হরমুজ প্রণালিতে কি ইরানের প্রভাব কমছে?

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র সাত মাসের সংঘাত অবসানের জন্য মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যেই বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহপথ হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতিতে ধীরে ধীরে পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। এই পরিবর্তন চলমান আলোচনায় ইরানের দর-কষাকষির ক্ষমতার ওপর বড় প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
ট্যাংকার চলাচল পর্যবেক্ষণকারী বিভিন্ন ওয়েবসাইটের সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল ধীরে ধীরে বাড়ছে। জ্বালানি বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্য বলছে, সেপ্টেম্বরে মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান দেশগুলোর অপরিশোধিত তেল রফতানি বেড়ে দৈনিক ১ কোটি ৬৩ লাখ ২৮ হাজার ব্যারেলে পৌঁছেছে। এটি যুদ্ধ শুরুর পর সর্বোচ্চ। একই সময়ে হরমুজ প্রণালি দিয়ে দৈনিক প্রায় ৯৭ লাখ ১৯ হাজার ব্যারেল অপরিশোধিত তেল পরিবহনের পূর্বাভাস পাওয়া গেছে।
যুদ্ধ শুরুর আগে মধ্যপ্রাচ্য থেকে দৈনিক প্রায় ১ কোটি ৯৫ লাখ ১৩ হাজার ব্যারেল অপরিশোধিত তেল রফতানি হতো। অর্থাৎ বর্তমান প্রবাহ প্রাকযুদ্ধ পর্যায়ের ৮০ শতাংশের সামান্য কম। তবে হরমুজ দিয়ে এমন পুনরুদ্ধার ইরানের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। কারণ, প্রণালিটি কার্যত অচল করে দেওয়ার সক্ষমতাকে তেহরান যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ দর-কষাকষির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে আসছে।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হরমুজে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে গেছে- এমন ধারণা করাও ভুল হবে। নিরাপত্তা ঝুঁকি, উচ্চ বীমা ব্যয় এবং বৃহত্তর সংঘাতের অনিশ্চয়তা এখনও বহাল রয়েছে। ফলে ইরানের প্রভাব কমে আসতে পারে, কিন্তু তা পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি।
হরমুজ দিয়ে তেল প্রবাহ বাড়ছে
কেপলারের সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, সেপ্টেম্বরে মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ তেল উৎপাদক দেশগুলোর অপরিশোধিত তেল রফতানি দৈনিক ১ কোটি ৬৩ লাখ ২৮ হাজার ব্যারেলে পৌঁছেছে। ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধ শুরুর পর এটিই সর্বোচ্চ মাসিক প্রবাহ। সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের রফতানি বাড়ার কারণে এই পুনরুদ্ধার হয়েছে।
হরমুজ প্রণালি দিয়ে সেপ্টেম্বরে প্রায় ৯৭ লাখ ১৯ হাজার ব্যারেল অপরিশোধিত তেল যাওয়ার কথা ছিল। সৌদি আরব এই বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। আগস্টে দেশটির রফতানি দৈনিক ২৪ লাখ ৪৬ হাজার ব্যারেলে নেমে গেলেও সেপ্টেম্বরে তা বেড়ে প্রায় ৫৪ লাখ ব্যারেলে পৌঁছানোর পথে ছিল।
তবে এসব পরিসংখ্যান এখনও যুদ্ধপূর্ব অবস্থায় ফেরেনি। মধ্যপ্রাচ্যের মোট অপরিশোধিত তেল রফতানি ফেব্রুয়ারির তুলনায় দৈনিক প্রায় ৩২ লাখ ব্যারেল কম রয়েছে। পাশাপাশি যেসব জাহাজ তাদের ট্র্যাকিং ব্যবস্থা বন্ধ রেখে চলাচল করছে, সেগুলো হিসাবের বাইরে থাকায় প্রকৃত জাহাজ চলাচল আরও বেশি হতে পারে।
যুদ্ধের আগে প্রতিদিন আনুমানিক ১২০ থেকে ১৪০টি জাহাজ হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করত। এর প্রায় অর্ধেক ছিল তেলবাহী ট্যাংকার। এসব ট্যাংকারের মাধ্যমে প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ব্যারেল তেল পরিবহন করা হতো। সংঘাত তীব্র হওয়ার পর হরমুজ দিয়ে জাহাজ চলাচল নাটকীয়ভাবে কমে যায়।
তাহলে কি ইরানের দর-কষাকষির ক্ষমতা কমছে?
