বন্যার ঝুঁকি ঠেকাতে নেপালের নতুন উদ্যোগ

হিমালয় অঞ্চলের জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি কমাতে নেপাল সরকার ৪টি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হিমবাহ হ্রদের পানির স্তর নামানোর জন্য ৫ কোটি ডলারের একটি নতুন মেগা প্রকল্প হাতে নিয়েছে। ২০২৬ সালের আগস্ট মাসের ভয়াবহ ফ্লাশ ফ্লাড বা আকস্মিক বন্যার ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার অংশ হিসেবে এই বিশেষ উদ্যোগটি নেওয়া হয়েছে
গত আগস্টে একটি হিমবাহ ধসে ভূমিধস ও আকস্মিক বন্যার সৃষ্টি হলে নেপাল-চীনের সীমান্তবর্তী এলাকায় ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ হয়। উপত্যকার পর উপত্যকা প্লাবিত হওয়ার ঘটনায় এখনও ৫ হাজারের বেশি মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। তাদের সন্ধানে উদ্ধার অভিযান চলছে।
নতুন প্রকল্পটির দায়িত্বে থাকা সরকারি গবেষণা কেন্দ্রের বিশেষজ্ঞ সুবাস তুলাধর বলেন, হ্রদগুলোর প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকি কমানো এবং নিচের জনপদগুলোতে বন্যার আশঙ্কা হ্রাস করাই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য।
তিনি জানান, নিয়ন্ত্রিতভাবে হ্রদের পানি কাছের নদীতে প্রবাহিত করতে খাল নির্মাণ করা হবে। তবে উচ্চ পার্বত্য এলাকায় দীর্ঘ সময় কাজ করতে গিয়ে কর্মীদের স্বাস্থ্যঝুঁকির পাশাপাশি আকস্মিক বন্যার মতো বিপদেরও মোকাবিলা করতে হবে।
কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, মধ্য ও পূর্ব নেপালের থুলাগি, লোয়ার বারুন, লুমডিং সো এবং হংগু-২ হিমবাহ হ্রদকে প্রকল্পের আওতায় নেওয়া হয়েছে। আগামী বছরের জুলাইয়ের মাঝামাঝি পর্যন্ত চলা অর্থবছরের মধ্যেই এসব হ্রদের নকশা প্রণয়ন ও বিস্তারিত সমীক্ষা শুরু হবে।
সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৪ হাজার ৫০ মিটার থেকে ৫ হাজার ৪৮৩ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত এই হ্রদগুলো নেপালের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হিমবাহ হ্রদগুলোর মধ্যে রয়েছে। জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) ও আন্তর্জাতিক সমন্বিত পর্বত উন্নয়ন কেন্দ্র (আইসিমড) ২০২০ সালের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছিল।
প্রকল্পটির সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৫ কোটি ডলার। গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ড, ইউএনডিপি ও নেপাল সরকার যৌথভাবে এর অর্থায়ন করবে। নেপালের সেন্টার ফর হাইড্রোলজি অ্যান্ড ওয়াটার রিসোর্সেস রিসার্চের কর্মকর্তা তুলাধর বলেন, প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা নেপালের রয়েছে।
প্রকল্পের আওতায় হ্রদের পানির গতিবিধি পর্যবেক্ষণে সেন্সর স্থাপন, বন্যার পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ ব্যবস্থা চালু এবং নিচু এলাকার জনগোষ্ঠীর দুর্যোগ মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগও নেওয়া হবে।
এর আগে একই ধরনের উদ্যোগ নিয়েছিল নেপাল। ২০০০ সালে মধ্য হিমালয়ের তশো রোলপা হিমবাহ হ্রদের পানির স্তর প্রায় ৩ মিটার কমানো হয়। প্রায় এক দশক আগে এভারেস্টের কাছাকাছি ইমজা হ্রদের পানির স্তরও কমানো হয়েছিল।
গত মাসে জাতিসংঘে দেওয়া এক বক্তব্যে নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ সাম্প্রতিক দুর্যোগকে বিশ্বের জন্য একটি সতর্কবার্তা হিসেবে তুলে ধরেন। তিনি জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের কথা উল্লেখ করে বলেন, হিমবাহ সরে যাওয়া, পাহাড়ের ঢাল অস্থিতিশীল হয়ে পড়া এবং নদীগুলোর আচরণ ক্রমেই অনিশ্চিত হয়ে ওঠার কারণে নেপালকে বড় মূল্য দিতে হচ্ছে।
গত চার দশকে নেপালে প্রায় ২৬টি হিমবাহ হ্রদ-সৃষ্ট আকস্মিক বন্যা বা জিএলওএফের ঘটনা ঘটেছে। চরম আবহাওয়া ও জলবায়ুজনিত দুর্যোগে দেশটিতে বছরে গড়ে ৩০০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু হয় এবং ব্যাপক সম্পদের ক্ষতি হয়।
সর্বশেষ বন্যায় দেশটির প্রায় এক ডজন জলবিদ্যুৎকেন্দ্র, সড়ক, সেতু, কৃষিজমি ও জনবসতি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সরকারি কর্মকর্তাদের মতে, দুর্যোগের পর প্রাথমিক পুনরুদ্ধার কার্যক্রম চালাতেই নেপালের প্রায় ৫০০ কোটি ডলার প্রয়োজন হতে পারে।
ভোরের আকাশ/আ.র