শিরোনাম
বিদেশি সহায়তা নয়, বাংলাদেশ এখন নিজের পায়ে দাঁড়াতে চায়: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীশ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণে নতুন বোর্ড গঠনের উদ্যোগবাংলাদেশে হামের প্রকোপ ডিপথেরিয়া, হুপিং কাশি ও পোলিও প্রাদুর্ভাবের ‘সতর্কতা’শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বাড়লেও কমেছে শিক্ষার্থীবিদেশি ঋণ কমেছে ৪২.৩৪%, ছয় উন্নয়ন সহযোগীর প্রতিশ্রুতি নেইকক্সবাজারে আগুন: ডিএনএ পরীক্ষায় নিহত ১০ জনের পরিচয় শনাক্ত, এখনো নিখোঁজ ১অনলাইন টিকিটের কালোবাজারি নিয়ন্ত্রণ কঠিন: রেলমন্ত্রীনিপ্পন ও সাসাকাওয়া পিস ফাউন্ডেশনের নৈশভোজে যোগ দিলেন প্রধানমন্ত্রীবিদেশি সহায়তা নয়, বাংলাদেশ এখন নিজের পায়ে দাঁড়াতে চায়: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীশ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণে নতুন বোর্ড গঠনের উদ্যোগবাংলাদেশে হামের প্রকোপ ডিপথেরিয়া, হুপিং কাশি ও পোলিও প্রাদুর্ভাবের ‘সতর্কতা’শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বাড়লেও কমেছে শিক্ষার্থীবিদেশি ঋণ কমেছে ৪২.৩৪%, ছয় উন্নয়ন সহযোগীর প্রতিশ্রুতি নেইকক্সবাজারে আগুন: ডিএনএ পরীক্ষায় নিহত ১০ জনের পরিচয় শনাক্ত, এখনো নিখোঁজ ১অনলাইন টিকিটের কালোবাজারি নিয়ন্ত্রণ কঠিন: রেলমন্ত্রীনিপ্পন ও সাসাকাওয়া পিস ফাউন্ডেশনের নৈশভোজে যোগ দিলেন প্রধানমন্ত্রী

মধ্যপ্রাচ্যে তেল-গ্যাসের আধিপত্যের রহস্য

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশ : ১৬ এপ্রিল ২০২৬, ১২:১২ অপরাহ্ন

শেয়ার করুন:
ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত

মধ্যপ্রাচ্যের পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলো বিপুল তেল ও গ্যাসসম্পদের অধিকারী। এই সম্পদ যেমন তাদের জন্য বড় আশীর্বাদ, তেমনি নানা সংকটের কারণও হয়ে দাঁড়িয়েছে। কোটি কোটি বছর ধরে চলা ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়ার ফলে অঞ্চলটি বিশ্ব জ্বালানির অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠেছে। ফলে ইরান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রকে ঘিরে বর্তমান সংঘাতের মতো বড় কোনো উত্তেজনা তৈরি হলেই বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা দেখা দেয়।

এই অঞ্চলে ৩০টির বেশি তেলসমৃদ্ধ ক্ষেত্র রয়েছে, যেগুলো ‘সুপারজায়ান্ট’ নামে পরিচিত। প্রতিটি ক্ষেত্রেই কমপক্ষে পাঁচ বিলিয়ন ব্যারেল অপরিশোধিত তেলের মজুত আছে। শুধু তাই নয়, এখানকার তেলকূপগুলো থেকে প্রতিদিন যে পরিমাণ তেল উত্তোলন করা হয়, তা উত্তর সাগর বা রাশিয়ার শীর্ষ তেলক্ষেত্রগুলোর তুলনায় দুই থেকে পাঁচ গুণ বেশি।

ভূতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে, শিলাস্তরে থাকা বিশেষ উপাদান এবং হাইড্রোকার্বন উৎপাদন ও সংরক্ষণের অনুকূল পরিবেশ এই অঞ্চলকে তেলসমৃদ্ধ করেছে। এসব উপাদান পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে প্রায় আদর্শ অবস্থায় বিদ্যমান। বিপুল মজুত, সহজ উত্তোলন পদ্ধতি এবং অনুকূল প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যের কারণে বিশ্ব জ্বালানি খাতে এই অঞ্চল এখনো অন্য সবার চেয়ে এগিয়ে, যার কাছাকাছি কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী নেই।

