্রান্সের সঙ্গে চলতি বছর অন্তত একটি সাম্প-টি আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সরবরাহের বিষয়ে সমঝোতা হয়েছে। জার্মানির কাছ থেকেও ২০২৭-২৮ সালে প্রায় ৬০০টি প্যাট্রিয়ট প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্র পাওয়ার বিষয়ে সমঝোতা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রকে নিজেদের মজুত থেকে মাত্র ৫ থেকে ১০ শতাংশ ক্ষেপণাস্ত্র ইউক্রেনকে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। জেলেনস্কির দাবি, ইউক্রেন এর জন্য অর্থ দিতে প্রস্তুত। এতে শীতকাল পার করা এবং বেসামরিক মানুষের জীবন রক্ষায় বড় ধরনের সহায়তা মিলবে।
এদিকে জেলেনস্কির সঙ্গে শনিবার ফোনালাপের পর ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ জানান, ইউক্রেনকে আরও সহায়তা জোরদারে তিনি সম্মত হয়েছেন। এর মধ্যে প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহও রয়েছে।
রাশিয়া চলতি বছরের শেষ নাগাদ পূর্বাঞ্চলীয় দোনেৎস্ক প্রদেশের বাকি অংশ দখলের জন্য নতুন করে সামরিক অভিযান জোরদার করার প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে দাবি করেছেন জেলেনস্কি। তবে কিয়েভ ও স্লোভিয়ানস্কসহ গুরুত্বপূর্ণ শহরসমৃদ্ধ ওই অঞ্চল পুরোপুরি দখল করতে মস্কো ব্যর্থ হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন তিনি।
জেলেনস্কি আরও দাবি করেছেন, সেপ্টেম্বরে রাশিয়ার সংসদীয় নির্বাচন শেষ হওয়ার পর মস্কো আরও তিন লাখ সেনা নিয়োগের চেষ্টা করতে পারে।
তার মতে, এটি হবে মূলত সীমিত পরিসরের সেনা সমাবেশ। মস্কো, সেন্ট পিটার্সবার্গসহ বড় শহরগুলোকে এড়িয়ে দেশের অন্য অঞ্চল থেকে সেনা সংগ্রহ করা হতে পারে। এর মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে অচলাবস্থায় থাকা সম্মুখসারিতে নতুন গতি আনার চেষ্টা করবে রাশিয়া বলে মন্তব্য করেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট। সূত্র : দ্য গার্ডিয়ান
ভোরের আকাশ/এসএইচ