বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন
দক্ষিণ এশিয়ায় কমেছে দারিদ্র্যতা, শিক্ষা ও জলবায়ু ঝুঁকিতে উদ্বেগ

বিশ্বজুড়ে চরম দারিদ্র্য কমার গতি থমকে গেলেও গত তিন দশকে দক্ষিণ এশিয়ায় বড় অগ্রগতি হয়েছে। ১৯৯০ সালে অঞ্চলটির অর্ধেক মানুষ চরম দারিদ্র্যে ছিলেন। ২০২৬ সালে এ হার নেমে এসেছে ২ শতাংশে। বিশ্বব্যাংকের নতুন ‘পভার্টি, প্রস্পারিটি, অ্যান্ড প্ল্যানেট রিপোর্ট ২০২৬’-এ এই তথ্য উঠে এসেছে।
একই প্রতিবেদন বলছে— আয়ের হিসাবের বাইরে শিক্ষা ও স্যানিটেশনে দক্ষিণ এশিয়া এখনো পিছিয়ে। জলবায়ুর আঘাতের ঝুঁকিতে থাকা মানুষের অনুপাতও এ অঞ্চলে সবচেয়ে বেশি।
কর্মসংস্থানকে কেন্দ্রে রেখে সাজানো প্রতিবেদনটির শিরোনাম ‘জবস অ্যাট দ্য সেন্টার অব পভার্টি ইরাডিকেশন’। এতে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালে বিশ্বে আনুমানিক ৮১ কোটি ১০ লাখ মানুষ দিনে ৩ ডলারের কম আয়ে চলছেন (২০২১ সালের ক্রয়ক্ষমতা সমতা হিসাবে)। অর্থাৎ প্রতি ১০ জনে একজন। এ হার ২০১৯ সালের পর বদলায়নি। ২০০০–১৩ সালের গতি ধরে রাখা গেলে আরও ২৪ কোটি ৩০ লাখ মানুষ দারিদ্র্য থেকে বেরোতে পারতেন।
দক্ষিণ এশিয়ার অগ্রগতি
দক্ষিণ এশিয়ার চিত্র ভিন্ন। ১৯৯০ সালে অঞ্চলটিতে ৫০ কোটি ৩০ লাখ মানুষ চরম দারিদ্র্যে ছিলেন। ২০২৬ সালে সংখ্যাটি ২ কোটি ৯০ লাখ। বিশ্বের চরম দরিদ্রদের মধ্যে দক্ষিণ এশীয়দের ভাগ ২২ শতাংশ থেকে নেমে ৪ শতাংশে এসেছে। ২০২৫ ও ২০২৬ সালের সংখ্যা বিশ্বব্যাংকের অনুমান।
তবে উঁচু দারিদ্র্যসীমার চিত্রটা এত ভালো নয়। উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশগুলোর মান ধরা হয় দিনে ৮ ডলার ৩০ সেন্ট। এর নিচে এখনো দক্ষিণ এশিয়ার ৭১ শতাংশ মানুষ, সংখ্যায় ১২১ কোটি ৯০ লাখ। বিশ্বে এ রেখার নিচে থাকা মানুষের ৩৩ শতাংশ এ অঞ্চলের বাসিন্দা। দিনে ৪ ডলার ২০ সেন্টের নিচে আছেন ১১ শতাংশ, অর্থাৎ প্রায় ১৮ কোটি ৩০ লাখ। অনেকে চরম দারিদ্র্য পেরিয়েছেন, কিন্তু নিরাপদ অবস্থানে পৌঁছাননি। একটি ধাক্কায় তাদের আবার পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকি থেকে যায়।
বাংলাদেশ নিয়ে প্রতিবেদনে আলাদা বিশ্লেষণ কম, তবে কিছু হিসাব আছে। ২০২৪ সালের তথ্য অনুযায়ী, দিনে ৪ ডলার ২০ সেন্টের নিচে আয় করেন বাংলাদেশের ৩ কোটি মানুষ, যা বিশ্বের এ শ্রেণির দরিদ্রদের ২ শতাংশ। ৮ ডলার ৩০ সেন্টের নিচে আয় করেন ১১ কোটি ৯০ লাখ, যা বিশ্বের মোট সংখ্যার ৩.২ শতাংশ।
প্রতিবেদনে ‘সমৃদ্ধি ঘাটতি’ নামে একটি সূচকও আছে। এটি দেখায় দিনে ২৮ ডলারের মানদণ্ডে পৌঁছাতে মানুষের আয় গড়ে কত গুণ বাড়তে হবে। বিশ্বে এ ঘাটতি ১৯৯০ সালের ১০.৫ থেকে কমে ২০২৬ সালে ৪.৫-এ নেমেছে। বৈশ্বিক ঘাটতিতে বাংলাদেশের অংশ ১৯৯০ সালে ছিল ২.১ শতাংশ, ২০২৬ সালে ২.৩ শতাংশ।