ইতিহাস : বরফযুগের শেষদিকে, অর্থাৎ আজ থেকে প্রায় ১৪ হাজার থেকে ৬ হাজার বছর আগে, বন্যার কারণে পারস্য উপসাগর সৃষ্টি হওয়ার সময় থেকেই মানুষ এ অঞ্চলে হাইড্রোকার্বনের উপস্থিতির সঙ্গে পরিচিত হয়। পারস্য উপসাগরের বহু এলাকায় নদী ও উপত্যকা থেকে প্রাকৃতিকভাবে ক্রুড তেল ও গ্যাসের নিঃসরণ দেখা যেত, যা ছিল একটি স্বাভাবিক ভূতাত্ত্বিক ঘটনা। ঐতিহাসিকভাবে, খ্রিষ্টপূর্ব যুগ থেকেই মানুষ নৌকা পানিরোধী করতে এবং নির্মাণকাজে বিটুমিন ব্যবহার করত, যা মূলত ভারী ধরনের পেট্রোলিয়াম। আধুনিক যুগে তেলের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ সন্ধান পাওয়া যায় ১৯০৮ সালে, পশ্চিম ইরানের একটি সুপরিচিত প্রাকৃতিক তেলক্ষেত্র থেকে।

পরবর্তীতে ১৯৫০ ও ১৯৬০-এর দশকে তেল ও গ্যাস অনুসন্ধান ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেলে বোঝা যায়, বিশ্বের আর কোনো অঞ্চলে এত বিপুল পরিমাণ হাইড্রোকার্বন মজুত নেই। যদিও পরে রাশিয়ার পশ্চিম সাইবেরিয়া এবং সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের পারমিয়ান বেসিনসহ বিভিন্ন অঞ্চলেও বড় তেল ও গ্যাসের মজুত আবিষ্কৃত হয়েছে। তবুও এসব ক্ষেত্রের কোনোটি পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের বিশাল তেল ও গ্যাস মজুত কিংবা উচ্চ উৎপাদন সক্ষমতার সমান নয়। এই কারণেই অঞ্চলটি আজও বিশ্বজুড়ে অনন্য হিসেবে বিবেচিত হয়।

ভূতাত্ত্বিক অবস্থান : পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল এমন একটি স্থানে অবস্থিত যেখানে দুইটি বিশাল টেকটোনিক প্লেট মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এই দুটি প্লেট হলো দক্ষিণ-পূর্বে অ্যারাবিয়ান প্লেট এবং পূর্ব ও উত্তরে ইউরেশীয় প্লেট।

এই সংঘর্ষ প্রায় ৩৫ মিলিয়ন বা সাড়ে তিন কোটি বছর ধরে চলছে। এর ফলে তৈরি হয়েছে এক গতিশীল ভূ-প্রকৃতি। যেখানে ভূ-গর্ভের তীব্র তাপ এবং চাপে শিলাস্তরগুলো দুমড়ে-মুচড়ে গেছে এবং রূপান্তরিত হয়েছে। উপসাগরের দুই তীরের ভূতাত্ত্বিক গঠন একেবারেই ভিন্ন। ইরানের দিকে ১৮০০ কিলোমিটার (১১০০ মাইল) জুড়ে জাগরোস পর্বতমালা যেটি ওমান উপসাগর থেকে তুরস্ক সীমান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত। আল্পাইন-হিমালয় পর্বত ব্যবস্থার অংশ হিসেবে গত ৬০ মিলিয়ন বা ছয় কোটি বছরে ইউরেশিয়ার সঙ্গে আফ্রিকা, আরব ও ভারতের সংঘর্ষের ফলে এই ভাঁজ পড়া ও ফাটলযুক্ত জাগরোস পর্বতমালার সৃষ্টি হয়েছে।