হরমুজ দিয়ে তেল প্রবাহের পুনরুদ্ধার তেহরানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি কৌশলগত সমস্যা তৈরি করেছে।
ইরান দীর্ঘদিন ধরে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত করার সক্ষমতাকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপের বিরুদ্ধে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে। কিন্তু যদি যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধের মধ্যেও বিপুল পরিমাণ তেল হরমুজ দিয়ে পরিবহন অব্যাহত থাকে, তাহলে আলোচনায় ইরানের দর-কষাকষির ক্ষমতা কিছুটা কমে যেতে পারে।
তবে তেহরান এমন মূল্যায়ন প্রত্যাখ্যান করছে। ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) মুখপাত্র হোসেইন মোহেব্বি বুধবার বলেছেন, হরমুজ প্রণালিতে এখনও ‘সামরিক সংঘাত’ চলছে। আধা-সরকারি ফার্স নিউজ এজেন্সিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ইরান দীর্ঘদিন ধরে ছোট জাহাজগুলোতে হামলা চালিয়ে তাদের চলাচল ঠেকিয়ে আসছে এবং যুক্তরাষ্ট্র এতে প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে না।
একই দিন যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস (ইউকেএমটিও) জানিয়েছে, মঙ্গলবার হরমুজে তিনটি জাহাজ অজ্ঞাত প্রজেক্টাইলের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে একটি ছিল অপরিশোধিত তেলবাহী ট্যাংকার।
অর্থাৎ হরমুজ দিয়ে তেল পরিবহন বাড়লেও নিরাপত্তা পরিস্থিতি এখনও পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি।
তেলের দামেও রয়ে গেছে ঝুঁকির সংকেত
বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দামও ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, ইরানের প্রভাব পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি।
মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল রফতানি পুনরুদ্ধারের খবরে মঙ্গলবার ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ২ দশমিক ৬ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ১০২ দশমিক ৫৯ ডলারে নেমেছিল। তবে সেপ্টেম্বরজুড়ে দাম প্রায় ১৩ শতাংশ বাড়ার পথে ছিল।
বাজার বিশ্লেষক ক্রিস বিউচ্যাম্পের মতে, মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল সরবরাহ পুনরুদ্ধারের তথ্য বাজারে প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। তবে এই পুনরুদ্ধার কতটা টেকসই হবে, তা নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে এখনও উদ্বেগ রয়েছে।
অন্যদিকে ওয়েলথ ক্লাবের প্রধান বিনিয়োগ কৌশলবিদ সুসানাহ স্ট্রিটার বলেন, সরবরাহ বাড়লেও অপরিশোধিত তেলের দামে এখনও ভূরাজনৈতিক ঝুঁকির প্রিমিয়াম রয়েছে। হরমুজ দিয়ে জাহাজ চলাচল বাড়ায় সরবরাহ পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও সংঘাত পুরোপুরি শেষ না হওয়া পর্যন্ত প্রবাহকে নিরাপদ বা নিশ্চিত বলা যাচ্ছে না।
ট্যাংকারের বীমা ব্যয়ও এখনও উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। ফলে আরও বেশি জাহাজ হরমুজ অতিক্রম করলেও তেল পরিবহনের মোট খরচ বেড়ে যাচ্ছে।
স্ট্রিটার আরও বলেন, শুধু অপরিশোধিত তেলের পরিসংখ্যান দেখলে পুরো চিত্র পাওয়া যাবে না। ডিজেল ও পেট্রলের মতো পরিশোধিত জ্বালানির সরবরাহ এখনও সীমিত। যুদ্ধের কারণে বিভিন্ন অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থার ওপরও বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে।
কৌশলগত তেলের মজুতও কমেছে
সংকট সামাল দিতে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশ তাদের কৌশলগত তেলের মজুত ব্যবহার করেছে। এর ফলে সরবরাহে ধাক্কা সামলানোর জন্য জরুরি মজুতের পরিমাণও কমে গেছে।
