হট্টগোল, প্ল্যাকার্ড হাতে স্লোগান বিরোধীদলের
কাঙ্ক্ষিত গণতন্ত্রের সংসদ শুরু

বাংলাদেশের জনগনের দীর্ঘদিনের কাঙ্ক্ষিত গণতন্ত্রের কেন্দ্রবিন্দু জাতীয় সংসদের যাত্রা শুরু হয়েছে গতকাল বৃহস্পতিবার। সংসদীয় রীতি অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে ভাষণ দেন। তারই ধারাবাহিকতায় অধিবেশন চলাকালে বিকেল ৩টা ৪০ মিনিটে সংসদের অধিবেশন কক্ষে রাষ্ট্রপতির আগমণ বার্তা ঘোষণা করেন স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ। বিক্ষোভের মধ্যে বিউগলের সুর বেজে ওঠে। অধিবেশন কক্ষে প্রবেশ করেন রাষ্ট্রপতি মো. শাহাবুদ্দিন। তিনি স্পিকারের ডান পাশে রাখা নির্ধারিত আসনের সামনে দাঁড়ান। তখন জাতীয় সংগীত বেজে ওঠে এবং অধিবেশন কক্ষের মনিটরে জাতীয় পতাকা প্রদর্শিত হয়। সরকার দলীয় সদস্যরা দাঁড়িয়ে শ্রদ্ধা জানালেও বিরোধী জোটের সদস্যরা বসে পড়েন। প্রথমে বিরোধীদলীয় সদস্যরা বসে থাকলেও জাতীয় সংগীতের মাঝ পর্যায়ে বিরোধীদলীয় সদস্যরাও দাঁড়ান। রাষ্ট্রপতির ভাষণদানকালে বিরোধী সদস্যরা বিক্ষোভ শুরু করেন। ফ্যাসিবাদ-গণতন্ত্র একসঙ্গে চলবে না: সংসদে হট্টগোল, প্ল্যাকার্ড হাতে স্লোগান দেন। পরে অধিবেশন কক্ষ থেকে ওয়াকআউড বিরোধীদলের সংসদ সদস্যরা।
সংসদ সচিবালয়ের সূত্রে জানা গেছে, গতকাল সকাল ১১টা ৫ মিনিটে কোরআন তিলাওয়াতের মধ্য দিয়ে সংসদ অধিবেশন শুরু হয়েছে। এরআগে সকাল ১০টা ৫৫ মিনিটে সংসদ অধিবেশন কক্ষে প্রবেশ করেন সংসদ নেতা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। জাতীয় সংসদের অধিবেশনে তারেক রহমান এই প্রথম সংসদ সদস্য হিসেবে প্রবেশ করেন। এ সময়ে সরকার ও বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা টেবিল চাপড়ে অভিনন্দন জানান সংসদ নেতাকে। সংসদ নেতাসহ অধিবেশন কক্ষ যখন ভরপুর সেই সময়টিতে স্পিকারের চেয়ার ফাঁকা ছিল। সংসদের প্রথম অধিবেশন বলে স্পিকারের চেয়ারের পাশে রাখা হয় রাষ্ট্রপতির চেয়ার। অধিবেশন শুরুতে সংসদ সচিবালায়ের সচিব কানিজ মাওলা কার্যক্রমের সূচনা করেন। এরপর সূচনা বক্তব্য রাখেন সংসদ নেতা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
সংসদ নেতা তারেক রহমান দাঁড়িয়ে সংসদ অধিবেশনকে সভাপতিত্ব করার জন্য প্রবীণ সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসনকে সভাপতি হিসেবে নাম প্রস্তাব করেন। তারেক রহমানের প্রস্তাবে বিএনপির মহাসচিব, স্থানীয় সরকারমন্ত্রী ও সংসদ সদস্য মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর পূর্ণ সমর্থন জানান। এরপর সংসদে বিরোধী দলীয় উপনেতা জামায়াতের নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের এই অধিবেশনে সভাপতিত্ব করার জন্য খন্দকার মোশাররফ হোসেনের নাম প্রস্তাবকে সমর্থন জানান। অধিবেশন কক্ষে উপস্থিত সংসদ সদস্যরা টেবিল চাপড়ে এই প্রস্তাবকে সমর্থন করলে সরকারির দলের প্রথম সারি থেকে খন্দকার মোশাররফ হোসেন সভাপতির দায়িত্বভার গ্রহন করেন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও প্রবীণ রাজনীতিবিদ ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন এমপি। দায়িত্ব পালনের সুযোগ দেওয়ায় প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমানসহ সকল সংসদ সদস্যের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান অধিবেশনের সভাপতি ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন। তার সভাপতিত্বে নতুন স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। জাতীয় সংসদের স্পিকার হিসেবে মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ (বীর বিক্রম) এবং ডেপুটি স্পিকার হিসেবে ব্যারিস্টার কায়সার কামাল নির্বাচিত হন। দুপুর ১২টার পর জাতীয় সংসদে রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ে নতুন স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারকে শপথবাক্য পাঠ করান রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। স্পিকার নির্বাচিত হওয়ার পর বিএনপির স্থায়ী কমিটির পদ থেকে সরে দাঁড়ান জাতীয় সংসদের নবনির্বাচিত স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ।
নতুন স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারকে নিরপেক্ষ থেকে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমান। জাতীয় সংসদের নবনির্বাচিত স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ তার প্রথম অধিবেশনের বক্তব্যে বলেন, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের প্রাণকেন্দ্র হবে জাতীয় সংসদ। এরপর বিরোধী দলের প্রধান জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান তার বক্তব্যে বলেন, আপনি ইতোমধ্যে বিএনপি থেকে পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন। এখন আপনি সবার।
শোকপ্রস্তাব উত্থাপন: অধিবেশনে সভাপতিত্বের আসনে বসা নবনির্বাচিত স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীরবিক্রম দিনের কার্যসূচি অনুযায়ী শোকপ্রস্তাব উত্থাপন করেন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াসহ দেশি-বিদেশি বিশিষ্টজন এবং ৩১ জন সাবেক সংসদ সদস্যের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করে শোকপ্রস্তাব গ্রহণ করা হয়েছে। শোকপ্রস্তাবে বলা হয়, ২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর দেশ হারিয়েছে তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী এবং গণতন্ত্রের আপসহীন নেত্রী খালেদা জিয়াকে। মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় নারী প্রধানমন্ত্রী এবং জাতীয় সংসদের সাবেক বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে দেশের গণতন্ত্র রক্ষায় তার অবদান চিরস্মরণীয়। জাতীয় সংসদ তার মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছে। বাংলাদেশি নেতাদের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অঙ্গনের কয়েকজন প্রভাবশালী নেতার মৃত্যুতে শোকপ্রস্তাব গ্রহণ করা হয়। এ তালিকায় রয়েছেন ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং, ক্যাথলিক খ্রিস্টানদের প্রধান ধর্মগুরু পোপ ফ্রান্সিস এবং ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি।
