এবার রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ভোটে গড়াচ্ছে

বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আগামী ২০ আগস্ট নির্ধারণ করে তফসিল ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। একাধিক প্রার্থী ঘোষণা হওয়ায় ভোটে গড়াচ্ছে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন। রাষ্ট্রপতি হিসেবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী এবং দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে মনোনয়ন দিয়েছে। অন্যদিকে, রাষ্ট্রপতি পদে কর্নেল (অব.) অলি আহমেদের নাম ঘোষণা করেছে বিরোধীদল জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট।
বিশেষজ্ঞদের মতে, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে একক প্রার্থী হলে যাচাই-বাছাই শেষে একক বৈধ প্রার্থীকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়। যদি একাধিক প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দেন এবং তাদের মনোনয়নপত্র বৈধ হয়, তবেই কেবল ভোটের প্রয়োজন পড়বে।
সংবিধানের বিধান অনুযায়ী, সংসদ সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। আর প্রধান নির্বাচন কমিশনার তাতে ‘নির্বাচনি কর্তা’ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। নির্বাচনের জন্য ৩৫০ জন সংসদ সদস্যের নাম সংবলিত ভোটার তালিকাও সংগ্রহ করেছে ইসি।
বিএনপির একাধিক সূত্রে জানা গেছে, রাষ্ট্রপতি হিসেবে বিএনপি মহাসচিব এবং স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে মনোনয়ন দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন দলটির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এর আগে, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের জন্য নির্বাচন কমিশনার (ইসি) রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে দুটি মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছে ক্ষমতাসীন দল বিএনপি।
অন্যদিকে, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রার্থী হিসেবে কর্নেল (অব.) অলি আহমেদের নাম ঘোষণা করেছে জাতীয় সংসদের বিরোধীদল জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট। সংবিধানের বিধান অনুযায়ী, যদি রাষ্ট্রপতি পদে একাধিক প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দেন ও তাদের মনোনয়নপত্র বৈধ হয়। তবেই রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোটের প্রয়োজন পড়বে- এমনটাই বলছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
আইন অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন সংসদ সদস্যদের প্রকাশ্য ভোটে। একজন সংসদ সদস্য একটি ভোট দিতে পারবেন। ভোটগ্রহণের জন্য নির্বাচন কমিশন আগেই প্রয়োজনীয়সংখ্যক ব্যালট পেপার প্রস্তুত করবে। প্রতিটি ব্যালট পেপারে দুটি অংশ থাকবে। কাউন্টার ফয়েল বা চেকমুড়িতে প্রত্যেক ভোটারের নাম ও স্বাক্ষরের জন্য স্থান নির্ধারিত থাকবে। প্রতিটি ব্যালট পেপারের আউটার ফয়েলে (যেখানে ভোট দেন ভোটার) রাষ্ট্রপতি পদের প্রার্থীদের নাম আদ্যক্ষর অনুযায়ী ক্রমানুসারে মুদ্রিত থাকবে। এর পাশে সংসদ সদস্য অর্থাৎ ভোটার পূর্ণ নাম স্বাক্ষর করে ভোট সম্পন্ন করবেন।
সংসদের রাজনৈতিক সমীকরণ অনুযায়ী, ক্ষমতাসীন দল বিএনপির মনোনীত প্রার্থীই দেশের পরবর্তী রাষ্ট্রপতি হতে যাচ্ছেন- এটি প্রায় নিশ্চিত। বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠকে সাধারণত রাষ্ট্রপতি প্রার্থীর নাম চূড়ান্ত করা হয়। দলের নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ের নেতাদের মতে, দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যাকে মনোনীত করেছেন, সংসদ সদস্যরা তাকেই ভোট দেবেন। বিরোধীদল বা অন্য কোনো পক্ষ থেকে প্রার্থী থাকলেও সরকারি দলের মনোনীত প্রার্থীই নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন। সাধারণত সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের সমর্থিত ব্যক্তিরাই রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। বর্তমান সংসদে বিএনপির দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা আছে। ফলে বিএনপি যাকে প্রার্থী করবে, তিনিই হবেন পরবর্তী রাষ্ট্রপতি, তা বলাই যায়।
বিএনপি সূত্রে জানা যায়, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের জন্য নির্বাচন কমিশনের (ইসি) রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। প্রধান নির্বাচনি কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে এ মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেন জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি ও বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী।
জামায়াতে ইসলামী সূত্রে জানা গেছে, জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের শীর্ষ নেতাদের বৈঠক শেষে দলটির আমির ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান জানান, দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ১১ দলীয় জোটের শীর্ষ নেতাদের সম্মতিতে কর্নেল অলি আহমেদকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রার্থী করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, কাজেই ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী কর্নেল (অব.) অলি আহমেদ।
সংবিধানের ৪৮ অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে কারা অংশ নিতে পারবেন না, এর উল্লেখ আছে। এতে বলা হয়েছে- কোনো ব্যক্তি রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার যোগ্য হবেন না, যদি তিনি ৩৫ বছরের কম বয়স্ক হন; অথবা সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার যোগ্য না হন; অথবা কখনো সংবিধানের অধীন অভিশংসন দ্বারা রাষ্ট্রপতির পদ থেকে অপসারিত হয়ে থাকেন। অর্থাৎ রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হতে হলে কোনো ব্যক্তিকে অন্তত ৩৫ বছর বয়সী হতে হবে, থাকতে হবে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার যোগ্যতা।
সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদ অনুসারে, কোনো ব্যক্তি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়া বা সদস্য পদে থাকার যোগ্য বলে বিবেচিত হবেন না, যদি তিনি আদালত কর্তৃক অপ্রকৃতিস্থ ঘোষিত হন, দেউলিয়া হয়ে দায়মুক্ত না হন, বিদেশি রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব গ্রহণ বা আনুগত্য স্বীকার করেন, নৈতিক স্খলনজনিত অপরাধে অন্তত দুই বছরের কারাদণ্ড পেয়ে মুক্তির পাঁচ বছর না পেরোয়, ১৯৭২ সালের বাংলাদেশ যোগসাজশকারী (বিশেষ ট্রাইব্যুনাল) আদেশে দণ্ডিত হন, লাভজনক সরকারি পদে অধিষ্ঠিত থাকেন বা আইন অনুযায়ী নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষিত হন। এ ছাড়া জাতীয় নির্বাচন-সংক্রান্ত আইন গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার অযোগ্যতার বিষয়ে আরও কিছু বিষয় বিস্তারিত বলা আছে। এসব অযোগ্যতা থাকলেও কোনো ব্যক্তি রাষ্ট্রপতি হতে পারবেন না।
সংবিধান ও আইন অনুযায়ী যোগ্য বিবেচিত হওয়ার পরও যে কেউ চাইলেই রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হতে পারেন না। ১৯৯১ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইনে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচিত হওয়ার যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তির মনোনয়নপত্র দাখিল করবেন সংসদ সদস্য। মনোনয়নপত্রে প্রস্তাবক হিসেবে ওই সংসদ সদস্যের সই থাকতে হবে। সমর্থক হিসেবে অন্য আরেকজন সংসদ সদস্যের সই থাকতে হবে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রপতি পদের জন্য মনোনীত ব্যক্তির সম্মতি আছে, এমন সই করা (প্রার্থীর সই) বিবৃতিতে থাকতে হবে।
অতীতে দেখা গেছে, সংসদে ক্ষমতাসীন দলের একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলে বিরোধীদল রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী মনোনয়ন দেয় না। কারণ, ভোট হলেও বিরোধীদলের প্রার্থীর জেতার সম্ভাবনা নেই। তবে ১৯৯১-এর পর দেশের ইতিহাসে ২০১৬ সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে একাধিক প্রার্থী ছিলেন।বাংলাদেশের ইতিহাসে কেবল একবার রাষ্ট্রপতি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক ভোট হয়েছিল। ১৯৯১ সালে বিএনপি সরকার গঠনের পর সংসদ সদস্যদের ভোটে আবদুর রহমান বিশ্বাস রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। ওই নির্বাচনে তার প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন আওয়ামী লীগ-সমর্থিত প্রার্থী বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরী। এরপর অনুষ্ঠিত সব রাষ্ট্রপতি নির্বাচনেই প্রার্থী একজন থাকায় তারা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন। এবারও বিএনপির সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় দলটির সমর্থন ছাড়া অন্য কোনো প্রার্থীর জয়ী হওয়ার সম্ভাবনা নেই।
প্রসঙ্গত, নির্বাচন কমিশন (ইসি) ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের মনোনয়নপত্র দাখিলের তারিখ ১৩ আগস্ট। এদিন সকাল ১০টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত চলবে এই কার্যক্রম। ১৬ আগস্ট মনোনয়নপত্র বাছাই হবে। ১৮ আগস্ট প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ তারিখ। আর ভোটগ্রহণ হবে ২০ আগস্ট।
ভোরের আকাশ/এসএইচ