দিল্লির রাজপথে বিরোধীদের শক্তি প্রদর্শন, চাপে মোদি সরকার

ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ এবং ভোটার তালিকা সংশোধনে অনিয়মের অভিযোগে দিল্লির রামলীলা ময়দানে বিশাল সমাবেশ ও বিক্ষোভ করেছে বিরোধী দলগুলোর জোট 'ইন্ডিয়া'। নভেম্বর মাসের শুরুতে আয়োজিত এই আন্দোলনকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকারের জন্য অন্যতম বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা ও ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তোলার পাশাপাশি সমাবেশ থেকে নরেন্দ্র মোদি নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় সরকারেরও সমালোচনা করেন বিরোধী নেতারা। তাদের বক্তব্যে সংবিধান, গণতন্ত্র ও ভোটাধিকার রক্ষার বিষয়টি গুরুত্ব পায়।
সমাবেশে রাহুল গান্ধী বলেন, কেউ যত ক্ষমতাশালী বা ধনী হোন না কেন, সংবিধানের ঊর্ধ্বে নন। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনসহ বিভিন্ন নির্বাচনে ভোট কারচুপির অভিযোগ তুলে প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে পদ থেকে সরানো এবং তার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি। রাহুলের বক্তব্য, জ্ঞানেশ কুমারকে পদ থেকে সরানোর পর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের বিরুদ্ধে আইনগত পদক্ষেপের প্রশ্ন উঠবে।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও নির্বাচন কমিশন ও বিজেপির বিরুদ্ধে যৌথভাবে দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে দুর্বল করার অভিযোগ তোলেন। পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকা থেকে বিপুলসংখ্যক মানুষের নাম বাদ যাওয়ার অভিযোগ তুলে জ্ঞানেশ কুমারকে ‘ভ্যানিশ কুমার’ বলে কটাক্ষ করেন তিনি। মমতার দাবি, এই আন্দোলন কোনো দলের ক্ষমতা দখলের লড়াই নয়; বরং সাধারণ মানুষের ভোটাধিকার রক্ষার উদ্যোগ। গণতন্ত্র রক্ষায় তরুণদের সামনে এগিয়ে আসার আহ্বানও জানান তিনি।
সমাবেশে মল্লিকার্জুন খাড়্গে, অখিলেশ যাদব, তেজস্বী যাদবসহ অন্য বিরোধী নেতারাও নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা ও ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। ২১টি বিরোধী দলের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণে কর্মসূচিটি কেবল কংগ্রেসের দলীয় সমাবেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বৃহত্তর বিরোধী মঞ্চের রূপ পেয়েছে।
তবে বিরোধীদের অভিযোগের বিপরীতে নির্বাচন কমিশনের বক্তব্যও রয়েছে। কমিশনের যুক্তি, ভোটার তালিকা সংশোধনের উদ্দেশ্য যোগ্য ভোটারদের নাম নিশ্চিত করা এবং ভুয়া, মৃত কিংবা একাধিকবার অন্তর্ভুক্ত নাম বাদ দেওয়া।
এ আন্দোলনে রাজনৈতিক দলগুলোর বাইরেও ছাত্র ও যুব সংগঠনের ভূমিকা আলোচনায় এসেছে। জ্ঞানেশ কুমার ও বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে দিল্লিতে প্রথম দিকের যুব আন্দোলনগুলোর অন্যতম মুখ ছিল ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)। সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপক ৩১ অক্টোবর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। মমতা তরুণ আন্দোলনকারীদের ভূমিকার প্রশংসা করেন এবং তাদের আন্দোলনের পাশে থাকার বার্তা দেন।
তবে পরদিন রামলীলা ময়দানের বিরোধী জোটের সমাবেশে অংশ নেয়নি সিজেপি। অভিজিৎ দীপক জানান, তাদের সংগঠন স্বাধীন ও নিরপেক্ষ মঞ্চ হিসেবে কাজ করে। কোনো রাজনৈতিক জোটের অংশ না হয়েও ভোট চুরির অভিযোগের বিরুদ্ধে যেকোনো সংগঠনের আন্দোলনকে তারা সমর্থন করবেন।
অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের নেত্রী নেহা বোরাও এর আগে আন্দোলনে সমর্থন জানিয়েছিলেন। তার দাবি, জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ, এসআইআর বন্ধ এবং সংশ্লিষ্ট আইন প্রত্যাহারের দাবিতে বৃহত্তর গণআন্দোলন প্রয়োজন। ফলে রাজনৈতিক দলের পাশাপাশি ছাত্র ও যুব সংগঠনগুলোর অবস্থানও আন্দোলনটিকে আলাদা মাত্রা দিয়েছে।
সমাবেশ ঘিরে দিল্লির ব্যবসায়িক ক্ষতির বিষয়টিও সামনে এসেছে। চেম্বার অব ট্রেড অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির চেয়ারম্যান ব্রিজেশ গোয়েলের দাবি, কর্মসূচির কারণে দিল্লির ২০ থেকে ২৫টি বড় বাজারের প্রায় আড়াই লাখ দোকান বন্ধ ছিল। সংগঠনটির হিসাব অনুযায়ী, খুচরা ও পাইকারি ব্যবসা, পরিবহণ, পর্যটনসহ বিভিন্ন খাতে ক্ষতির পরিমাণ ১০ থেকে ১১ হাজার কোটি টাকা। তবে এটি ব্যবসায়ী সংগঠনের নিজস্ব হিসাব; ক্ষতির পরিমাণ স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়নি।
উৎসবের মৌসুমে এমন ক্ষতির দাবি সামনে আসায় রাজনৈতিক কর্মসূচির প্রভাব ও ব্যবসায়ীদের ক্ষতিপূরণ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। রাহুল গান্ধী অবশ্য আন্দোলনে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের স্থানীয় বাজার থেকে কেনাকাটা করার আহ্বান জানান। অন্যদিকে, বিজেপিও সমাবেশের সময় ও উদ্দেশ্য নিয়ে বিরোধীদের সমালোচনা করেছে।
ভোরের আকাশ/আ.র