জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ইরান-পাকিস্তান সীমান্তে তেল পাচার চক্র সক্রিয়

ইরান ও ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের চলমান উত্তেজনা এবং জ্বালানি বাজারে অস্থিরতার প্রভাবে পাকিস্তান সীমান্তে তেল পাচার নতুন মাত্রা পেয়েছে। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মোটরসাইকেলে পেট্রোল ও ডিজেল পরিবহন করছে সংঘবদ্ধ চোরাচালান চক্র। ইরান সীমান্ত দিয়ে পাচার হয়ে আসা ট্রাক থেকে জ্বালানি সংগ্রহ করে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ করা হচ্ছে।
বুধবার (১৮ জুন) প্রকাশিত বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান থেকে পাকিস্তানে জ্বালানি পাচারের নেটওয়ার্ক কয়েক দশক ধরে সক্রিয় থাকলেও সাম্প্রতিক মাসগুলোতে তা আরও বিস্তৃত হয়েছে। বিশেষ করে ইরান-ইসরায়েল সংঘাত এবং আঞ্চলিক উত্তেজনার কারণে জ্বালানির সরবরাহ ও মূল্য পরিস্থিতিতে পরিবর্তন আসায় পাকিস্তানে ইরানি পেট্রোল ও ডিজেলের চাহিদা বেড়েছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহনে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বেড়েছে। এর ফলে পাকিস্তানে তুলনামূলক সস্তা ইরানি জ্বালানির প্রতি আগ্রহও বৃদ্ধি পেয়েছে।
বেলুচিস্তানের হাজারো পাচারকারীর মতো ‘মাজার’ নামের এক ব্যক্তি মোটরসাইকেলে করে জ্বালানি পরিবহন করেন। তিনি প্রায় ৩৫০ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে সিন্ধু প্রদেশে তেল সরবরাহ করেন। পথে তাকে বিশ্বের অন্যতম উষ্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলের মধ্য দিয়ে যাতায়াত করতে হয়।
প্রচণ্ড গরমে বেলুচিস্তানের তাপমাত্রা অনেক সময় ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছে যায়। এতে জ্বালানি বহনের ক্যানগুলো ফুলে ওঠে এবং নরম হয়ে যায়। ফলে যেকোনো সময় বিস্ফোরণ বা অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি তৈরি হয়। এমন দুর্ঘটনায় অতীতে অনেক পাচারকারীর প্রাণহানিও ঘটেছে।
শুধু দুর্ঘটনার ঝুঁকিই নয়, তাদের মোকাবিলা করতে হয় নিরাপত্তাজনিত হুমকিও। বেলুচিস্তানের বিভিন্ন এলাকায় পাকিস্তানি বাহিনী ও বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে প্রায়ই সংঘর্ষ ঘটে। সেই ঝুঁকিপূর্ণ পথ দিয়েই পাচারকারীদের চলাচল করতে হয়।
মাজার বিবিসিকে বলেন, “আমাদের কাছে অন্য কোনো বিকল্প নেই। প্রচণ্ড গরম, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এবং কর্মসংস্থানের অভাবের কারণে আমরা এই কাজ করতে বাধ্য হচ্ছি। দিন-রাত সড়কেই কেটে যায়।”
সীমান্ত দিয়ে পাচার হওয়া জ্বালানির সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান না থাকলেও ২০২৪ সালে নিক্কেই এশিয়া পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থার একটি ফাঁস হওয়া প্রতিবেদনের বরাতে জানায়, প্রতি বছর ইরান থেকে পাকিস্তানে প্রায় ১ বিলিয়ন ডলারের জ্বালানি পাচার হয়।
পাকিস্তানের আইনে জ্বালানি পাচার একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এ অপরাধে জরিমানা ও কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। তবে স্থানীয় ব্যবসায়ী নেতারা বলছেন, কর্মসংস্থানের সংকটে ভোগা বেলুচিস্তানের অনেক মানুষের কাছে এটি জীবিকা নির্বাহের অন্যতম উপায় হয়ে উঠেছে।
কোয়েটা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক সভাপতি ফিদা হোসেন দস্তি বলেন, “এ অঞ্চলে কাজের সুযোগ খুবই সীমিত। অনেক শিক্ষিত তরুণও শেষ পর্যন্ত এই ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হতে বাধ্য হচ্ছেন।”
বিশ্লেষকদের মতে, ইরান-পাকিস্তান সীমান্তজুড়ে গড়ে ওঠা এই পাচারচক্রের পেছনে জটিল ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা কাজ করছে। একদিকে পাকিস্তান ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা করছে, অন্যদিকে প্রায় ৯০০ কিলোমিটার দীর্ঘ দুর্গম সীমান্ত পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন।
বিবিসির প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, তেল পাচারের জন্য ইরান দীর্ঘদিন ধরে অপরাধী চক্রগুলোকে দায়ী করে আসছে। তবে ‘গ্লোবাল ইনিশিয়েটিভ অ্যাগেইনস্ট ট্রান্সন্যাশনাল অর্গানাইজড ক্রাইম’-এর বিশ্লেষক প্যাডি গিনের মতে, বড় কিছু পাচারচক্রের সঙ্গে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি)-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের যোগাযোগ থাকতে পারে।
তাদের উদ্দেশ্য হতে পারে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে জ্বালানি বাণিজ্য পরিচালনা করা। এ বিষয়ে ইরান সরকারের প্রতিক্রিয়া জানতে চাওয়া হলেও বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কোনো আনুষ্ঠানিক জবাব পাওয়া যায়নি। সূত্র: বিবিসি
ভোরের আকাশ/সু.পা