শিক্ষা ও দারিদ্র্য
শিক্ষার সঙ্গে দারিদ্র্যের যোগ প্রতিবেদনে স্পষ্ট। বৈশ্বিক হিসাবে ২০২৪ সালে আনুষ্ঠানিক শিক্ষা না পাওয়া মানুষের মধ্যে চরম দারিদ্র্যের হার ২২ শতাংশ। মাধ্যমিক পর্যন্ত পড়াদের মধ্যে এ হার ৬ শতাংশ, উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যে ১ শতাংশ। ২০১৩ থেকে ২০২৪ সালে শিক্ষাহীনদের মধ্যে দারিদ্র্য কমার প্রায় পুরোটাই ঘটেছে পাঁচ দেশে— বাংলাদেশ, চীন, ভারত, ইন্দোনেশিয়া ও পাকিস্তান। এর প্রায় ৭০ শতাংশ ভারতের।
প্রতিবেদনের সিমুলেশন বলছে, দরিদ্র শ্রমিকদের শিক্ষা যদি দরিদ্র নন এমন শ্রমিকদের গড় স্তরে তোলা যায়, তাহলে বিশ্বে চরম দারিদ্র্য প্রায় অর্ধেক কমবে।
বহুমাত্রিক দারিদ্র্য সূচকে আয়ের পাশাপাশি শিক্ষা এবং মৌলিক সেবা (বিদ্যুৎ, স্যানিটেশন ও নিরাপদ পানি) বিবেচনা করা হয়। ১০৩টি অর্থনীতির হিসাবে ১৬.৭ শতাংশ মানুষ বহুমাত্রিকভাবে দরিদ্র। আয়ের হিসাবে এ হার ১১.৩ শতাংশ। দুই হিসাবের ব্যবধান সবচেয়ে বেশি দক্ষিণ এশিয়া ও সাব-সাহারান আফ্রিকায়। ২০২৩ সালের কাছাকাছি সময়ের তথ্যে দক্ষিণ এশিয়ায় বহুমাত্রিক দারিদ্র্য ১৬.৪ শতাংশ, আর চরম আয়দারিদ্র্য ৫.৩ শতাংশ। ব্যবধানের মূল কারণ শিক্ষা ও স্যানিটেশনের ঘাটতি।
জলবায়ু ঝুঁকি
জলবায়ু ঝুঁকি নিয়েও প্রতিবেদন আঞ্চলিক হিসাব দেওয়া হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, দক্ষিণ এশিয়ার ৮৮ শতাংশ মানুষ জীবদ্দশায় অন্তত একবার ক্ষতিকর জলবায়ু ঘটনার মুখে পড়তে পারেন। বিশ্বের সব অঞ্চলের মধ্যে এ হার সর্বোচ্চ। অঞ্চলের প্রতি পাঁচজনে চারজন তাপের ঝুঁকিতে, আর প্রতি ১০ জনে একজনের বেশি বন্যার ঝুঁকিতে। পানিসংকট সবচেয়ে বেশি ছড়িয়ে আছে দক্ষিণ এশিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকায়। দক্ষিণ এশিয়ায় প্রায় সবাই অন্তত একটি গুরুতর পরিবেশগত বা জলবায়ু বিপদের মুখে।
আশার দিক হলো, ঝুঁকিতে থাকা এবং একই সঙ্গে সামাল দিতে অক্ষম মানুষের অনুপাত ২০১০ সালের পর কমে ২০ শতাংশের নিচে নেমেছে। প্রতিবেদন বলছে, এটা হয়েছে দুর্বলতা কমার কারণে, ঝুঁকি কমার কারণে নয়। এর তুলনায় ২০২৪ সালে মধ্যপ্রাচ্য, উত্তর আফ্রিকা, আফগানিস্তান ও পাকিস্তান অঞ্চলে ৪৭ শতাংশ এবং সাব-সাহারান আফ্রিকায় ৩৫ শতাংশ মানুষ উচ্চ ঝুঁকিতে।
দক্ষিণ এশিয়ায় অপুষ্টিতে ভোগা মানুষের হার ২০০৪–০৬ সালের ১৯.৫ শতাংশ থেকে কমে ২০২৩–২৫ সালে ১০.৬ শতাংশে নেমেছে। সংখ্যায় এটি প্রায় ১০ কোটি কম। তবু বৃষ্টিনির্ভর ক্ষুদ্র কৃষিতে খরা, বন্যা ও তাপপ্রবাহ আয়ে বড় ধাক্কা দেয়।
কর্মসংস্থান