স্ট্রিটারের মতে, এসব মজুত উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ায় ভবিষ্যতে আবার সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটলে তা সামাল দেওয়ার জন্য বাজারে আগের তুলনায় কম সুরক্ষা-ব্যবস্থা থাকবে। এটিও তেলের দামের ওপর একটি নিম্নমুখী সীমা তৈরি করে রাখছে।
অর্থাৎ হরমুজ দিয়ে তেল প্রবাহ বাড়লেও বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার এখনও পুরোপুরি স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরেনি।
ইরানের ওপর বাড়ছে ‘অর্থনৈতিক যুদ্ধের’ চাপ
এদিকে ইরানের অর্থনীতির ওপর চাপ ক্রমেই বাড়ছে। দেশটির পরিসংখ্যান কেন্দ্রের সরকারি তথ্যানুযায়ী, ২১ মার্চ থেকে ২০ জুন পর্যন্ত এক বছরের তুলনায় ইরানের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) ১০ দশমিক ১ শতাংশ সংকুচিত হয়েছে। একই সময়ে দেশটির গুরুত্বপূর্ণ তেল ও গ্যাস খাত ২৬ দশমিক ৪ শতাংশ সংকুচিত হয়েছে।
এর পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি ও মুদ্রার দরপতনও অর্থনীতিকে আরও চাপে ফেলেছে। সেপ্টেম্বরের শুরুতে ১২ মাসের গড় মূল্যস্ফীতি ৬৯ দশমিক ৯ শতাংশে পৌঁছায়। একই সময়ে মার্কিন ডলারের বিপরীতে ইরানি রিয়ালের মূল্য ২২ লাখেরও বেশি রিয়ালে নেমে যায়। তেহরান এমন পরিস্থিতির জন্য মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ও অবরোধকে দায়ী করে আসছে।
তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক মোহাম্মদ এসলামি কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরাকে বলেন, সামরিক সংঘাতের পাশাপাশি ইরান ‘অর্থনৈতিক যুদ্ধের’ও মুখোমুখি হয়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, হরমুজে মার্কিন অবরোধ ইরানের তেল ও পেট্রোকেমিক্যাল রফতানি থেকে আয় এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, শুধু মুদ্রার বিনিময় হার দিয়ে ইরানের অর্থনীতির সামগ্রিক অবস্থা বিচার করা ঠিক হবে না। তার মতে, ইরান গত পাঁচ দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক চাপের মুখে রয়েছে।
যুদ্ধের অর্থনৈতিক চাপ যুক্তরাষ্ট্রের ওপরও
অর্থনৈতিক চাপ শুধু ইরানের ওপরই পড়ছে না; যুক্তরাষ্ট্রও এর প্রভাব থেকে মুক্ত নয়।
যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের দাম চলতি মাসে গ্যালনপ্রতি রেকর্ড ৬ দশমিক ৫৩ ডলারে পৌঁছেছে, যা যুদ্ধ শুরুর আগের দামের তুলনায় ৭০ শতাংশের বেশি। জ্বালানির দাম কমাতে নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ট্রাম্প প্রশাসন ডিজেল রফতানিতে বিধিনিষেধ আরোপের বিষয়টি বিবেচনা করছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
উচ্চ জ্বালানি ব্যয় যুক্তরাষ্ট্রের মূল্যস্ফীতিতেও চাপ তৈরি করছে। এরই মধ্যে দেশটির জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে উদ্বেগও রাজনৈতিক চাপ বাড়াচ্ছে। রয়টার্স/ইপসোসের সাম্প্রতিক এক জরিপে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অনুমোদনের হার ৩২ শতাংশে নেমে এসেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ইরানও যুক্তরাষ্ট্রের এই অর্থনৈতিক চাপকে আলোচনার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার চেষ্টা করছে। দেশটির পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাগের গালিবাফ সম্প্রতি একটি গাণিতিক সমীকরণের মাধ্যমে বোঝানোর চেষ্টা করেন যে, জ্বালানি সরবরাহে ইরানের প্রভাব যুক্তরাষ্ট্রের মুদ্রানীতিতেও প্রভাব ফেলছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই দাবি অতিরঞ্জিত হলেও এতে ওয়াশিংটনের ওপর তেহরানের অর্থনৈতিক প্রভাবের কিছু দিক তুলে ধরা হয়েছে।
