জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিতে ইউরোপজুড়ে বিক্ষোভ, শক্তিশালী হচ্ছে কট্টর ডানপন্থিরা

ইউরোপে জ্বালানির অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি এবং জীবনযাত্রার ব্যয় সংকটের কারণে বিভিন্ন দেশে তীব্র গণবিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে, যা মহাদেশটিতে কট্টর ডানপন্থি রাজনৈতিক শক্তিগুলোকে আরও শক্তিশালী করে তুলছে।
গত ফেব্রুয়ারিতে শুরু হওয়া যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ জ্বালানির দাম বাড়িয়ে পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। ইউরোপীয় কমিশনের হিসাব অনুযায়ী, বাণিজ্য ও জ্বালানি বাজারে বিঘ্নের কারণে এ সংঘাতে ইউরোপের আনুমানিক ১০০ বিলিয়ন ইউরো ক্ষতি হয়েছে। এ সময়ে গ্যাসের দাম প্রায় ১৪০ শতাংশ বেড়েছে এবং ডিজেলের দাম দ্বিগুণ হয়েছে।
ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসের উত্তর উপকণ্ঠে স্কুলের অবকাঠামোর অবনতি নিয়ে শুরু হওয়া বিক্ষোভ পরে ব্যাপক সহিংসতায় রূপ নেয়। কয়েক দশকের মধ্যে দেশটির অন্যতম গুরুতর অস্থিরতার এ ঘটনায় দোকানপাটে লুটপাট, ভবনে অগ্নিসংযোগ এবং লিমোজ শহরের ঊনবিংশ শতাব্দীর একটি টাউন হল পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে।
ফ্রান্সের নঁতে শহরে বিক্ষোভে অংশ নেওয়া ২১ বছর বয়সী কোয়েন্তাঁ লেভিলু বলেন, জীবনযাত্রার ব্যয় এখন তার কাছে ভীতিকর হয়ে উঠেছে। ন্যূনতম মজুরির কাছাকাছি আয় করা মানুষের জন্য খাবার, জ্বালানি ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বহন করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ সপ্তাহান্তে দেওয়া এক ভাষণে জীবনযাত্রার ব্যয় ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিতে ক্ষুব্ধ বিক্ষোভকারীদের ‘ন্যায্য দাবি’ স্বীকার করেন। তবে সহিংসতা ও লুটপাটে জড়িত ব্যক্তিদের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের দাবিকে এক করে না দেখার আহ্বান জানান তিনি।
ইতালির উত্তরাঞ্চলীয় শহর মিলানেও জীবনযাত্রার ব্যয় ও সরকারি সেবার মান নিয়ে বিক্ষোভ হয়েছে। রোববার বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়। এ সময় পাথর নিক্ষেপ এবং দোকানপাটে লুটপাটের ঘটনা ঘটে।
সিসিলি দ্বীপের দক্ষিণ উপকূলের জেলায় কৃষকেরা জ্বালানির বাড়তি ব্যয়ে কৃষিকাজ চালানো কঠিন হয়ে পড়ার কথা জানিয়েছেন। তাদের একটি ব্যানারে লেখা ছিল, ‘আমরা জমি চাষ করি, ঋণের ফসল ঘরে তুলি।’
কৃষক প্রতিনিধি আর্কাঞ্জেলো গাম্বিনো বলেন, জ্বালানির দাম দ্বিগুণের বেশি বেড়েছে, ফলে তাদের কার্যক্রম কার্যত থমকে গেছে। ইতালির দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় ট্রাকচালক, কৃষক ও ইস্পাতশ্রমিকদের অবরোধে পরিবহনব্যবস্থা ব্যাহত হচ্ছে। এতে কোথাও কোথাও জ্বালানির ঘাটতি দেখা দিয়েছে এবং সুপারমার্কেটে পণ্য সরবরাহ নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
পর্তুগালের রাজধানী লিসবনে শনিবার কয়েক হাজার নয়, বরং কয়েক দশ হাজার মানুষ কম মজুরি, আবাসন ব্যয় ও জীবনযাত্রার খরচ বৃদ্ধির প্রতিবাদে মিছিল করেন। এতে দেশটির মধ্য-ডানপন্থি সরকারের ওপর চাপ বেড়েছে।
