চীনা কোম্পানির সঙ্গে ৭ বিলিয়ন ডলারের চুক্তি বাতিল করল ওরাকল

ট্রাম্প প্রশাসনের তীব্র কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক চাপের মুখে চীনা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান টেনসেন্টের সঙ্গে স্বাক্ষরিত ৭ বিলিয়ন ডলারের একটি বিশাল এআই চিপ লিজ চুক্তি বাতিল করেছে আমেরিকান ক্লাউড জায়ান্ট ওরাকল।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতে দুই পরাশক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মধ্যেই এই পদক্ষেপ সামনে এলো।
রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ সমর্থক ও ধনকুবের ল্যারি এলিসনের নেতৃত্বাধীন ওরাকল দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় নিজস্ব ডেটা সেন্টারের মাধ্যমে চীনা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান টেনসেন্টকে প্রায় ১ লাখ উন্নত এআই চিপ ব্যবহারের সুযোগ দিতে পাঁচ বছর মেয়াদী এই চুক্তিটি করেছিল।
সেপ্টেম্বরে প্রথম প্রকাশিত এই চুক্তিটি ছিল এশিয়ার বাইরে ক্লাউড সার্ভার ব্যবহারের ক্ষেত্রে টেনসেন্টের সবচেয়ে বড় বিদেশি লিজ চুক্তি। যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞার কারণে যে আধুনিক চিপগুলো সরাসরি চীনে আমদানি করা নিষিদ্ধ, এই চুক্তির ফলে টেনসেন্ট বিদেশের ডেটা সেন্টারে সেগুলো ব্যবহারের সুযোগ পাচ্ছিল।
ঘটনাটির সঙ্গে পরিচিত দুটি পৃথক সূত্রের বরাত দিয়ে ফিন্যানসিয়াল টাইমস জানিয়েছে, মার্কিন সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা ওরাকলের সঙ্গে যোগাযোগ করে টেনসেন্টের সঙ্গে এই চুক্তির নিরাপত্তার ঝুঁকি ও ভূ-রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া নিয়ে চরম উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
একই সময়ে চীনের অভ্যন্তরেও টেনসেন্ট চাপের মুখে পড়ে। দক্ষিণ চীনের গুয়াংডং প্রদেশের শীর্ষ সরকারি কর্মকর্তারা টেনসেন্টের সদর দপ্তরে গিয়ে প্রতিষ্ঠানটিকে মার্কিন চিপের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে চীনা অভ্যন্তরীণ চিপ শিল্পের প্রসারে সহায়তা করার নির্দেশনা দেন।
দ্বিমুখী এই চরম চাপের মুখেই শেষ পর্যন্ত উভয় পক্ষ চুক্তিটি বাতিল করতে বাধ্য হয়।
চুক্তি বাতিলের বিষয়ে ওরাকল, টেনসেন্ট কিংবা হোয়াইট হাউস—কোনো পক্ষই তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।
চীনে তৈরি চিপগুলো এআই মডেল তৈরির মতো জটিল কাজের উপযোগী না হওয়ায় এবং ওয়াশিংটনের কড়া রফতানি বিধিনিষেধের কারণে বাইটড্যান্স (ByteDance), আলিবাবা (Alibaba) এবং টেনসেন্টের মতো শীর্ষ চীনা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াকে ডেটা সেন্টারের কেন্দ্র হিসেবে বেছে নিচ্ছে। এর মাধ্যমে তারা এনভিডিয়ার (Nvidia) সাম্প্রতিক প্রযুক্তির প্রসেসর ব্যবহার করে নিজেদের এআই মডেল উন্নত করছিল।
যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান আইন অনুযায়ী বিদেশের মাটিতে চীনা কোম্পানিকে চিপ ব্যবহারের সুবিধা দেওয়া সম্পূর্ণ অবৈধ না হলেও, মার্কিন ক্লাউড কোম্পানিগুলোর ওপর চীন-সংশ্লিষ্ট ব্যবসা গুটিয়ে নেওয়ার চাপ ক্রমেই বাড়ছে।
সম্প্রতি জানা গেছে, মার্কিন চিপ নির্মাতা এনভিডিয়া তাদের ক্লাউড গ্রাহকদের স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, তাদের মোট ক্লাউড সেবার অন্তত ৫১ শতাংশ অ-চীনা গ্রাহকদের কাছে বিক্রি করতে হবে।
তথ্য অনুযায়ী, মালয়েশিয়াসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে ওরাকলের একাধিক ডেটা সেন্টার রয়েছে, যেখানে তারা বাইটড্যান্সসহ বেশ কিছু চীনা প্রতিষ্ঠানের বড় প্রযুক্তি সরবরাহকারী হিসেবে কাজ করছে।
আমেরিকায় চিপ রফতানির নিষেধাজ্ঞা কঠোর হওয়ার পর থেকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় চীনা এআই কোম্পানিগুলোর সার্ভার চাহিদা বহু গুণ বেড়েছে। এর ফলে সেখানে ক্লাউড ডেটা সেন্টারগুলোর ভাড়ার মেয়াদ, প্রাথমিক আমানত এবং সামগ্রিক মূল্য ব্যাপকভাবে বেড়েছে।
টেনসেন্ট সম্প্রতি তাদের ‘হুনইয়ুয়ান’ (Hunyuan) নামক নতুন এআই মডেলের উন্নয়নে অবকাঠামোগত ব্যয় বহুগুণ বাড়িয়েছিল, যা আলিবাবার ‘কোয়েন’ (Qwen) মডেলের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। কিন্তু ওয়াশিংটনের কড়া নজরদারি ও ওরাকলের সঙ্গে ৭ বিলিয়ন ডলারের এই মেগা চুক্তি বাতিল হওয়া চীনা টেক জায়ান্টটির বৈশ্বিক এআই প্রতিযোগিতায় এক বড় আঘাত হিসেবে দেখছেন প্রযুক্তি বিশ্লেষকেরা।
ভোরের আকাশ/ইউএম