কর্মসংস্থান অংশের বিশ্লেষণ মূলত বৈশ্বিক, দক্ষিণ এশিয়ার আলাদা পরিসংখ্যান সীমিত। প্রতিবেদনের মূল কথা, দরিদ্র মানুষ কাজ করেন না, এমন নয়। দরিদ্র পরিবারের কর্মক্ষম প্রাপ্তবয়স্কদের কাজের হার দরিদ্র নন এমন পরিবারের চেয়ে মাত্র ৬ শতাংশ পয়েন্ট কম। কিন্তু দরিদ্র শ্রমিকেরা সপ্তাহে ৩ থেকে ৪ ঘণ্টা কম কাজ করেন, আর একজন কর্মীর ওপর নির্ভরশীল মানুষ থাকে তিন গুণ বেশি। চরম দরিদ্র শ্রমিকদের দুই-তৃতীয়াংশ কৃষিতে কাজ করেন। ২০০৩–২৪ সালে ১৩৮টি অর্থনীতির ৮৮টিতে দরিদ্রদের কর্মসংস্থান কমেছে। বেকারত্বের হার ৩–৪ শতাংশ; সমস্যা মূলত কাজে অংশগ্রহণ ও কাজের মান নিয়ে।
নারীর কাজের প্রসঙ্গে প্রতিবেদনে সরাসরি দক্ষিণ এশিয়ার উল্লেখ আছে। মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশে নারীর কর্মসংস্থান আয়ের স্তর অনুযায়ী প্রত্যাশিত মাত্রার অনেক নিচে। শিশুযত্নের সুযোগ, নিরাপদ ও সাশ্রয়ী পরিবহন এবং নারীর ভূমিকা নিয়ে সামাজিক ধারণা বড় বাধা। ভারতের গ্রামাঞ্চলের উদাহরণ টেনে প্রতিবেদন জানায়, সবচেয়ে গরিব পঞ্চমাংশ পরিবার আয়ের চার ভাগের এক ভাগেরও বেশি পায় কৃষিমজুরি থেকে, যা সবচেয়ে কম আয়ের কাজ।
সমাধানের পথ কী?
প্রতিবেদনে সমাধানের পথও দেখানো হয়েছে। দরিদ্র পরিবারে কর্মসংস্থান ৭৫ শতাংশে তুললে চরম দারিদ্র্য প্রায় এক-পঞ্চমাংশ কমবে। কৃষি ছেড়ে অকৃষি বা মজুরির কাজে গেলে কমবে এক-চতুর্থাংশ থেকে এক-তৃতীয়াংশ। ভালো মজুরির সুফল পান মূলত সবচেয়ে গরিবেরা। নতুন কাজের সুফল বেশি যায় দারিদ্র্যসীমার কাছাকাছি থাকা মানুষের কাছে, যাদের মধ্যে কর্মহীন প্রাপ্তবয়স্কদের বেশির ভাগই নারী। কিছু দেশে কেন্দ্রীভূত হয়ে থাকা দারিদ্র্য কমানো সম্ভব, তবে সেখানে অগ্রগতি দ্রুত হওয়ার সম্ভাবনা কম।
বিশ্বব্যাংক গ্রুপের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ও প্রধান অর্থনীতিবিদ মাইকেল ক্রেমার এবং ম্যানেজিং ডিরেক্টর ও প্রধান জ্ঞান কর্মকর্তা প্যাসকেল ডোনোহো জানিয়েছেন, দারিদ্র্য ও বৈষম্য কমানোর দীর্ঘ অগ্রগতির পর এখন লাভের গতি ধীর ও অসম হয়ে পড়েছে। চরম দারিদ্র্য ক্রমেই কয়েকটি দেশে কেন্দ্রীভূত হচ্ছে, যার বেশির ভাগ সাব-সাহারান আফ্রিকায় এবং সংঘাত বা ভঙ্গুর পরিস্থিতিতে থাকা দেশে। দ্রুত প্রবৃদ্ধি না হলে দরিদ্রের সংখ্যা বাড়বে, কারণ যেখানে দারিদ্র্য বেশি, সেখানে জনসংখ্যা বাড়ছে দ্রুত।
তাদের মতে, চরম দারিদ্র্য পেরোলেই অর্থনৈতিক নিরাপত্তা মেলে না। বিশ্বের প্রায় অর্ধেক মানুষ (৩৭০ কোটি) দিনে ৮ ডলার ৩০ সেন্টের নিচে আয় করেন। কোনো ধাক্কায় তারা আবার চরম দারিদ্র্যে পড়তে পারেন। ১৫০ কোটি মানুষ জলবায়ুর বিপদের মুখে, অথচ তা সামাল দেওয়ার সামর্থ্য তাদের নেই। আবার দরিদ্রতম দেশগুলোতে চরম দারিদ্র্য দূর করার জন্য যে প্রবৃদ্ধি দরকার, তা বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণ সামান্যই বাড়াবে।
ভোরের আকাশ/সু.পা