শিরোনাম
বিদেশি সহায়তা নয়, বাংলাদেশ এখন নিজের পায়ে দাঁড়াতে চায়: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীশ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণে নতুন বোর্ড গঠনের উদ্যোগবাংলাদেশে হামের প্রকোপ ডিপথেরিয়া, হুপিং কাশি ও পোলিও প্রাদুর্ভাবের ‘সতর্কতা’শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বাড়লেও কমেছে শিক্ষার্থীবিদেশি ঋণ কমেছে ৪২.৩৪%, ছয় উন্নয়ন সহযোগীর প্রতিশ্রুতি নেইকক্সবাজারে আগুন: ডিএনএ পরীক্ষায় নিহত ১০ জনের পরিচয় শনাক্ত, এখনো নিখোঁজ ১অনলাইন টিকিটের কালোবাজারি নিয়ন্ত্রণ কঠিন: রেলমন্ত্রীনিপ্পন ও সাসাকাওয়া পিস ফাউন্ডেশনের নৈশভোজে যোগ দিলেন প্রধানমন্ত্রীবিদেশি সহায়তা নয়, বাংলাদেশ এখন নিজের পায়ে দাঁড়াতে চায়: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীশ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণে নতুন বোর্ড গঠনের উদ্যোগবাংলাদেশে হামের প্রকোপ ডিপথেরিয়া, হুপিং কাশি ও পোলিও প্রাদুর্ভাবের ‘সতর্কতা’শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বাড়লেও কমেছে শিক্ষার্থীবিদেশি ঋণ কমেছে ৪২.৩৪%, ছয় উন্নয়ন সহযোগীর প্রতিশ্রুতি নেইকক্সবাজারে আগুন: ডিএনএ পরীক্ষায় নিহত ১০ জনের পরিচয় শনাক্ত, এখনো নিখোঁজ ১অনলাইন টিকিটের কালোবাজারি নিয়ন্ত্রণ কঠিন: রেলমন্ত্রীনিপ্পন ও সাসাকাওয়া পিস ফাউন্ডেশনের নৈশভোজে যোগ দিলেন প্রধানমন্ত্রী

স্পেনে মুসলিম বিজয়ের ইতিহাস

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশ : ২২ জুলাই ২০২৬, ১০:৩১ অপরাহ্ন

শেয়ার করুন:
ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত

এক নারীর অপমান, এক শাসকের প্রতিশোধ, আর এক সেনাপতির দুঃসাহসী অভিযান- স্পেনে মুসলিম বিজয়ের ইতিহাসকে ঘিরে এমন বহু গল্প প্রচলিত আছে। তবে ইতিহাসের বাস্তবতা কেবল এসব কিংবদন্তিতে সীমাবদ্ধ নয়। এর পেছনে ছিল তৎকালীন ইউরোপের রাজনৈতিক অস্থিরতা, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, সামাজিক অসন্তোষ এবং উত্তর আফ্রিকায় মুসলিম শক্তির উত্থান।

৭১১ খ্রিস্টাব্দে উত্তর আফ্রিকা থেকে জিব্রাল্টার প্রণালি পেরিয়ে মুসলিম বাহিনী আইবেরীয় উপদ্বীপে (বর্তমান স্পেন ও পর্তুগাল) প্রবেশ করে। এই অভিযানের মধ্য দিয়ে ভিসিগথ রাজ্যের পতন ঘটে এবং সূচনা হয় ইতিহাসখ্যাত আন্দালুসের, যা পরবর্তী প্রায় আট শতাব্দী ইউরোপের রাজনীতি, জ্ঞানচর্চা ও সংস্কৃতিতে গভীর প্রভাব ফেলে।

স্পেনে মুসলিমদের এই আগমনকে শুধু একটি সামরিক বিজয় হিসেবে দেখলে পুরো ইতিহাস বোঝা যায় না। এর পেছনে ছিল ভিসিগথ রাজ্যের অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা, রাজনৈতিক বিভক্তি এবং স্থানীয় বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর অসন্তোষ।

ভিসিগথ রাজ্যের অভ্যন্তরীণ সংকট
মুসলিম অভিযানের আগে আইবেরীয় উপদ্বীপ শাসন করছিল জার্মান বংশোদ্ভূত ভিসিগথ রাজবংশ। অষ্টম শতাব্দীর শুরুতে রাজ্যটি গভীর রাজনৈতিক সংকটে পড়ে।

রাজা উইটিজার মৃত্যুর পর রডারিক ক্ষমতায় এলেও তার শাসন উইটিজার সমর্থক ও উত্তরাধিকারীরা মেনে নেয়নি। ফলে রাজদরবারে বিভক্তি সৃষ্টি হয় এবং কেন্দ্রীয় শাসনব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে।

