চীনের বিরুদ্ধে তথ্য চুরির অভিযোগ যুক্তরাষ্ট্রের

যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন টার্গেট দেশের উপকূলের কাছাকাছি সামরিক যোগাযোগের ওপর নজরদারি চালাতে নিজেদের জাহাজে গোপন সরঞ্জাম ব্যবহার করছে চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত শিপিং জায়ান্ট কসকো।
ট্রাম্প প্রশাসনের দুই জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা সম্প্রতি এই অভিযোগ তুলেছেন। তবে এই বিষয়ে কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি কসকো। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের এই দাবি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে ওয়াশিংটনে চীনা দূতাবাস।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে মার্কিন কর্মকর্তারা জানান, বেইজিংয়ের সঙ্গে কসকোর বহু দশকের পুরোনো গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের অংশীদারত্ব রয়েছে। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে চীন ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা ও এশিয়ায় চলাচলকারী জাহাজ এবং উড়োজাহাজ থেকে বার্তা ও সংকেত সংগ্রহ করে।
এক কর্মকর্তা বলেন, ‘জাহাজে থাকা এই সর্বাধুনিক সরঞ্জামগুলোর মূল উদ্দেশ্য, চীনের জন্য সামরিক যোগাযোগ প্রযুক্তি ও এনক্রিপশন সংক্রান্ত অগ্রগতির তথ্য সংগ্রহ করা। এর মাধ্যমে বাণিজ্য ও সামরিক চলাচলের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে নজরদারি চালাচ্ছে বেইজিং।’
চলতি মাসের শেষের দিকে ওয়াশিংটনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের এক শীর্ষ বৈঠকে হওয়ার কথা রয়েছে। সেখানে একাধিক সংবেদনশীল নিরাপত্তা ও বাণিজ্য ইস্যুতে তাদের মধ্যে আলোচনার সম্ভাবনা আছে।
কসকোর জাহাজগুলোতে ঠিক কী ধরনের সরঞ্জাম ব্যবহার করা হচ্ছে, কর্মকর্তা দুজন তার বিস্তারিত বিবরণ দেননি। তবে তারা জানান, এগুলো দৈনন্দিন যোগাযোগের প্রযুক্তি নয়, বরং অত্যন্ত উন্নত মানের সিগন্যাল ইন্টেলিজেন্স কালেকশন প্ল্যাটফর্ম।
তারা জানান, বিভিন্ন দেশের সামরিক লক্ষ্যবস্তুর সামুদ্রিক রেকি বা পর্যবেক্ষণ এবং পূর্ব সতর্ক সংকেত পেতে ও আঞ্চলিক বিরোধে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করতে এসব তথ্য ব্যবহার করছে বেইজিং।
ওয়াশিংটনে চীনা দূতাবাসের মুখপাত্র লিউ চ্যাং বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেন, ‘চীনা সরকার কখনই কোনো প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তিকে স্থানীয় আইন লঙ্ঘন করে কোনো উপাত্ত, তথ্য বা গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করার জন্য বলবে না। এই অভিযোগের বিরোধিতা করে তিনি বলেন, তথাকথিত গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের কাল্পনিক গল্প সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।’
২০২৫ সালের এপ্রিলে ইউএস নেভাল ওয়ার কলেজের প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, চীন সম্ভবত তার সামরিক বাহিনীর (পিএলএ) গোয়েন্দা তথ্য ও পর্যবেক্ষণ কার্যক্রমের জন্য দেশের মৎস্য শিকারি ও বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে ব্যবহার করছে।
পেন্টাগন ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে কসকোকে চীনের সামরিক বাহিনীর সঙ্গে সম্পৃক্ত কোম্পানির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে। এর ফলে কোম্পানির ভাবমূর্তির যেমন ব্যাপক ক্ষতি হয়, তেমনি মার্কিন সরকারের কেনাকাটায় তাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আসে। তবে এতে আনুষ্ঠানিক কোনো অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হয়নি।
চীনের আইন অনুযায়ী, দেশের প্রতিটি প্রতিষ্ঠান সরকারের গোয়েন্দা কাজে সহায়তা করতে বাধ্য। তা সত্ত্বেও কসকো মার্কিন বন্দরে ভিড় করা বিশ্বের অন্যতম প্রধান শিপিং কোম্পানি হিসেবে বহাল রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন বন্দরে কনটেইনার জাহাজের টার্মিনাল সেবায় তাদের একাধিক যৌথ উদ্যোগ (জয়েন্ট ভেঞ্চার) রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের স্থবির হয়ে পড়া জাহাজ নির্মাণ ও সামুদ্রিক শিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করতে ট্রাম্প প্রশাসন গত বছর কসকোসহ চীনা শিপিং কোম্পানিগুলোর ওপর শত শত কোটি ডলারের বন্দর ফি আরোপের পরিকল্পনা করেছিল।
তবে গত বছরের অক্টোবরে ট্রাম্প ও শি জিনপিংয়ের মধ্যে এক বছরের জন্য বাণিজ্য যুদ্ধ বিরতির চুক্তি হলে সেই পরিকল্পনা স্থগিত করা হয়। এই চুক্তির মেয়াদ আগামী নভেম্বরে শেষ হবে। ধারণা করা হচ্ছে, চলতি মাসে দুই দেশের শীর্ষ নেতাদের বৈঠকে এই মেয়াদ বাড়ানোর বিষয়টি আলোচনায় আসবে।
জনস হপকিন্স স্কুল অব অ্যাডভান্সড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের চীনা সামুদ্রিক কৌশল বিশেষজ্ঞ আইজ্যাক কার্ডন বলেন, মার্কিন বাণিজ্যের সঙ্গে কসকো গভীরভাবে জড়িয়ে থাকায় এই নিরাপত্তা উদ্বেগের বিষয়ে জোরালো সিদ্ধান্ত নেওয়া মার্কিন সরকারের জন্য কঠিন হবে।
কার্ডন বলেন, ‘আমাদের সরবরাহ শৃঙ্খল (সাপ্লাই চেইন) এবং পরিবহন নেটওয়ার্ক থেকে কসকোকে বাদ দেওয়া মার্কিন বাণিজ্য ব্যবস্থার জন্য জীবনঘাতী অস্ত্রোপচারের মতো ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।’
ভোরের আকাশ/এনএস