আর্টেমিস-২: চন্দ্রাভিযান শেষে নিরাপদে ফিরলেন চার নভোচারী

যুক্তরাষ্ট্রের পূর্বাঞ্চলীয় সময় শুক্রবার রাত ৮টা ৭ মিনিট, আর বাংলাদেশ সময় আজ শনিবার সকাল ৬টা ৭ মিনিটে তাদের বহনকারী ‘ওরিয়ন’ মহাকাশযানটি ক্যালিফোর্নিয়ার সান দিয়েগো উপকূলে প্রশান্ত মহাসাগরে অবতরণ করে।
চাঁদের কক্ষপথ প্রদক্ষিণের ঐতিহাসিক ১০ দিনের অভিযান শেষে নিরাপদে পৃথিবীতে ফিরেছেন আর্টেমিস-২ মিশনের চার নভোচারী। যুক্তরাষ্ট্রের পূর্বাঞ্চলীয় সময় শুক্রবার রাত ৮টা ৭ মিনিট, আর বাংলাদেশ সময় আজ শনিবার সকাল ৬টা ৭ মিনিটে তাদের বহনকারী ‘ওরিয়ন’ মহাকাশযানটি ক্যালিফোর্নিয়ার সান দিয়েগো উপকূলে প্রশান্ত মহাসাগরে অবতরণ করে। খবর সিএনএন।
অবতরণের পর আর্টেমিস-২-এর কমান্ডার রিড ওয়াইজম্যান ওরিয়ন ক্যাপসুলের ভেতরে থাকা নভোচারীদের অবস্থা সম্পর্কে একটি ইতিবাচক প্রতিবেদন দিয়েছেন। তিনি বলেন, অসাধারণ এক যাত্রা ছিল! আমরা স্থিতিশীল আছি। চার নভোচারীই সম্পূর্ণ সুস্থ আছেন।
ওই সময়ে মুহূর্তটি উদযাপন করতে কলাম্বিয়া মেমোরিয়াল স্পেস সেন্টারে যারা জমায়েত হয়েছিলেন, তারা 'আর্টেমিস' শ্লোগান ও চিৎকার দিয়ে উল্লাস করেছেন। এরপরই ওরিয়ন থেকে একটি নৌযানে করে মার্কিন নৌবাহিনীর উদ্ধারকারী জাহাজ ‘ইউএসএস জন পি মুরথা’র মেডিক্যাল বে-তে নিয়ে যাওয়া হয় নভোচারীদের। সেখানে তাদের রক্তচাপ, মস্তিষ্ক ও স্নায়ুর কার্যকারিতাসহ নানা পরীক্ষা করবেন চিকিৎসকেরা। পরে তাদের নেয়া হবে হিউস্টনের জনসন স্পেস সেন্টারে।
এর মধ্য দিয়ে সফলভাবে শেষ হলো ১০ দিনের এ রোমাঞ্চকর এক চন্দ্রাভিযান। ওরিয়ন নভোযানটি পাড়ি দিল চার নভোচারীসহ পৃথিবী থেকে চাঁদে যাওয়া ও আসার যাত্রায় মোট ৬ লাখ ৯৪ হাজার ৪৮১ মাইল পথ। গত ১ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্রের রিড ওয়াইজম্যান, ক্রিস্টিনা কোচ, ভিক্টর গ্লোভার এবং কানাডার জেরেমি হ্যানসেনকে নিয়ে শুরু হয়েছিল এ মহাকাশযাত্রা।
এর আগে ১৯৭০ সালের এপ্রিলে নাসার অ্যাপোলো-১৩ অভিযানে অংশ নেওয়া নভোচারীরা পৃথিবী থেকে সবচেয়ে দূরবর্তী জায়গায় ভ্রমণ করেছিলেন। ওই সময় তারা পৃথিবী থেকে প্রায় চার লাখ ১৭১ কিলোমিটার বা প্রায় দুই লাখ ৪৮ হাজার ৬৫৫ মাইল দূরে ভ্রমণ করেছিলেন।
এদিকে মহাকাশচারীরা পৃথিবীতে ফিরে আসায় স্বাগত জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। নভোচারীদের হোয়াইট হাউসে আমন্ত্রণ জানিয়েছে তিনি বলেছেন, আর্টেমিস–২ এর অসাধারণ ও প্রতিভাবান নভোচারীদের অভিনন্দন। পুরো যাত্রাটি ছিল চমৎকার, অবতরণ ছিল নিখুঁত এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে আমি এর চেয়ে বেশি গর্বিত হতে পারি না! শিগগিরই হোয়াইট হাউসে আপনাদের সবার সঙ্গে দেখা করার অপেক্ষায় আছি। আমরা আবারও এটি করব এবং পরবর্তী লক্ষ্য—মঙ্গল!
আর্টেমিস-২ মিশনটি একাধিক নতুন ইতিহাস গড়েছে। চাঁদের দূরবর্তী অংশে অবস্থানের সময় পৃথিবী থেকে তাদের দূরত্ব ছিল ২ লাখ ৫২ হাজার ৭৫৭ মাইল, যা ১৯৭০ সালের অ্যাপোলো-১৩ মিশনের রেকর্ড (২ লাখ ৪৮ হাজার ৬৫৫ মাইল) ভেঙে দিয়েছে। এ ছাড়া ভিক্টর গ্লোভার প্রথম অশ্বেতাঙ্গ, ক্রিস্টিনা কোচ প্রথম নারী এবং জেরেমি হ্যানসেন প্রথম অ-মার্কিন হিসেবে চাঁদের কক্ষপথ ভ্রমণের অনন্য ইতিহাস গড়েছেন। নভোচারীরা এই চন্দ্রাভিযানে বিরল অভিজ্ঞতার সাক্ষী হয়েছেন। তারা চন্দ্রপৃষ্ঠে অন্তত ছয়টি উজ্জ্বল উল্কাপাতের ঝলক সরাসরি দেখেছেন।
অ্যাপোলোর পর মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার আবারও চাঁদে মানুষ পাঠানোর এক ঐতিহাসিক চন্দ্রাভিযান কর্মসূচি আর্টেমিস। ‘আর্টেমিস ওয়ান’, ‘আর্টেমিস টু’ ও ‘আর্টেমিস থ্রি’ নামে আর্টেমিস মিশন তিনটি প্রধান ধাপে পরিকল্পিত, যার লক্ষ্য পর্যায়ক্রমে মানুষকে চাঁদে নিয়ে যাওয়া। আর্টেমিস ওয়ান মহাকাশে যায় ২০২২ সালে, যা ছিল মানববিহীন পরীক্ষামূলক ধাপ। সেবার শক্তিশালী এসএলএস রকেট ও ওরিয়ন ক্যাপসুল কোনো নভোচারী ছাড়াই চাঁদের কক্ষপথ ঘুরে নিরাপদে পৃথিবীতে ফিরে আসে।
আর্টেমিস টু ছিল মিশনের প্রথম মানববাহী ধাপ। এ ধাপে নভোচারীরা ওরিয়ন ক্যাপসুলে করে চাঁদের চারপাশ প্রদক্ষিণ এবং মহাকাশযানের সব ব্যবস্থা পরীক্ষা করেলেও চাঁদে পা রাখেননি। আর্টেমিস থ্রি মিশনের সম্ভাব্য উৎক্ষেপণ সময় ২০২৭, যা আর্টেমিস মিশনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। এ ধাপে ৫৫ বছর পর মানুষ পুনরায় চাঁদের মাটিতে পা রাখবে।
ভোরের আকাশ/এনউব