বিশ্বকাপে দায়িত্ব পেতে রেফারিদের কঠিন পরীক্ষা ও পারিশ্রমিক

বিশ্বকাপের মঞ্চে শুধু খেলোয়াড়দেরই নয়, নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণের কঠিন লড়াইয়ে নামতে হয় রেফারিদেরও। ফুটবলের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ এই আসরে ম্যাচ পরিচালনার সুযোগ পেতে তাদের দীর্ঘদিনের প্রস্তুতি, কঠোর ফিটনেস পরীক্ষা এবং ধারাবাহিক পারফরম্যান্স মূল্যায়নের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। শারীরিক সক্ষমতার পাশাপাশি সিদ্ধান্ত নেওয়ার দক্ষতা, আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা এবং ম্যাচ নিয়ন্ত্রণের সামর্থ্যও বিবেচনা করে ফিফা।
২০২৬ বিশ্বকাপে দায়িত্ব পালন করছেন মোট ১৭০ জন ম্যাচ কর্মকর্তা। এর মধ্যে রয়েছেন ৫২ জন প্রধান রেফারি, ৮৮ জন সহকারী রেফারি এবং ৩০ জন ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (ভিএআর)। ৪৮ দলের সম্প্রসারিত বিশ্বকাপে মোট ১০৪টি ম্যাচ পরিচালনার দায়িত্ব তাদের ওপরই বর্তায়।
ফিফার রেফারি নির্বাচন প্রক্রিয়া শুরু হয় আগের বিশ্বকাপ শেষ হওয়ার পর থেকেই। কাতার বিশ্বকাপের পরপরই ২০২৬ আসরের সম্ভাব্য রেফারিদের পর্যবেক্ষণ শুরু হয়। নির্বাচনের অংশ হিসেবে প্রার্থীদের বিশেষ প্রশিক্ষণ সেমিনারে অংশ নিতে হয় এবং কঠোর ফিটনেস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হয়। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ম্যাচ পরিচালনার অভিজ্ঞতাও থাকতে হয়।
একজন রেফারিকে একটি ৯০ মিনিটের ম্যাচে সাধারণত ১০ থেকে ১৩ কিলোমিটার দৌড়াতে হয়। গুরুত্বপূর্ণ ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ম্যাচে এই দূরত্ব ১৪ থেকে ১৫ কিলোমিটার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে, যা অনেক মিডফিল্ডারের সমান। এ কারণে নিয়মিত ৪০ মিটার স্প্রিন্ট, ইয়ো-ইয়ো টেস্টসহ বিভিন্ন শারীরিক সক্ষমতার পরীক্ষায় অংশ নিতে হয় তাদের।
তবে শুধু ফিটনেসই যথেষ্ট নয়। গত কয়েক বছরে ঘরোয়া ও আন্তর্জাতিক ম্যাচে রেফারিদের পারফরম্যান্সও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করে ফিফা। গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে ফিফার মূল্যায়নকারীরা উপস্থিত থেকে তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ, ম্যাচ নিয়ন্ত্রণ, খেলোয়াড় ব্যবস্থাপনা এবং পুরো রেফারি দলের সমন্বয় মূল্যায়ন করেন।
২০১৪ বিশ্বকাপে দায়িত্ব পালন করা ইতালিয়ান সহকারী রেফারি রেনাতো ফাভেরানি বলেন, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে রেফারিদের ব্যক্তিগতভাবে নয়, একটি দল হিসেবে মূল্যায়ন করা হয়। একই রেফারি দলকে বিভিন্ন ম্যাচে একসঙ্গে দায়িত্ব দেওয়া হয় এবং প্রতিটি ম্যাচ শেষে তাদের পারফরম্যান্সের বিস্তারিত প্রতিবেদন তৈরি করা হয়।
বিশ্বকাপে নির্বাচিত হওয়ার পরও সব ম্যাচ পরিচালনার দায়িত্ব নিশ্চিত থাকে না। টুর্নামেন্ট চলাকালে প্রতিটি ম্যাচের তিন থেকে চার দিন আগে সংশ্লিষ্ট রেফারিদের সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স বিবেচনা করে দায়িত্ব নির্ধারণ করে ফিফা। নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে কোনো রেফারিকে নিজ দেশের ম্যাচ পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয় না।
পারিশ্রমিকের দিক থেকেও বিশ্বকাপের রেফারিরা উল্লেখযোগ্য সুবিধা পান। ফিফার সাম্প্রতিক কাঠামো অনুযায়ী, একজন প্রধান রেফারি টুর্নামেন্ট ফি হিসেবে প্রায় ৫০ থেকে ৭০ হাজার মার্কিন ডলার পান, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৬০ থেকে ৮৫ লাখ টাকার সমান। এর পাশাপাশি প্রতিটি ম্যাচ পরিচালনার জন্য আরও ৩ থেকে ৫ হাজার মার্কিন ডলার (প্রায় ৩ লাখ ৫০ হাজার থেকে ৬ লাখ টাকা) দেওয়া হয়। ফলে একটি বিশ্বকাপ থেকে একজন প্রধান রেফারির মোট আয় এক কোটি টাকারও বেশি হতে পারে।
অন্যদিকে, সহকারী রেফারিরা টুর্নামেন্ট ফি হিসেবে ২৫ থেকে ৩৫ হাজার মার্কিন ডলার (প্রায় ৩০ থেকে ৪২ লাখ টাকা) এবং ম্যাচপ্রতি ২ থেকে ৩ হাজার মার্কিন ডলার (প্রায় আড়াই থেকে সাড়ে তিন লাখ টাকা) পারিশ্রমিক পেয়ে থাকেন। খেলোয়াড়দের মতোই বিশ্বকাপের রেফারিদেরও প্রতিটি সিদ্ধান্ত থাকে কঠোর নজরদারির মধ্যে। তাই এই আসরে বাঁশি বাজানোর সুযোগ শুধু সম্মানের নয়, দীর্ঘদিনের কঠোর পরিশ্রম, দক্ষতা ও ধারাবাহিকতারও স্বীকৃতি।
ভোরের আকাশ/সু.পা