শিরোপা স্পেনের, সমালোচনার কেন্দ্রে আর্জেন্টিনার আচরণ

২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনালে স্পেনের জয়কে ‘ফুটবলের জয়’ বলাটা হয়তো অনেকের কাছে গতানুগতিক শোনাতে পারে। কিন্তু ম্যাচটি দেখার পর নিরপেক্ষ দর্শকদের বড় একটি অংশই এই মূল্যায়নের সঙ্গে একমত হবেন। আধিপত্য, আক্রমণাত্মক ফুটবল এবং নিখুঁত পরিকল্পনায় আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো পুরুষদের বিশ্বকাপের শিরোপা জিতেছে স্পেন। অতিরিক্ত সময়ে ফেরান তোরেসের জয়সূচক গোলে ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারিত হয়। এরপর অধিনায়ক রদ্রি ট্রফি উঁচিয়ে ধরতেই স্পষ্ট হয়ে যায়—ফাইনালের সেরা দলটিই শিরোপা জিতেছে।
খেলোয়াড় ও দর্শক—দুই পক্ষের জন্যই ম্যাচটি ছিল ধৈর্যের কঠিন পরীক্ষা। তবে পুরো ১২০ মিনিটে বলের নিয়ন্ত্রণ, আক্রমণ গড়ে তোলা এবং সুযোগ সৃষ্টি—সব দিক থেকেই স্পেন ছিল অনেক এগিয়ে। তাই ফুটবলীয় বিচারেই নয়, অনেকের মতে নৈতিক দিক থেকেও এই ফলই ছিল সবচেয়ে যৌক্তিক।
বিবিসি ওয়ানে সাবেক ইংল্যান্ড অধিনায়ক অ্যালান শিয়ারার বলেন, "সঠিক দলটিই জিতেছে, এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত স্পেনই বলের নিয়ন্ত্রণে ছিল। তারাই আক্রমণ করেছে, সুযোগ তৈরি করেছে এবং প্রতিপক্ষের রক্ষণ ভাঙার চেষ্টা করেছে। ফুটবলের জন্য এটি দারুণ একটি ফল।"

পরিসংখ্যানও স্পেনের শ্রেষ্ঠত্বের সাক্ষ্য দেয়। ম্যাচে তাদের বল দখলের হার ছিল ৬৫ শতাংশ। এক্সপেক্টেড গোল (xG) ছিল ১.৯৪। তারা মোট ২০টি শট নেয়, যার ১১টিই ছিল লক্ষ্যে। অন্যদিকে গোলরক্ষক উনাই সিমন আট ম্যাচে সপ্তম ক্লিন শিট রেখে গোল্ডেন গ্লাভস জেতেন। পুরো টুর্নামেন্টে স্পেন মাত্র একটি গোল হজম করেছে, যা বিশ্বকাপজয়ী কোনো দলের সর্বনিম্ন গোল হজমের নতুন রেকর্ড।
বর্তমান আন্তর্জাতিক ফুটবলে স্পেনের আধিপত্য এখন প্রশ্নাতীত। তারা একসঙ্গে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন, ইউরো চ্যাম্পিয়ন ও অলিম্পিক চ্যাম্পিয়ন। একই সঙ্গে নারী বিশ্বকাপের শিরোপাও স্পেনের দখলে। পুরুষ দলটি সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে টানা ৩৮ ম্যাচ অপরাজিত থেকেছে, যা ইউরোপীয় ফুটবলে নতুন ইতিহাস।
মজার বিষয় হলো, টুর্নামেন্টের শুরুতে কেপ ভার্দের বিপক্ষে গোলশূন্য ড্র করেছিল স্পেন। অর্থাৎ ২০১০ সালের মতো এবারও উদ্বোধনী ম্যাচে জয় না পেয়েই শেষ পর্যন্ত বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়েছে তারা। ফাইনালেও স্পেন গড়েছে নতুন রেকর্ড। বিশ্বকাপের ফাইনালে ১০০টির বেশি সফল পাসের নজির ছিল মাত্র তিনবার। এর মধ্যে দুটি এসেছে এই ম্যাচেই। রদ্রি সম্পন্ন করেন ১০১টি এবং পাউ কুবারসি ১২১টি সফল পাস।
স্পেনের ভবিষ্যৎও উজ্জ্বল বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা। মাত্র ১৯ বছর বয়সী পাউ কুবারসি টুর্নামেন্টের সেরা তরুণ খেলোয়াড় নির্বাচিত হয়েছেন। আর বার্সেলোনার আরেক তারকা লামিনে ইয়ামাল নিজের সেরাটা এখনও সামনে রেখেছেন বলেই ধারণা করা হচ্ছে। ১৯ বছর ৬ দিন বয়সে ইয়ামাল বিশ্বকাপের ফাইনালে খেলা ইতিহাসের তৃতীয় সর্বকনিষ্ঠ ফুটবলার হন। একই সঙ্গে তিনি বিশ্বকাপজয়ী তৃতীয় সর্বকনিষ্ঠ খেলোয়াড়ের কীর্তিও গড়েছেন।

