যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রভাব ফেলছে ইরান?

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে রাজনৈতিকভাবে চাপে ফেলতে ইরান ইচ্ছাকৃতভাবে ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনা দীর্ঘ করছে বলে জানিয়েছেন দেশটির কয়েকজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা।
আগামী ৩ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ট্রাম্পের রাজনৈতিক অবস্থান দুর্বল করাই তেহরানের অন্যতম লক্ষ্য বলে তাদের দাবি। একই সঙ্গে নতুন করে মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলার আশঙ্কা এবং ওয়াশিংটনের প্রতি গভীর অবিশ্বাসের কারণে দ্রুত কোনো চুক্তিতে পৌঁছাতে আগ্রহী নয় ইরান।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনজন জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তা ও দেশটির একজন অভ্যন্তরীণ সূত্র এসব তথ্য জানিয়েছেন। তাদের মতে, আট মাস ধরে চলা যুদ্ধের অচলাবস্থা ভাঙতে ট্রাম্প আবারও সামরিক হামলার পথ বেছে নিতে পারেন বলে মনে করছে তেহরান।
এক ইরানি কর্মকর্তা বলেন, ইরান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধ শেষ করার চুক্তির প্রস্তুতি নিচ্ছে না; বরং নতুন করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার জন্য প্রস্তুত। ইরানের ধর্মীয় নেতৃত্ব ট্রাম্পকে কোনো রাজনৈতিক বিজয় দিতে চায় না।
তেহরানের বিশ্লেষক সাঈদ লেইলাজের মতে, আলোচনা দীর্ঘ করার মাধ্যমে ইরান কোনো বেআইনি পদক্ষেপ না নিয়েই যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে প্রভাব ফেলছে।
গত ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র ইসরায়েলের ইরানে হামলার মধ্য দিয়ে যুদ্ধ শুরু হয়। এই যুদ্ধের প্রভাবে ট্রাম্পের জনসমর্থন রেকর্ড পর্যায়ে নেমে গেছে বলে বিভিন্ন জনমত জরিপে উঠে এসেছে। জ্বালানির উচ্চমূল্য নিয়ে উদ্বিগ্ন মার্কিন ভোটাররা আগামী ৩ নভেম্বরের নির্বাচনে ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টিকে শাস্তি দিতে পারেন বলে জরিপগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে।
ট্রাম্প বারবার বলেন, নির্বাচনের পর তেলের দাম কমবে। তবে যুদ্ধ বন্ধ করা এবং বৈশ্বিক জ্বালানি পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়ে তিনি বিস্তারিত কোনো পরিকল্পনা জানাননি।
যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইরানের হুমকি ও হামলার কারণে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল ব্যাপকভাবে কমে গেছে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের সামুদ্রিক অবরোধ ও বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞায় ইরানের তেল রপ্তানি থেকে আয় বন্ধ হয়ে গেছে। এতে দেশটির অর্থনৈতিক সংকট আরও গভীর হয়েছে।
ইরানি কর্মকর্তাদের মতে, ট্রাম্পের রাজনৈতিক সুবিধা হতে পারে—এমন কোনো ছাড় দিতে রাজি নয় তেহরান। ফলে মার্কিন নির্বাচনের আগে আলোচনায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতির সম্ভাবনা কম।
ইসরায়েলের চাপের মুখে যুক্তরাষ্ট্র শুরু থেকেই আলোচনায় ইরানের দীর্ঘদিনের পারমাণবিক কর্মসূচি অন্তর্ভুক্ত করতে চায়। তেহরান দাবি করে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ। তবে পশ্চিমা দেশগুলোর অভিযোগ, এর সামরিক ব্যবহারেরও সম্ভাবনা রয়েছে।
ইরান বলছে, পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা শুরুর আগে তাদের দেওয়া ‘সাতদিনের পরিকল্পনা’র শর্তগুলো পূরণ করতে হবে। পাশাপাশি হরমুজ প্রণালির ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ ও কৌশলগত প্রভাব ছাড়ার কোনো ইঙ্গিতও দেয়নি দেশটি।
কাতারের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্রের কাছে পাঠানো প্রস্তাবে ইরান সাতদিনের মধ্যে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার কথা বলেছে। তবে শর্ত হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের সামুদ্রিক অবরোধ তুলে নেওয়া, ইরানের তেল রপ্তানির ওপর বিধিনিষেধ শিথিল করা, জব্দ করা সম্পদ মুক্ত করা এবং সব ফ্রন্টে যুদ্ধ বন্ধ করার দাবি জানিয়েছে তেহরান। প্রণালিটি ইরানের নিয়ন্ত্রণে রাখার কথাও প্রস্তাবে রয়েছে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি রোববার বলেন, প্রস্তাবটি এখনো কার্যকর রয়েছে এবং মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে দুই পক্ষের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদান চলছে।
এক ইরানি কর্মকর্তার মতে, যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক প্রতিশ্রুতির ওপর তেহরানের আস্থা কমে যাওয়ার পেছনে আগের আলোচনার সময় হামলার অভিজ্ঞতা রয়েছে।
২০২৫ সালের জুনে ইসরায়েলের হামলায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ওমানে পারমাণবিক আলোচনা ভেস্তে যায়। এরপর গত ফেব্রুয়ারিতেও দুই দেশের আরেক দফা আলোচনা শেষ হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা শুরু করে। তখন আরও কারিগরি আলোচনা হওয়ার কথা ছিল।
ইরানের ধারণা, যুদ্ধ ও শান্তির মধ্যবর্তী একটি পরিস্থিতি বজায় রেখে মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচন পর্যন্ত ওয়াশিংটনের ওপর চাপ ধরে রাখা সম্ভব। একই সঙ্গে কূটনীতির প্রতি নিজেদের আগ্রহের কথাও জানানো যাবে।
ভোরের আকাশ/আ.র