উপসাগরের আরব উপকূলের শিলাগুলোতে এ ধরনের পরিবর্তন বা ভাঙন দেখা যায়নি। এর পরিবর্তে প্লেটগুলোর সংঘর্ষে তৈরি হওয়া প্রবল চাপে ভূ-গর্ভের গভীরে থাকা শক্ত ও কঠিন শিলাস্তর (বেইজমেন্ট রক নামে পরিচিত) বেঁকে গেছে। এর ফলে তৈরি হয়েছে বিশাল গম্বুজের আকৃতির কাঠামো, যা কয়েক ডজন বা শত শত বর্গ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে বিস্তৃত। পারস্য উপসাগরের নিচে রয়েছে একটি অববাহিকা, যেটি জাগরোস পর্বতমালার উত্থানের ফলে ক্ষয়ে যাওয়া পলি দিয়ে ভরাট হয়েছে। এই অববাহিকার গভীর অংশে এমন উচ্চ তাপমাত্রা এবং চাপ ছিল যা তেল ও গ্যাস তৈরির জন্য প্রয়োজন। সংক্ষেপে বলতে গেলে, এই অঞ্চলের ভূতাত্ত্বিক পরিবেশ বড় পরিসরে হাইড্রোকার্বন উৎপাদন এবং সংরক্ষণ করে রাখার জন্য খুবই উপযোগী।

ক্রুড অয়েল বা অপরিশোধিত তেল উৎপাদনকারী শিলা : সামুদ্রিক জীব যেমন-জুওপ্ল্যাঙ্কটন এবং ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটনের জৈব পদার্থ থেকে ক্রুড বা অপরিশোধিত তেল ও গ্যাস তৈরি হয়। এই উপাদানগুলো প্রথমে কাদামাটি সমৃদ্ধ চুনাপাথর এবং অন্যান্য শিলার স্তরে ঘনীভূত হয় এবং পরে উচ্চ তাপমাত্রা ও চাপের সংস্পর্শে আসে।

যখন কোনো শিলায় অন্তত দুই শতাংশ জৈব পদার্থ থাকে, তখন সেটিকে তেল ও গ্যাস উৎপাদনের জন্য উচ্চমানের সোর্স রক বা শিলার উৎস হিসেবে ধরা হয়। বিশেষ করে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল এই ধরণের শিলাস্তরে সমৃদ্ধ। এর কিছু স্তর অত্যন্ত পুরু এবং জৈব পদার্থে সমৃদ্ধ। আরব উপসাগরীয় উপকূলের হানিফা ও তুওয়াইক শিলাস্তর এর উদাহরণ। যা প্রায় ২০০ থেকে ১৪৫ মিলিয়ন বা ২০ কোটি থেকে ১৪ দশমিক পাঁচ কোটি বছর আগে জুরাসিক যুগে গঠিত হয়েছিল। একইভাবে ইরানের খুজেস্তান শিলাস্তরটি প্রায় ১৪৫ থেকে ৬৬ মিলিয়ন বা ১৪ দশমিক পাঁচ কোটি থেকে ছয় দশমিক ছয় কোটি বছর আগে ক্রিটেসিয়াস যুগে তৈরি হয়। এই শিলাস্তরগুলোতে জৈব পদার্থের পরিমাণ এক শতাংশ থেকে ১৩ শতাংশ পর্যন্ত এমনকি কোথাও কোথাও এর চেয়েও বেশি।

তেল ও গ্যাস মজুতের গঠন : এই অঞ্চলের ভাঁজ পড়া ও ফাটলযুক্ত শিলাস্তর এবং গম্বুজ আকৃতির কাঠামো হাইড্রোকার্বন আটকে রাখা ও সংরক্ষণের জন্য খুবই উপযোগী। জাগরোস পর্বতমালার এই বাঁকগুলো চমৎকার গঠনের জন্য ভূতাত্ত্বিকদের কাছে বেশ পরিচিত, যা স্যাটেলাইট ছবিতেও স্পষ্টভাবে দেখা যায়। এখানে কয়েকশ বিলিয়ন ব্যারেল তেল এবং কয়েক ট্রিলিয়ন ঘনমিটার গ্যাস মজুত রয়েছে। পারস্য উপসাগরের তেল ও গ্যাসক্ষেত্রের মানচিত্রের দিকে তাকালে দেখা যায়, উত্তর-পশ্চিম থেকে দক্ষিণ-পূর্ব দিকে লম্বাটে বা সসেজের মতো দেখতে অনেকগুলো কাঠামো রয়েছে, যা এখানকার বিশাল ও বাঁকানো ভূ-প্রকৃতির প্রতিফলন।