একই সময়ে ইহুদি সম্প্রদায়সহ বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর ওপর ভিসিগথ শাসকদের কিছু কঠোর ও বৈষম্যমূলক নীতির কারণে অসন্তোষ বাড়ছিল। ইতিহাসবিদদের মতে, এই অভ্যন্তরীণ সংকটই মুসলিম বাহিনীর দ্রুত অগ্রযাত্রার অন্যতম কারণ ছিল।

ফ্লোরিন্ডার কাহিনি: ইতিহাস নাকি কিংবদন্তি?
স্পেন বিজয়ের ইতিহাসে সবচেয়ে আলোচিত কাহিনিগুলোর একটি ফ্লোরিন্ডা ও কাউন্ট জুলিয়ানকে ঘিরে।

প্রচলিত বর্ণনা অনুযায়ী, সিউটার শাসক জুলিয়ানের কন্যা ফ্লোরিন্ডাকে রাজা রডারিকের দরবারে পাঠানো হয়েছিল। সেখানে রডারিকের হাতে তিনি অপমানিত হন। এর প্রতিশোধ নিতেই জুলিয়ান মুসলিমদের স্পেন অভিযানে সহায়তা করেন।

তবে আধুনিক ইতিহাসবিদদের বড় অংশ এই ঘটনাকে নিশ্চিত ইতিহাস নয়, বরং একটি জনপ্রিয় কিংবদন্তি হিসেবে দেখেন। এ কাহিনির উল্লেখ পাওয়া যায় মধ্যযুগীয় ইতিহাসবিদ ইবনে আবদুল হাকামের ফুতুহ মিসর ওয়া আল-মাগরিব ওয়া আল-আন্দালুস গ্রন্থে, যা মূল ঘটনার প্রায় দেড় শতাব্দী পরে রচিত।

তবে জুলিয়ান নামে এক প্রভাবশালী ব্যক্তির মুসলিম অভিযানে সহযোগিতার কথা বিভিন্ন ঐতিহাসিক সূত্রে উল্লেখ রয়েছে। তার পরিচয় নিয়েও মতভেদ আছে। কেউ তাকে সিউটার স্থানীয় শাসক বা ভিসিগথদের মিত্র মনে করেন, আবার কেউ তাকে বাইজেন্টাইন প্রশাসনের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তি হিসেবে বিবেচনা করেন।

তারিফ থেকে তারিক বিন জিয়াদ
স্পেনে বড় অভিযানের আগে মুসলিমরা পরিস্থিতি যাচাই করতে একটি ছোট অনুসন্ধানী অভিযান পরিচালনা করে।

৭১০ খ্রিস্টাব্দে তারিফ ইবনে মালিকের নেতৃত্বে একটি দল আইবেরীয় উপকূলে অভিযান চালায়। ধারণা করা হয়, তার নাম থেকেই বর্তমান স্পেনের ‘তারিফা’ শহরের নামকরণ হয়েছে।

এর এক বছর পর উত্তর আফ্রিকার গভর্নর মুসা ইবনে নুসাইরের নির্দেশে সেনাপতি তারিক বিন জিয়াদ মূল অভিযান পরিচালনা করেন। প্রাচীন সূত্রে তার বাহিনীর সংখ্যা ৭ হাজার থেকে ১২ হাজার পর্যন্ত উল্লেখ রয়েছে। বাহিনীর অধিকাংশই ছিল উত্তর আফ্রিকার বারবার মুসলিম যোদ্ধা।

বর্তমান ‘জিব্রাল্টার’ নামটি আরবি ‘জাবালুত তারিক’ অর্থাৎ ‘তারিকের পাহাড়’ থেকে এসেছে বলে ঐতিহাসিকদের মধ্যে প্রচলিত ধারণা রয়েছে।

‘জাহাজ পোড়ানো’র গল্প
তারিক বিন জিয়াদের জাহাজ পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা মুসলিম ইতিহাসের অন্যতম পরিচিত আখ্যান।

প্রচলিত বর্ণনায় বলা হয়, সৈন্যদের পিছু হটার পথ বন্ধ করে তিনি ঘোষণা করেছিলেন- ‘সামনে শত্রু, পেছনে সমুদ্র। এখন বিজয় অথবা মৃত্যু।’

তবে এই ঘটনার ঐতিহাসিক সত্যতা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। আধুনিক অনেক ইতিহাসবিদের মতে, এটি পরবর্তী সময়ে তারিকের দৃঢ় নেতৃত্বের প্রতীক হিসেবে ইতিহাসে যুক্ত হয়েছে।

