দুবাইয়ে এআইনির্ভর গণপরিবহন, পডে চড়বেন ৬ যাত্রী

সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই যানজট এড়িয়ে দ্রুত ও সহজে যাত্রী পরিবহনের লক্ষ্যে চালকবিহীন বৈদ্যুতিক যানভিত্তিক নতুন গণপরিবহনব্যবস্থার পরীক্ষামূলক কার্যক্রম শুরু করেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তিনির্ভর ‘দুবাই গ্লাইডওয়েজ’ নামের এ ব্যবস্থায় ছোট আকারের পডে একসঙ্গে সর্বোচ্চ ছয়জন যাত্রী চলাচল করতে পারবেন। ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ৫০ কিলোমিটার গতিতে চলতে সক্ষম এসব যান নির্দিষ্ট পথে চলবে এবং যাত্রীদের চাহিদা অনুযায়ী গন্তব্যে পৌঁছে দেবে।
রোববার দুবাইয়ের ব্লু ওয়াটার্স এলাকায় চার সপ্তাহের এ পরীক্ষামূলক কার্যক্রম শুরু করে দুবাইয়ের সড়ক ও পরিবহন কর্তৃপক্ষ (আরটিএ)। প্রচলিত বাস বা অন্যান্য গণপরিবহনের মতো নির্দিষ্ট সময়সূচির পরিবর্তে যাত্রীদের চাহিদা অনুযায়ী পডগুলো পরিচালনার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
পরীক্ষামূলক কার্যক্রমের উদ্বোধন উপলক্ষে আরটিএর মহাপরিচালক ও নির্বাহী পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান মাত্তার আল তাইয়ের একটি চালকবিহীন পডে চড়ে নির্ধারিত পথে পাঁচ মিনিট ভ্রমণ করেন।
কীভাবে চলবে চালকবিহীন পড
গ্লাইডওয়েজ ব্যবস্থায় ছোট আকারের বৈদ্যুতিক যান ব্যবহার করা হবে। এগুলো সরু ও নির্দিষ্ট গাইডওয়ের মাধ্যমে চলাচল করবে। প্রয়োজন অনুযায়ী এসব পথ ভূমির সমতলে অথবা উঁচু কাঠামোর ওপর নির্মাণ করা সম্ভব।
প্রতিটি পডে চার থেকে ছয়জন যাত্রী বসতে পারবেন। একবার ব্যাটারি পূর্ণ চার্জ করলে যানগুলো সর্বোচ্চ ২৫০ কিলোমিটার পর্যন্ত চলতে পারবে। ব্যবস্থাটি দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা পরিচালনার উপযোগী করে তৈরি করা হয়েছে। ফলে নির্দিষ্ট সময়ে বাস বা ট্রেনের জন্য অপেক্ষা না করে যাত্রীরা চাহিদা অনুযায়ী পড ব্যবহারের সুযোগ পাবেন।
পডের ভেতরে শীতাতপনিয়ন্ত্রণের মাত্রা ও বিনোদনব্যবস্থাও যাত্রীরা নিজেদের পছন্দ অনুযায়ী নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন।
চালক ছাড়াই চলাচলের জন্য যানগুলোতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বিভিন্ন ধরনের সেন্সর, রাডার ও ক্যামেরা ব্যবহার করা হয়েছে। প্রতিটি পডে রয়েছে ২০টি উচ্চ রেজল্যুশনের লিডার সেন্সর। এসব সেন্সরের পাশাপাশি রাডার ও ক্যামেরা চারপাশের পরিবেশ পর্যবেক্ষণ করে যান চলাচল নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করবে।
এ ব্যবস্থার আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো, একাধিক পডকে ভার্চ্যুয়ালি সংযুক্ত করে চালানো সম্ভব। এতে একটির পর আরেকটি পডের ব্যবধান এক সেকেন্ডেরও কম রাখা যেতে পারে। কর্তৃপক্ষের আশা, এর মাধ্যমে একই পথে বিপুলসংখ্যক যাত্রী পরিবহন করা সম্ভব হবে।
ঘণ্টায় ২০ হাজারের বেশি যাত্রী পরিবহনের লক্ষ্য
