ট্রাম্পের চাপ ও সামরিক ব্যর্থতায় রাজনৈতিক চাপে নেতানিয়াহু

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে সামরিক অভিযান শুরুর আগে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু আশা প্রকাশ করেছিলেন যে, তিনি ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের যৌথ সামরিক উদ্যোগ ইরানের ইসলামি প্রজাতন্ত্রী সরকারের পতন ঘটাবে। একই সঙ্গে তিনি মনে করেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েল জোটের অন্যতম স্থপতি হিসেবে আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে তার রাজনৈতিক অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে।
কিন্তু বাস্তবে পরিস্থিতি নেতানিয়াহুর প্রত্যাশা অনুযায়ী এগোয়নি। ইরানে সরকার পরিবর্তন হয়নি, বরং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দ্রুত এই সংঘাত থেকে বেরিয়ে আসতে আগ্রহী হয়েছেন। অন্যদিকে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) ইরান থেকে কার্যত পিছু হটে লেবাননে তাদের সামরিক অভিযান সীমিত করতে বাধ্য হয়েছে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প লেবাননে আইডিএফের অভিযানের পক্ষে নন; অন্যদিকে নেতানিয়াহু চান, লেবাননে আইডিএফের অভিযান অব্যাহত থাকুক। এই ইস্যুতে একাধিকবার দ্বন্দ্ব হয়েছে দু’জনের মধ্যে এবং ট্রাম্প নেতানিয়াহুকে রূঢ় ভাষায় গালাগালও করেছেন।
নেতানিয়াহু অবশ্য ‘বন্ধু’ ট্রাম্পের উদ্দেশে পাল্টা কোনো নেতিবাচক কথা বলেননি। ইসরায়েলের অন্যান্য কর্মকর্তারও নিজেদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মিত্র যুক্তরাষ্ট্র কিংবা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সম্পর্কে কোনো মন্তব্য করার ক্ষেত্রে যথেষ্ট সতর্কতা অবলম্বন করছেন। কারণ, যুক্তরাষ্ট্র সমালোচনা পছন্দ করে না।
তবে ব্যক্তিগত আলাপ-আলোচনায় তাদের হতাশা পুরোপুরি স্পষ্ট ধরা পড়ছে। বিশেষ করে ‘ইসলামাবাদ মেমোর্যান্ডম অব আন্ডারস্ট্যান্ডিং’ নামে যে সমঝোতা চুক্তিটি আগামী ১৯ জুন স্বাক্ষর করতে চলেছে যুক্তরাষ্ট্র, সেটিকে ইসরায়েলের জন্য ‘ভয়ঙ্কর’ বলে মনে করছে নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জোট সরকার। জোটের শরিক একটি দলের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা রয়টার্সকে এ প্রসঙ্গে বলেন, “প্রস্তাবিত এই চুক্তিটি যে ইসরায়েলের জন্য ভয়ঙ্কর, তা নিয়ে প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে ইসরায়েলের সেনাপ্রধান— কারোরই দ্বিমত নেই।”
নেতানিয়াহুর উদ্বেগের একটি বড় কারণ লেবাননভিত্তিক সশস্ত্রগোষ্ঠী হিজবুল্লা। তিনি ভেবেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও আইডিএফের সামরিক অভিযানে ইরানের ইসলামি প্রজাতন্ত্রী সরকার এবং লেবাননে ইরানের সমর্থনপুষ্ট গোষ্ঠী হিজবুল্লা— উভয়েরই পতন ঘটবে। কারণ উভয়েই ইসরায়েলের অস্তিত্বের জন্য হুমকি।
কিন্তু এত সংঘাত-রক্তপাত সত্ত্বেও ইসরানের ইসলামি সরকার ও হিজবুল্লার পতনের কোনো লক্ষণ দূর-দূরান্ত পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে না। উপরন্তু ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে সমঝোতার পথে হাঁটছেন এবং লেবাননে হামলা বন্ধের জন্য নেতানিয়াহুকে কঠোরভাবে নির্দেশ দিয়েছেন। সেই নির্দেশ অমান্য করে লেবানেন অভিযান অব্যাহত রাখায় চলতি মাসের শুরুর দিকে নেতানিয়াহুকে গালাগালি ও তীব্র ভর্ৎসনাও করেছেন তিনি।
ট্রাম্পের গালাগাল শোনার পর কয়েক দিন লেবাননে হামলা বন্ধ রাখেন নেতানিয়াহু, কিন্তু পরের সপ্তাহ থেকে ফের হামলা শুরুর নির্দেশ দেন।
গতকাল সোমবার ইসরায়েলের রাজধানী জেরুজালেমে এক সংবাদ সম্মেলনে নেতানিয়াহুকে ট্রাম্পের সঙ্গে সাম্প্রতিক টানাপোড়েন নিয়ে প্রশ্ন করেছিলেন এক সাংবাদিক। জবাবে নেতানিয়াহু বলেছেন, “তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট, আর আমি ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী। অনেক সময় আমাদের মতের মিল হয়, আবার অনেক সময় হয়ও না। তবে ইসরায়েলের নিরাপত্তার দায়িত্ব আমার।”
ইসরায়েরের সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত এবং বর্তমানে মার্কিন থিঙ্ক ট্যাংক সংস্থা আটলান্টিক কাউন্সিলের কর্মকর্তা ড্যান শাপিরো নেতানিয়াহুর এই বক্তব্য সম্পর্কে রয়টার্সকে বলেন, “এটি হলো স্বার্থগত মতপার্থক্যের একটি বেশ স্পষ্ট মুহূর্ত। নেতানিয়াহু (চুক্তিটির) প্রকাশ্যে বিরোধিতা না করার চেষ্টা করবেন, যাতে ট্রাম্পের সঙ্গে কোনো বিবাদে না জড়াতে হয়; কিন্তু তিনি ইঙ্গিত দেবেন যে ইসরায়েল এটি মানতে বাধ্য নয় এবং ইসরায়েল তার অধিকার সংরক্ষণ করে।”
“তাছাড়া সামনেই ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নির্বাচন এবং নেতানিয়াহুর প্রতি ভোটারদের সমর্থন তলানিতে ঠেকেছে। ফলে বেশ চ্যালেঞ্জিং একটি সময় পার করছেন নেতানিয়াহু।” সূত্র : রয়টার্স
ভোরের আকাশ/সু.পা