গুয়াদালেতের যুদ্ধ
৭১১ খ্রিস্টাব্দে গুয়াদালেত নদীর তীরে তারিক বিন জিয়াদের বাহিনীর সঙ্গে রাজা রডারিকের বাহিনীর মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়।

বিভিন্ন সূত্রে যুদ্ধের বিবরণ ভিন্ন হলেও ইতিহাসবিদদের মধ্যে এ বিষয়ে ঐকমত্য রয়েছে যে, এই যুদ্ধে রডারিকের বাহিনী পরাজিত হয় এবং ভিসিগথ রাজ্যের কেন্দ্রীয় শাসনব্যবস্থা দ্রুত ভেঙে পড়ে।

রডারিকের পরিণতি নিয়েও মতভেদ রয়েছে। অধিকাংশ ইতিহাসবিদ মনে করেন, তিনি যুদ্ধেই নিহত হন। তবে তার মরদেহ নিশ্চিতভাবে শনাক্ত করা যায়নি।

এই বিজয়ের পর তারিক বিন জিয়াদ স্পেনের অভ্যন্তরে অগ্রসর হন। পরে মুসা ইবনে নুসাইর নিজেও বড় বাহিনী নিয়ে সেখানে পৌঁছে মুসলিম নিয়ন্ত্রণ আরও বিস্তৃত করেন।

স্থানীয়দের ভূমিকা
মুসলিম বিজয়ের সময় ভিসিগথ রাজ্যের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব মুসলিম বাহিনীর জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে।

ইতিহাসবিদদের মতে, ভিসিগথ শাসনের বিরোধী কিছু স্থানীয় জনগোষ্ঠী মুসলিম বাহিনীকে সহযোগিতা করেছিল। বিশেষ করে ইহুদি সম্প্রদায়ের একটি অংশ নতুন শাসকদের সঙ্গে সমঝোতায় যায় বলে বিভিন্ন সূত্রে উল্লেখ রয়েছে।

তবে এই পরিবর্তন ছিল তৎকালীন রাজনৈতিক বাস্তবতার অংশ, যেখানে বিভিন্ন জনগোষ্ঠী নিজেদের নিরাপত্তা ও স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়েছিল।

আন্দালুসের উত্তরাধিকার
স্পেনে মুসলিম শাসনের ইতিহাস শুধু যুদ্ধের ইতিহাস নয়; এটি জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিক্ষা ও সংস্কৃতিরও ইতিহাস।

পরবর্তী সময়ে আন্দালুস চিকিৎসা, দর্শন, গণিত, স্থাপত্য ও সাহিত্যচর্চার অন্যতম কেন্দ্রে পরিণত হয়। কর্ডোভা, গ্রানাডা ও সেভিলের মতো শহরে গড়ে ওঠে সমৃদ্ধ শিক্ষাকেন্দ্র, গ্রন্থাগার ও জ্ঞানচর্চার পরিবেশ।

আরবি ভাষায় সংরক্ষিত ও অনূদিত বহু জ্ঞান পরবর্তীকালে ইউরোপীয় বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ এবং রেনেসাঁর ভিত্তি গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

মোটকথা, ফ্লোরিন্ডার কাহিনি, কাউন্ট জুলিয়ানের ভূমিকা এবং তারিক বিন জিয়াদের অভিযান সব মিলিয়ে স্পেনে মুসলিম বিজয়ের ইতিহাস রাজনৈতিক, সামরিক ও সামাজিক পরিবর্তনের এক জটিল অধ্যায়।

আরও পড়ুন

চকরিয়ায় সাংবাদিকদের ওপর হামলা মামলার প্রধান অভিযুক্ত নাজিম দুই দিনের রিমান্ডে

৭১১ খ্রিস্টাব্দের এই অভিযান শুধু একটি রাজ্যের পতন ঘটায়নি; ইউরোপের ইতিহাসেও নতুন এক যুগের সূচনা করেছিল। তবে এই ইতিহাস বুঝতে হলে কিংবদন্তি, সমসাময়িক সূত্র এবং আধুনিক গবেষণাকে পৃথকভাবে মূল্যায়ন করা জরুরি।

তথ্যসূত্র: ইবনে আবদুল হাকাম (ফুতুহ মিসর ওয়া আল-মাগরিব ওয়া আল-আন্দালুস), হিউ কেনেডি (মুসলিম স্পেন অ্যান্ড পর্তুগাল), রজার কলিন্স (দ্য আরব কনকোয়েস্ট অব স্পেন), ফিলিপ কে. হিট্টি (হিস্ট্রি অব দ্য আরবস)

ভোরের আকাশ/এনএস

মুসলিম বিজয়

শেয়ার করুন: