পাকিস্তানের আকাশসীমা বন্ধ, চীনের আকাশপথ ব্যবহারে আগ্রহী ভারত

পাকিস্তানের আকাশসীমা ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞার কারণে ইউরোপ ও পশ্চিমা দেশগুলোতে ফ্লাইট পরিচালনায় বাড়তি সময় ও খরচ হচ্ছে ভারতের। এ পরিস্থিতিতে বিকল্প রুট হিসেবে চীনের সিনকিয়াং প্রদেশের হোটান এলাকার আকাশপথ ব্যবহারের অনুমতি চেয়ে বেইজিংয়ের সঙ্গে আলোচনা করছে নয়াদিল্লি।
বেসামরিক বিমান পরিবহনমন্ত্রী রাম মোহন নাইডু মঙ্গলবার সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, বিষয়টি নিয়ে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় চীনা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করছে। তিনি বলেন, আলোচনা চলছে, শেষ পর্যন্ত কী হয় তা দেখার বিষয়।
২০২৫ সালের ২২ এপ্রিল জম্মু-কাশ্মীরের পেহেলগামে হামলার দুই দিন পর ভারতীয় উড়োজাহাজের জন্য আকাশসীমা বন্ধ করে পাকিস্তান। এর ছয় দিন পর পাকিস্তানি উড়োজাহাজের জন্য নিজেদের আকাশসীমা বন্ধ করে ভারতও। এরপর থেকে ভারতীয় এয়ারলাইনগুলোকে পাকিস্তান এড়িয়ে দীর্ঘ ঘুরপথে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার বিভিন্ন গন্তব্যে যেতে হচ্ছে।
সর্বশেষ ১৬ সেপ্টেম্বরের নির্দেশনায় পাকিস্তান তাদের নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ ২৪ অক্টোবর পর্যন্ত বাড়িয়েছে। এতে ফ্লাইট পরিচালনার সময় ও জ্বালানি খরচ উভয়ই বেড়েছে।
এই পরিস্থিতিতে চীনের সিনকিয়াং অঞ্চলের হোটান এলাকার আকাশপথকে সম্ভাব্য বিকল্প হিসেবে দেখছে ভারত। হোটান সিনকিয়াংয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ শহর, যা ঐতিহাসিকভাবে প্রাচীন সিল্ক রুটের অংশ ছিল।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ‘হিন্দুস্তান টাইমস’-এর প্রকাশিত একটি মানচিত্রের তথ্য অনুযায়ী, পাকিস্তানের আকাশসীমা এড়িয়ে দিল্লি থেকে ইস্তাম্বুল যেতে প্রায় ৭ ঘণ্টা ৪৭ মিনিট সময় লাগে। পাকিস্তানের আকাশপথ ব্যবহার করা গেলে সময় কমে প্রায় ৬ ঘণ্টা ৭ মিনিটে নামতে পারে। হোটান হয়ে বিকল্প রুট চালু হলে সময় ও জ্বালানি খরচ কিছুটা কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে ভারতের রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী এয়ার ইন্ডিয়ার ওপর। রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এয়ার ইন্ডিয়াই প্রথম ভারত সরকারকে চীনের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা শুরুর অনুরোধ জানায়। সংস্থাটির হিসাব অনুযায়ী, পাকিস্তানের আকাশসীমা ব্যবহারের নিষেধাজ্ঞা অব্যাহত থাকলে বছরে তাদের ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৬০ কোটি ডলার হতে পারে।
এয়ার ইন্ডিয়ার হিসাবে, হোটান হয়ে বিকল্প রুট ব্যবহার করা গেলে প্রতি সপ্তাহে প্রায় ১০ কোটি ৮৪ লাখ রুপি সাশ্রয় হতে পারে। বাড়তি পরিচালন ব্যয়ের কারণে নিউইয়র্ক ও ভ্যাঙ্কুভার থেকে দিল্লির ফ্লাইট ১৫ শতাংশ কমানোর কথাও জানিয়েছে সংস্থাটি। একই কারণে দিল্লি-ওয়াশিংটন রুটের ফ্লাইটও বন্ধ করতে হয়েছে।
তবে হোটান আকাশপথ ব্যবহারের অনুমতি পাওয়া সহজ হবে না। প্রস্তাবিত রুটে ভারতীয় উড়োজাহাজকে লাদাখের লেহ হয়ে চীনের আকাশসীমায় প্রবেশ করতে হবে। এরপর হোটানের ওপর দিয়ে পশ্চিম দিকে গিয়ে মধ্য এশিয়ার আকাশসীমা পেরিয়ে ইউরোপে যেতে হবে।
হোটান ও আশপাশের এলাকা ভৌগোলিকভাবে দুর্গম এবং চীনের জন্য কৌশলগতভাবে স্পর্শকাতর। জরুরি অবতরণের প্রয়োজন হলে উড়োজাহাজকে সিনকিয়াংয়ের উরুমচি বা কাশগরের মতো নির্দিষ্ট বিমানবন্দরে নামতে হতে পারে। ফলে ভারতের প্রস্তাব বিবেচনায় চীনকে নিরাপত্তা ও কৌশলগত বিষয়সহ একাধিক দিক পর্যালোচনা করতে হবে।
এর মধ্যেও ভারত-চীন সম্পর্কের সাম্প্রতিক উন্নতিকে সম্ভাবনার জায়গা হিসেবে দেখছে নয়াদিল্লি। ২০২০ সালের পূর্ব লাদাখের গলওয়ান সংঘর্ষের পর দুই দেশের সম্পর্কে টানাপোড়েন তৈরি হলেও সাম্প্রতিক সময়ে বাণিজ্য ও যোগাযোগসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে।
২০২৫ সালের অক্টোবর থেকে ভারতের ইন্ডিগো কলকাতা-গুয়াংজু রুটে সরাসরি ফ্লাইট চালু করে। নভেম্বরে দিল্লি-গুয়াংজু রুটেও ফ্লাইট শুরু হয়। চলতি বছরের ১ ফেব্রুয়ারি এয়ার ইন্ডিয়া দীর্ঘ ছয় বছর পর দিল্লি-সাংহাই রুটে ফ্লাইট পুনরায় চালু করে। এছাড়া চায়না সাদার্নও গুয়াংজু-দিল্লি সরাসরি ফ্লাইট চালুর ঘোষণা দিয়েছে।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্রের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রায় এক বছর ধরে হোটান আকাশপথ ব্যবহারের বিষয়ে আগ্রহ দেখাচ্ছে ভারত। বিষয়টি নিয়ে দুই দেশই আলোচনা করছে।
এর আগে নিউইয়র্কে এশিয়া সোসাইটির এক অনুষ্ঠানে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর বলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোর তুলনায় ভারত-চীন সম্পর্ক এখন ভালো অবস্থায় রয়েছে। তাঁর মন্তব্যের পর হোটান আকাশপথ নিয়ে আলোচনায় নতুন করে আশাবাদ তৈরি হয়েছে।
ভোরের আকাশ/এনএস