গাজার ছায়ায় কাশ্মীর, ভারতকে নিয়ে ট্রাম্পের নতুন কূটনীতি!

ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন ‘বোর্ড অব পিস’-এর ঘোষণা দেন, তখন সেটিকে প্রথমে গাজা যুদ্ধ–পরবর্তী পুনর্গঠনের একটি উদ্যোগ বলেই মনে হয়েছিল। কিন্তু খসড়া সনদের ভাষা, কাঠামো এবং ক্ষমতার বিন্যাস গভীরভাবে দেখলে স্পষ্ট হয়—এটি কেবল গাজা নিয়ে নয়, বরং ভবিষ্যতে বিশ্বের যেকোনো সংঘাতকে আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপের আওতায় আনার নতুন কৌশল।
এই কারণেই বোর্ড অব পিসে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ ভারতকে এমন এক কৌশলগত দ্বিধার মুখে ফেলেছে, যা সরাসরি দেশটির পররাষ্ট্রনীতির মূল দর্শনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
বোর্ড অব পিসের সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো—এখানে ক্ষমতা প্রাতিষ্ঠানিক নয়, ব্যক্তিকেন্দ্রিক। ট্রাম্প হবেন ‘প্রারম্ভিক চেয়ারম্যান’, যার মেয়াদের কোনো সীমা নেই। সনদের অর্থ, ব্যাখ্যা ও প্রয়োগ—সবকিছুর ওপর তার চূড়ান্ত কর্তৃত্ব থাকবে। কার্যত এটি এমন এক ব্যবস্থা, যেখানে শান্তি কাকে বলে এবং কোথায় হস্তক্ষেপ হবে—তা নির্ধারণ করবেন একজন রাষ্ট্রনায়ক, কোনো বহুপাক্ষিক কাঠামো নয়।
এই মডেল জাতিসংঘের সীমাবদ্ধতার সমালোচনা করলেও, তার বিকল্প হিসেবে দাঁড় করাচ্ছে আরও কম জবাবদিহিমূলক একটি কাঠামো।
ভারতের উদ্বেগের কেন্দ্রে আছে একটি নাম—কাশ্মীর। বোর্ডের ম্যান্ডেট এতটাই বিস্তৃত ও অস্পষ্ট যে, ভবিষ্যতে ভারত–পাকিস্তান সম্পর্ককে ‘সংঘাত’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করে সেখানে বাইরের মধ্যস্থতার চেষ্টা চালানো কঠিন হবে না। পাকিস্তানের ইতিমধ্যেই বোর্ডে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত সেই আশঙ্কাকে আরও বাস্তব করে তুলেছে।
ভারত বরাবরই বলে এসেছে—কাশ্মীর একটি দ্বিপাক্ষিক বিষয়, কোনো আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতার জায়গা নেই। কিন্তু ট্রাম্পের সভাপতিত্বে ভারত ও পাকিস্তান যদি একই বোর্ডে বসে, যেখানে সিদ্ধান্ত ও ব্যাখ্যার ক্ষমতা তাঁর হাতে—তাহলে সেই নীতিগত অবস্থান কতটা অটুট থাকবে?
আরও একটি বড় নৈতিক প্রশ্ন উঠছে ফিলিস্তিন প্রসঙ্গে। যে বোর্ড গাজার পুনর্গঠন নিয়ে সিদ্ধান্ত নেবে, সেখানে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের কোনো সরাসরি উপস্থিতি নেই। পরিবর্তে থাকবে একটি ‘টেকনোক্র্যাটিক প্যানেল’, বোর্ডের তত্ত্বাবধানে।
ভারত, যে দেশটি ১৯৮৮ সাল থেকে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দিয়ে আসছে এবং জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অবস্থানকে সমর্থন করে—তার পক্ষে এমন একটি কাঠামোয় যুক্ত হওয়া নৈতিকভাবে স্বস্তিকর নয়।
তবু একাংশের যুক্তি একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তাঁদের মতে, ভারত যদি বাইরে থাকে, তাহলে তুরস্ক, কাতার বা পাকিস্তানের মতো দেশগুলোই এজেন্ডা নির্ধারণ করবে। গ্লোবাল সাউথের নেতৃত্বের দাবিদার হতে চাইলে, বিতর্কিত হলেও এমন মঞ্চে উপস্থিত থাকা জরুরি।
এটি একটি বাস্তববাদী যুক্তি। কিন্তু প্রশ্ন হলো—সব মঞ্চে উপস্থিত থাকাই কি নেতৃত্ব, নাকি কিছু মঞ্চ প্রত্যাখ্যান করাও এক ধরনের নেতৃত্ব?
বোর্ড অব পিসের আর্থিক কাঠামো এই উদ্যোগের উদ্দেশ্য নিয়ে সন্দেহ আরও ঘনীভূত করে। প্রায় এক বিলিয়ন ডলার নগদ অবদানের বিনিময়ে স্থায়ী সদস্যপদ ও বাড়তি প্রভাবের সুযোগ—এই ‘পে-টু-প্লে’ ব্যবস্থা শান্তির ধারণাকে বাজারমুখী করে তোলে।
এর সঙ্গে যোগ হয়েছে ট্রাম্পের পরিচিত চাপের কূটনীতি—শুল্ক, বাণিজ্য চুক্তি এবং প্রকাশ্য হুমকি। ফ্রান্স বোর্ডে যোগ দিতে অনীহা দেখানোর পরই ২০০ শতাংশ শুল্কের হুমকি সেই বাস্তবতারই স্মারক।
সরাসরি না বললে ঝুঁকি আছে, আবার হ্যাঁ বললেও নীতিগত ক্ষতি স্পষ্ট। হয়তো এই মুহূর্তে সবচেয়ে বুদ্ধিমানের পথ হলো সময় নেওয়া—বোর্ডের পরিধি, ক্ষমতা ও ভবিষ্যৎ ভূমিকা আরও স্পষ্ট না হওয়া পর্যন্ত সিদ্ধান্ত ঝুলিয়ে রাখা।
কারণ প্রশ্নটা শুধু একটি বোর্ডে যোগ দেওয়ার নয়। প্রশ্নটা হলো—ভারত কি এমন একটি ব্যবস্থার অংশ হবে, যা ভবিষ্যতে কাশ্মীরের মতো সংবেদনশীল ইস্যুকে আন্তর্জাতিক দরকষাকষির টেবিলে তুলে দিতে পারে?
শান্তির নামে যদি সেই ঝুঁকি নিতে হয়, তাহলে ভারতকে খুব ভেবেচিন্তেই পরের পা ফেলতে হবে।
সূত্র: দ্য অয়ার
ভোরের আকাশ/মো.আ.