আলোচনার পথ এখনও খোলা
সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপ বাড়লেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনা পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের সময় তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে প্রায় তিন ঘণ্টা পরোক্ষ আলোচনা হয়। ওই সময় মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনার ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির সঙ্গে বৈঠক করেন। পরে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ওই বৈঠককে ‘খুব ভালো ও ফলপ্রসূ’ বলে বর্ণনা করেন।
এরপর ইরান হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া এবং স্বাভাবিক জাহাজ চলাচল ফিরিয়ে আনার জন্য সাত দিনের একটি রোডম্যাপ প্রস্তাব করে। তবে ট্রাম্প শুরুতে প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যান করেন।
তেহরানের শর্তগুলোর মধ্যে ছিল ইরানের ওপর মার্কিন নৌ অবরোধ প্রত্যাহার, নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা এবং বিদেশে আটকে থাকা ইরানি অর্থ ছাড় করা।
তবে ৩০ সেপ্টেম্বর রয়টার্স জানায়, কাতারের মধ্যস্থতায় ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ওই প্রস্তাবের বিষয়ে প্রতিক্রিয়া পেয়েছেন। আলোচনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, দুই পক্ষের মধ্যে এখন মূল মতপার্থক্য প্রস্তাবের বিষয়বস্তু নিয়ে নয়; বরং কোন পদক্ষেপ আগে এবং কোনটি পরে নেওয়া হবে- অর্থাৎ পদক্ষেপগুলোর ক্রম নির্ধারণ নিয়েই বিরোধ বেশি।
ইরানের প্রভাব কমছে, নাকি কৌশল বদলাচ্ছে?
হরমুজ দিয়ে তেল প্রবাহের পুনরুদ্ধার নিঃসন্দেহে ইরানের একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত হাতিয়ারকে দুর্বল করছে। যুদ্ধের চরম পর্যায়ে যেখানে প্রণালির জাহাজ চলাচল প্রায় স্থবির হয়ে গিয়েছিল, এখন সেখানে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ তেল আবার পরিবহন হচ্ছে।
তবে এটিকে ইরানের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ হারানোর প্রমাণ হিসেবে দেখা যাচ্ছে না। জাহাজের বীমা ব্যয় এখনও বেশি, নিরাপত্তা ঝুঁকি রয়েছে, পরিশোধিত জ্বালানির সরবরাহে ঘাটতি আছে এবং তেলবাজারে ভূরাজনৈতিক ঝুঁকির প্রভাব এখনও স্পষ্ট।
অন্যদিকে ইরানের অর্থনীতি তীব্র চাপের মধ্যে রয়েছে। জিডিপির সংকোচন, তেল ও গ্যাস খাতের পতন, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং রিয়ালের দরপতন তেহরানের ওপর সমঝোতায় পৌঁছানোর চাপ বাড়াতে পারে।
ফলে হরমুজ নিয়ে ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের দর-কষাকষিতে পরিস্থিতি এখন এক ধরনের সূক্ষ্ম ভারসাম্যে দাঁড়িয়ে আছে। ইরানের অর্থনৈতিক চাপ বাড়ছে, কিন্তু হরমুজকে পুরোপুরি নিরাপদ ও স্বাভাবিক জ্বালানি পরিবহনপথে পরিণত করাও এখনও সম্ভব হয়নি। আর সেই অনিশ্চয়তাই তেহরানের হাতে কিছুটা হলেও কৌশলগত প্রভাব ধরে রেখেছে।
সাম্প্রতিক আলোচনায় দুই পক্ষের মতপার্থক্য এখন প্রস্তাবের মূল বিষয়বস্তুর চেয়ে পদক্ষেপ বাস্তবায়নের ক্রম নিয়ে বেশি- এটি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, হরমুজের ভবিষ্যৎ নিয়ন্ত্রণ ও জ্বালানি প্রবাহের প্রশ্নটি যুদ্ধবিরতি বা বৃহত্তর সমঝোতার আলোচনায় এখনও অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে রয়েছে। সূত্র: আল-জাজিরা
ভোরের আকাশ/এনএস