স্পেনকে থামাতে পারেনি আর্জেন্টিনা
প্রথমার্ধে আর্জেন্টিনা ফুটবল খেলার চেয়ে স্পেনের ছন্দ নষ্ট করতেই বেশি মনোযোগী ছিল। লিয়ান্দ্রো পারেদেস ও এনজো ফার্নান্দেজ মাঝমাঠে কঠোর ট্যাকল ও ফাউলের মাধ্যমে স্পেনকে আটকানোর চেষ্টা করেন। চারজন আর্জেন্টাইন ফুটবলার হলুদ কার্ড দেখলেও অনেকের মতে, তারা আরও কঠোর শাস্তি এড়িয়ে গেছে।
পুরো ম্যাচে আর্জেন্টিনা সফলভাবে ৪৬৪টি পাস সম্পন্ন করে। বিপরীতে স্পেনের সফল পাস ছিল ৮৫২টি। পার্থক্যটা শুধু পরিসংখ্যানে নয়, মাঠের খেলাতেও স্পষ্ট ছিল। স্পেন চাইলে নির্ধারিত সময়েই ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করতে পারত। কিন্তু আর্জেন্টিনার গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্টিনেজ অসাধারণ ১১টি সেভ করে দলকে লড়াইয়ে রাখেন। বিশ্বকাপের ফাইনালে এটি কোনো গোলরক্ষকের সর্বোচ্চ সেভের রেকর্ড।
তবে আক্রমণে ছিল চরম ব্যর্থতা। বিশ্বকাপ ইতিহাসে প্রথমবারের মতো কোনো বর্তমান চ্যাম্পিয়ন দল ফাইনালের প্রথম ৯০ মিনিটে একটি শটও নিতে পারেনি। আর্জেন্টিনার প্রথম উল্লেখযোগ্য আক্রমণ আসে ১১৭ মিনিটে, লিওনেল মেসির মাধ্যমে।

শেষ বাঁশির পর বিতর্ক
ম্যাচ শেষে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। এনজো ফার্নান্দেজ প্রথমে প্রতিবাদের জন্য এবং পরে বিপজ্জনক ট্যাকলের কারণে দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখে মাঠ ছাড়েন। তার ফাউলে পাউ কুবারসি গুরুতর আঘাত পাওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছিলেন। শেষ বাঁশির পর পারেদেস স্পেনের রদ্রি, গাভি ও বোর্হা ইগলেসিয়াসের সঙ্গে হাতাহাতিতে জড়িয়ে পড়েন। একই সময়ে নাহুয়েল মোলিনাকেও এক স্প্যানিশ খেলোয়াড়কে ঘুষি মারতে দেখা যায়।
বিবিসির বিশ্লেষক ওয়েন রুনি বলেন, "খেলা শেষে এমন দৃশ্য সত্যিই লজ্জাজনক। একজন দল বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়েছে, অথচ এমন আচরণের কোনো গ্রহণযোগ্যতা নেই। পারেদেস আরও ভালো আচরণ করতে পারত।" ম্যাচ শেষে সংবাদ সম্মেলনে আর্জেন্টিনার কোচ লিওনেল স্কালোনি আবেগাপ্লুত ছিলেন। তিনি নিজের দলের লড়াইয়ের প্রশংসা করলেও শেষ পর্যন্ত স্বীকার করেন, সেরা দলই শিরোপা জিতেছে।
এনজো ফার্নান্দেজের লাল কার্ড প্রসঙ্গে স্কালোনি বলেন, "৮৫ মিনিট পর্যন্ত তারা আমাদের চেয়ে ভালো খেলেছে। তবে যদি আমাদের ১১ জন খেলোয়াড় মাঠে থাকত, তাহলে কী হতো, সেটা জানা যেত না।" তিনি আরও বলেন, "আমরা শেষ পর্যন্ত টিকে থাকার চেষ্টা করেছি। কিন্তু তারা এই জয়ের যোগ্য। এটাই বাস্তবতা।"
আর্জেন্টিনা ম্যাচটিকে অতিরিক্ত সময়ে নিয়ে যেতে সক্ষম হলেও তাতে তাদের দুর্বলতা আড়াল হয়নি। সাবেক ইংল্যান্ড গোলরক্ষক জো হার্টের ভাষায়, "আর্জেন্টিনার অভিযোগ করার কোনো সুযোগ নেই। শেষের আচরণ ছিল অত্যন্ত ন্যক্কারজনক।"
ভোরের আকাশ/সু.পা