স্পেনেও আবাসনসংকট ও বাড়িভাড়া বৃদ্ধির প্রতিবাদে দেশজুড়ে বিক্ষোভ হয়েছে। ৮৭ বছর বয়সী এক নারীকে তার বাড়ি থেকে উচ্ছেদের ঘটনা এ বিক্ষোভে নতুন মাত্রা যোগ করে। এর পরিপ্রেক্ষিতে আগামী মাসে আগাম নির্বাচন আয়োজনের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। বেলজিয়ামেও বিক্ষোভ হয়েছে। আর আলবেনিয়ায় দুর্নীতির অভিযোগ, কর্মসংস্থানের অভাব ও শিক্ষার মান নিয়ে অসন্তোষ থেকে বড় সমাবেশ হয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এসব বিক্ষোভের পেছনে রয়েছে জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে ইউরোপজুড়ে বাড়তে থাকা উদ্বেগ। এ পরিস্থিতি মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি মানুষের আস্থা দুর্বল করছে এবং বিকল্প রাজনৈতিক শক্তিগুলোর জন্য সুযোগ তৈরি করছে।
সায়েন্সেস পো বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানী জিল ইভালদি বলেন, ক্রয়ক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ ইউরোপজুড়ে জনতুষ্টিবাদী রাজনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে। কট্টর ডান ও কট্টর বাম- উভয় পক্ষের রাজনীতিকেরাই এখন জ্বালানির দাম কমানোর উপায় হিসেবে রাশিয়ার সঙ্গে আবার জ্বালানি বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্থাপনের পক্ষে কথা বলছেন। এতে ইউক্রেনকে সমর্থন দেওয়ার বিষয়ে ইউরোপের প্রচলিত রাজনৈতিক ঐকমত্য চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে।
আগামী বছরের এপ্রিলে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হওয়ার কথা। তার আগে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি নির্বাচনী রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠেছে। বাজেট ঘাটতি বৃদ্ধি এবং বন্ডবাজারের চাপ সামলাতে মাখোঁর সরকারকে কঠিন পরিস্থিতির মুখে পড়তে হচ্ছে।
কট্টর ডানপন্থি ন্যাশনাল র্যালির নেতা মেরিন লে পেন এবং কট্টর বামপন্থী নেতা জ্যঁ-লুক মেলঁশোঁ- দুজনই নির্বাচনী প্রচারে জ্বালানির দামকে গুরুত্ব দিচ্ছেন।
ইভালদির মতে, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির বিষয়টি লে পেনের রাজনৈতিক অবস্থানকে শক্তিশালী করছে। ইরান যুদ্ধ শুরুর পর এলাবে নামের একটি প্রতিষ্ঠানের জনমত জরিপে লে পেনের জনপ্রিয়তা বেড়েছে, আর মাখোঁর জনপ্রিয়তা কমেছে।
জ্বালানির ওপর মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) উল্লেখযোগ্যভাবে কমানোর প্রস্তাব দিয়ে জনসমর্থন পেয়েছেন লে পেন। বিশ্লেষকদের মতে, গ্রাম ও শহরতলির যেসব এলাকায় যাতায়াতের জন্য ব্যক্তিগত গাড়ির ওপর নির্ভরতা বেশি, সেখানে তার এ প্রস্তাব বিশেষভাবে গ্রহণযোগ্যতা পাচ্ছে।
জার্মানিতে কট্টর ডানপন্থি অল্টারনেটিভ ফর জার্মানি (এএফডি) দল জাতীয় জনমত জরিপে এগিয়ে রয়েছে। সেপ্টেম্বরে কয়েকটি রাজ্যে নির্বাচনে ভালো ফল করার পর দলটির অবস্থান আরও শক্ত হয়েছে। চলতি মাসে প্রকাশিত এক জরিপে দেখা গেছে, টানা পঞ্চম বছরের মতো জীবনযাত্রার ব্যয় জার্মানদের প্রধান উদ্বেগের বিষয়।
ভোরের আকাশ/আ.র