দুবাইয়ের সড়ক ও পরিবহন কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, গ্লাইডওয়েজ ব্যবস্থায় দুই দিক মিলিয়ে ঘণ্টায় ২০ হাজারের বেশি যাত্রী পরিবহন করা সম্ভব হবে। ছোট যান ব্যবহারের সুবিধার সঙ্গে বৃহৎ গণপরিবহনব্যবস্থার যাত্রী বহনের সক্ষমতা যুক্ত করাই এ প্রযুক্তির অন্যতম লক্ষ্য।
ব্যয় সাশ্রয়ের সম্ভাবনার কথাও জানিয়েছে আরটিএ। কর্তৃপক্ষের দাবি, তুলনীয় অন্যান্য পরিবহনব্যবস্থার তুলনায় এ প্রযুক্তির অবকাঠামো নির্মাণ ও স্থাপনের প্রাথমিক মূলধনি ব্যয় সর্বোচ্চ ৯০ শতাংশ এবং পরিচালন ব্যয় সর্বোচ্চ ৭০ শতাংশ পর্যন্ত কম হতে পারে। তবে প্রকৃত ব্যয় নির্ভর করবে পরীক্ষার ফলাফল ও ভবিষ্যৎ বাস্তবায়নের ওপর।
চার সপ্তাহের পরীক্ষায় যাচাই হবে নিরাপত্তা ও কার্যকারিতা
ব্লু ওয়াটার্স এলাকায় চার সপ্তাহ ধরে চলা পরীক্ষায় বাস্তব পরিবেশে চালকবিহীন পডগুলোর কার্যকারিতা যাচাই করা হবে। এ সময় নিরাপত্তা, নির্ভরযোগ্যতা ও যাত্রীদের অভিজ্ঞতার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে।
পরীক্ষার অংশ হিসেবে স্বয়ংক্রিয়ভাবে যান চালানোর প্রযুক্তি, পরিবেশ শনাক্তকারী সেন্সর, যোগাযোগব্যবস্থা ও যান নিয়ন্ত্রণের প্রযুক্তি পরীক্ষা করা হবে। পাশাপাশি যাতায়াতে কত সময় লাগছে, যাত্রীদের জন্য ব্যবস্থাটি কতটা সহজ এবং নির্ধারিত পথে যানগুলো কতটা দক্ষতার সঙ্গে চলতে পারছে, তা-ও মূল্যায়ন করা হবে।
পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে বৃহত্তর পরিসরে ব্যবস্থাটি চালুর উপযোগিতা যাচাই করবে কর্তৃপক্ষ।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে মাত্তার আল তাইয়ের বলেন, পরিবহন খাতের সম্ভাবনাময় উদ্ভাবন ও প্রযুক্তিকে বাস্তবে প্রয়োগ করা এবং দুবাইয়ের নগর পরিবেশে সেগুলো পরীক্ষা ও মূল্যায়ন করাই আরটিএর লক্ষ্য।
পডে ভ্রমণের আগে তিনি গ্লাইডওয়েজের প্রতিষ্ঠাতা ও সহপ্রধান নির্বাহী মার্ক সিগার এবং সহপ্রধান নির্বাহী ও প্রধান প্রযুক্তি কর্মকর্তা ব্লেক বারবারের সঙ্গে এ ব্যবস্থা নিয়ে আয়োজিত উপস্থাপনায় অংশ নেন। এ সময় তিনি নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রও পরিদর্শন করেন। সেখানে নির্দিষ্ট পথে চলাচলকারী যানগুলো কীভাবে পর্যবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণ করা হয় এবং নিরাপদ পরিচালনায় কোন প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়, সে বিষয়ে তাঁকে অবহিত করা হয়।
আরটিএ ও গ্লাইডওয়েজের মধ্যে সহযোগিতা চুক্তির ভিত্তিতে এ পরীক্ষামূলক কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। দুবাইয়ে এ ধরনের প্রথম স্বয়ংক্রিয় গণপরিবহন নেটওয়ার্ক গড়ে তোলাই প্রকল্পটির লক্ষ্য। এতে সহযোগিতা করছে দুবাই হোল্ডিং। প্রতিষ্ঠানটি ব্লু ওয়াটার্স এলাকায় পরীক্ষার পরিবেশ, অবকাঠামো ও পরিচালনব্যবস্থা প্রস্তুত করতে সহায়তা দিচ্ছে।
পরীক্ষা সফল হলে দুবাইয়ের নগর পরিবহনে চালকবিহীন পড নতুন বিকল্প হিসেবে যুক্ত হতে পারে। তবে বৃহত্তর পরিসরে চালুর আগে ব্যবস্থাটির নিরাপত্তা, যাত্রী পরিবহনের সক্ষমতা ও ব্যয় সাশ্রয়ের দাবিগুলো পরীক্ষার ফলাফলে কতটা প্রমাণিত হয়, তা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
সূত্র: খালিজ টাইমস
ভোরের আকাশ/জেআ