দক্ষিণ ইরান থেকে উত্তর-পূর্ব ইরাক পর্যন্ত বিস্তৃত এই কাঠামোগুলোর মধ্যে বিভিন্ন আকারের শত শত খনি বা রিজার্ভার রয়েছে। আরব প্লেটের বিশাল গম্বুজ আকৃতির কাঠামোতে তেল ও গ্যাসের বিশাল মজুত তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সৌদি আরবের ঘাওয়ার তেলক্ষেত্র, এটি বিশ্বের বৃহত্তম তেলক্ষেত্র। এখান থেকে ৭০ বিলিয়ন ব্যারেলেরও বেশি ক্রুড বা অপরিশোধিত তেল উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। একইভাবে সাউথ পার্স-নর্থ ডোম গ্যাসক্ষেত্র থেকে অন্তত ৪৬ বিলিয়ন ঘনমিটার গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা আছে।

এটা শক্তির দিক থেকে ২০০ বিলিয়ন ব্যারেলেরও বেশি তেলের সমান। এই অঞ্চলের প্রধান রিজার্ভ শিলা হলো চুনাপাথর। এই পাথরের কিছু অংশ প্রাকৃতিকভাবেই দ্রবীভূত হয়ে গেছে, যেটি তেল ও গ্যাসের প্রবাহকে সহজ করে। জাগরোস খনিগুলোতে ভূ-তাত্ত্বিক প্লেটগুলোর সংঘর্ষের ফলে সৃষ্ট ফাটল দিয়ে তেল ও গ্যাস চলাচল করে। সৌদি আরবের ঘাওয়ার তেলক্ষেত্রের আরব-ডি স্তর এবং জাগরোস সমভূমির সামারিটান চুনাপাথরই এ ধরনের উচ্চমানের রিজার্ভ শিলার উদাহরণ। যা শত শত বা এমনকি হাজার হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে আছে। পৃথিবী বা মহাসাগরের আর কোথাও এই স্কেলে ভূতাত্ত্বিক কাঠামো দেখা যায় না যা পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের পেট্রোলিয়াম ভূতত্ত্বকে অনন্য ও অতুলনীয় করে তুলেছে।

ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা : এসব কারণে সম্মিলিত প্রভাবে পৃথিবীর মাত্র তিন শতাংশ ভূ-ভাগের নিচে বিশ্বের প্রায় অর্ধেক তেল এবং ৪০ শতাংশ গ্যাস মজুদ রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থার মতে, এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে উৎপাদন চলার পরেও এই অঞ্চলে আরও বিশাল তেলের ভাণ্ডার আবিষ্কৃত হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে। সংস্থাটির ২০১২ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অ্যারাবিয়ান পেনিনসুলা এবং জাগরোস পর্বতমালায় এর আগে আবিষ্কার হওয়া তেল, গ্যাসের বাইরেও আরো প্রায় ৮৬ বিলিয়ন ব্যারেল তেল এবং নয় দশমিক পাঁচ ট্রিলিয়ন ঘনমিটার গ্যাস থাকতে পারে।

এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রে ২০০০ এবং ২০১০ এর দশকে উদ্ভাবিত হরাইজন্টাল ড্রিলিং এবং ফ্র্যাকচারিং এর মতো প্রযুক্তির মাধ্যমে উৎপাদন আরো বাড়ানো সম্ভব। সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের তেলক্ষেত্রগুলোতে এই পদ্ধতিগুলো পরীক্ষা করা হচ্ছে। তবে এই পদ্ধতিগুলো কতটা সফল হবে সেটি বলার সময় এখনও আসেনি। যদিও গবেষণা বলছে, এর মাধ্যমে উৎপাদন আরো বাড়তে পারে।

ভোরের আকাশ/সু.পা

মধ্যপ্রাচ্যে তেল-গ্যাস

শেয়ার করুন: