জুলাইয়ে সহিংসতায় নিহত ২৩, নারী-শিশুসহ আহত ৪৭৩ জন

চলতি বছরের জুলাই মাসে সারা দেশে রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় দলীয় কোন্দল ও অন্তঃকোন্দলে ৬ জন নিহত এবং ১৬৪ জনের বেশি বিভিন্ন দলের নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ আহত হয়েছে। এ ছাড়া এ মাসে মব সহিংসতায় অন্তত ১৭ জন নিহত ও ৫১ জন আহত হয়েছে।
এ সময় নির্যাতনের শিকার ২৫৮ নারী ও শিশু। একই সঙ্গে নির্যাতন ও হয়রানির শিকার ৫৫ সাংবাদিক।
সোমবার (৩ আগস্ট) গণমাধ্যমে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানিয়েছে মানবাধিকার সংগঠন ‘হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি’ (এইচআরএসএস)।
দেশের ১৬টি জাতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ এবং এইচআরএসএসের সংগৃহীত তথ্য ও স্থানীয় প্রতিনিধিদের পাঠানো তথ্যের ভিত্তিতে ২০২৬ সালের জুলাই মাসের এই মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, জুলাই মাসে ৪৫টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় ৬ জন নিহত এবং ১৬৪ জন আহত হন। তবে জুলাই মাসে রাজনৈতিক সহিংসতায় হতাহতের সংখ্যা জুন মাসের তুলনায় কমেছে। গত জুন মাসে ৫৮টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় ৯ জন নিহত এবং ৩৪৬ জন আহত হয়েছিল।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, জুলাই মাসের ৪৫টি সহিংসতার ঘটনার মধ্যে বিএনপির অন্তঃকোন্দলে ১৪টি ঘটনায় অন্তত ৪৮ জন আহত ও দুজন নিহত হন।
বিএনপি-জামায়াতের সংঘর্ষের ৬টি ঘটনায় ৪৪ জন এবং বিএনপি-আওয়ামী লীগের ৩টি সংঘর্ষে ১৩ জন আহত হয়। বিএনপি-এনসিপির ৫টি সংঘর্ষে ৩৮ জন এবং অন্যান্য দলের সঙ্গে বিএনপির ১৪টি সংঘর্ষে ১৬ জন আহত হয়েছে।
এ ছাড়া বিভিন্ন দলের মধ্যে ৩টি ঘটনায় নিহত ৩ জন ও আহত হয় ৫ জন। নিহত ৫ জনের মধ্যে বিএনপির ২ জন এবং জেএসএস ও ইউপিডিএফের ৩ জন রয়েছে।
দুষ্কৃতকারীদের দ্বারা রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাকর্মীদের ওপর হামলার অন্তত ৭টি ঘটনায় ২ জন আহত এবং ৫ জন নিহত হয়েছে।
নিহতদের মধ্যে আওয়ামী লীগের ১ জন ও বিএনপির ৪ জন। এ মাসে অন্তত ১৫ জন রাজনৈতিক নেতাকর্মী গুলিবিদ্ধ হয়েছেন।
সারা দেশে আধিপত্য বিস্তার, দখলদারি, রাজনৈতিক সহিংসতা ও চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে ৯টি ঘটনায় অন্তত ৪০টি বাড়িঘর, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও দলীয় কার্যালয়ে সংঘর্ষ, হামলা, লুটপাট, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে।
রাজনৈতিক মামলার বিষয়ে বলা হয়, এ মাসে বিভিন্ন দলের নেতাকর্মীদের নামে ৪১টির বেশি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় ৮৮৭ জনের নাম উল্লেখ করে এবং প্রায় ৫ হাজার ১৯ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে।
রাজনৈতিক ও অন্যান্য মিলিয়ে মোট ১৯৩টি ঘটনায় অন্তত ৯ হাজার ১৫৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তারদের মধ্যে আওয়ামী লীগের অন্তত ৩১৮ জন, বিএনপির ২৮ জন, এনসিপির ৭ জন ও জামায়াতে ইসলামীর ১ জন কর্মী রয়েছেন।
সারা দেশে যৌথ বাহিনীর বিশেষ অভিযানে ৮ হাজার ৭৯৫ জনেরও বেশি ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যাদের অধিকাংশই আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ ও নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের নেতাকর্মী, মাদকব্যবসায়ী, সন্ত্রাসী এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক ও উগ্রপন্থী সংগঠনের সদস্য।
এইচআরএসএস জানায়, জুলাই মাসে চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, বাকবিতণ্ডা, আধিপত্য বিস্তার, ধর্মীয় অবমাননাসহ নানা অভিযোগে ৪৯টি গণপিটুনি ও মব সহিংসতার ঘটনায় অন্তত ১৭ জন নিহত ও ৫১ জন আহত হয়েছে।
আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর হেফাজতে এ মাসে ৩ জন মারা গেছে; যার মধ্যে পুলিশ হেফাজতে ২ জন ও ডিবি হেফাজতে ১ জন। এ ছাড়া সারা দেশে কারাগারে কমপক্ষে ১০ জন আসামি মারা গেছেন (২ জন কয়েদি ও ৮ জন হাজতি)। তাদের মধ্যে আওয়ামী লীগের ২ জন ও ৮ জন সাধারণ কয়েদি ছিলেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ মাসে ৩৬টি ঘটনায় ৫৫ জন সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। এতে আহত হন অন্তত ২১ জন, লাঞ্ছিত ৯ জন এবং ৮ জন সাংবাদিক হুমকির সম্মুখীন হয়েছেন। আটক করা হয়েছে ৩ জন সাংবাদিককে। এ ছাড়া ৮টি মামলায় ১৪ জন সাংবাদিককে অভিযুক্ত করা হয়েছে।
এ মাসে ৯টি সভা-সমাবেশ আয়োজনে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী সরাসরি বা পরোক্ষভাবে বাধা দেওয়ায় ২০ জন আহত হয়েছেন।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও অন্যান্য মাধ্যমে মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের অন্তত ৮টি ঘটনায় ৮ জনকে আটক ও ৮টি মামলা করা হয়েছে, যেখানে অন্তত ২৫ জনকে অভিযুক্ত করা হয়। এদের মধ্যে স্পিকারকে নিয়ে সমালোচনায় ১ জন, প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা উপদেষ্টার স্ত্রীকে নিয়ে কটূক্তিতে ১ জন, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত ও কটূক্তির অভিযোগে ৩ জন এবং অন্যান্য ইস্যুতে ৩ জনকে আটক করা হয়। অন্যদিকে সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ-২০২৫-এর বিভিন্ন ধারায় পৃথক ৩টি মামলায় ১৭ জনকে অভিযুক্ত এবং ৩ জনকে আটক করা হয়েছে।
জুলাই মাসে ২৫৮ জন নারী ও কন্যা শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে ৯৫ জন ধর্ষণের শিকার হয় (৬১ জনই ১৮ বছরের কম বয়সী)। গণধর্ষণের শিকার হয়েছে ১১ জন নারী ও কন্যাশিশু।
যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছেন ৭৮ জন (যার মধ্যে শিশু ৪০ জন)। যৌতুকের জন্য নির্যাতনে ১ জন নিহত ও ৬ জন আহত হন। পারিবারিক সহিংসতার শিকার হয়ে নিহত ৪৫ জন, আহত ১০ জন এবং ২৩ জন নারী আত্মহত্যা করেছেন।
অন্যদিকে এ মাসে ১৮০ জন শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে ৩৪ জন প্রাণ হারিয়েছে এবং ১৪৬ জন শিশু শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছে।
শ্রমিক খাতের চিত্রে দেখা যায়, ৭৯টি শ্রমিক নির্যাতনের ঘটনায় ২৩ জন নিহত এবং ৭২ জন আহত হয়েছে। এ ছাড়া অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ ও সুরক্ষামূলক সরঞ্জামের অভাবে কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনায় ৫৫ জন শ্রমিক মারা গেছেন।
মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে এইচআরএসএসের নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম বলেন, ‘মাসজুড়ে রাজনৈতিক সহিংসতা, মব সহিংসতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ, সাংবাদিক নির্যাতন, নারী-শিশু ও শ্রমিক নির্যাতন এবং সীমান্তে সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মতামত প্রকাশকে কেন্দ্র করে গ্রেপ্তার ও হয়রানি নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। এসব সমাধান না হলে মানবাধিকার পরিস্থিতি আরো অবনতির দিকে যেতে পারে।’
ভোরের আকাশ/এনউব