এছাড়া অধিবেশনে সাবেক রাষ্ট্রপতি ও বিকল্পধারা বাংলাদেশের সাবেক সভাপতি এ. কিউ. এম. বদরুদ্দোজা চৌধুরীসহ মোট ৩১ জন সাবেক সংসদ সদস্যের মৃত্যুতে শোকপ্রস্তাব আনা হয়। উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক সংসদ উপনেতা মতিয়া চৌধুরী, সাবেক সেনাপ্রধান কে. এম. সফিউল্লাহ, সাবেক মন্ত্রী আবদুল্লাহ আল নোমান, গণফোরাম নেতা মোস্তফা মোহসীন মন্টু, বীর মুক্তিযোদ্ধা এ কে খন্দকার এবং রমেশ চন্দ্র সেনসহ মোট ৩১ জন বরেণ্য রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। শোক প্রস্তাবের ওপর সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে নিয়ে আলোচনা হয়। এরপর শহীদ জুলাই যোদ্ধাদের নিয়ে আলোচনা হয়। শোক প্রস্তাবে জুলাই যোদ্ধাদের নিয়ে আলোচনা করেন সংসদ সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, নাহিদ ইসলাম, জোনায়েদ সাকি ও শহীদউদ্দিন চৌধুরী অ্যানি। আলোচনার পর সংসদ সদস্যরা দাঁড়িয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করেন। খালেদা জিয়া ও জুলাই যোদ্ধাদের শোকপ্রস্তাব নিয়ে আলোচনার পর শোকপ্রস্তাব গৃহীত হলো বলে ঘোষণা দেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ।
রাষ্ট্রপতির ভাষন ও ওয়াকআউড বিরোধীদলের: সংসদীয় রীতি অনুযায়ী স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনকে ভাষণ দেওয়ার জন্য অনুরোধ জানান। ঠিক সেই মুহূর্তেই বিরোধী দলের বেঞ্চে থাকা জামায়াত সংসদ সদস্যরা নিজ নিজ আসনে দাঁড়িয়ে যান। তাদের হাতে থাকা বিভিন্ন প্ল্যাকার্ড তারা স্পিকার ও রাষ্ট্রপতির দিকে উঁচিয়ে ধরেন। প্ল্যাকার্ডগুলোতে লেখা ছিল- ‘জুলাই নিয়ে গাদ্দারি চলবে না’, ‘জুলাইয়ের সঙ্গে বিশ্বাসভঙ্গ বন্ধ করো’সহ চব্বিশের বিপ্লবের চেতনা সংবলিত বিভিন্ন স্লোগান।
এ সময় সংসদ কক্ষজুড়ে শোরগোল ও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বিরোধী দলের সদস্যদের শান্ত থাকার এবং সংসদীয় শৃঙ্খলা বজায় রাখার বারবার অনুরোধ জানান। তবে বিরোধীদের এই প্রতিবাদ ও হট্টগোলের মধ্যেই রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন অধিবেশনে প্রবেশ করেন এবং স্পিকারের নির্ধারিত আসনের পাশে আসন গ্রহণ করেন। জামায়াত সংসদ সদস্যদের ক্রমাগত হইচই ও প্রতিবাদের মুখেই তিনি সংবিধান অনুযায়ী তার নির্ধারিত ভাষণ পাঠ শুরু করেন। সামাজিক, প্রযুক্তি, অর্থনৈতিক, আইনশৃঙ্খলা বিভিন্ন ক্ষেত্রে সরকারের নেওয়া নানা পদক্ষেপের কথা তুলে ধরেন রাষ্ট্রপতি। ভাষণ শেষে তিনি সংসদ অধিবেশন ছেড়ে যান। আগামী ১৫ মার্চ পর্যন্ত সংসদ মুলতবি করা হয়।
দর্শকসারিতে প্রধানমন্ত্রীর পরিবারের সঙ্গে ড. ইউনূস: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে যোগ দেন বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসসহ বিভিন্ন অঙ্গনের বিশিষ্টজনরা। এদের মধ্যে রয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান ও কন্যা জাইমা রহমানও। অধিবেশনে স্পিকারের দুই পাশের ভিভিআইপি লাউঞ্জসহ চারপাশের দর্শক গ্যালারিগুলোতে উপস্থিত হন আমন্ত্রিত অতিথিরা। দর্শকসারিতে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস, জুবাইদা রহমান ও ব্যারিস্টার জাইমা রহমানের পাশাপাশি প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দীন, সাবেক আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুলকে দেখা যায়।
ভিভিআইপি লাউঞ্জে ডান পাশের গ্যালারিতে আরও উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মিণী জুবাইদা রহমানের মা সৈয়দা ইকবাল মান্দবানু, প্রয়াত আরাফাত রহমান কোকোর সহধর্মিণী শামিলা রহমান সিঁথি, বেগম খালেদা জিয়ার ছোট ভাই শামীম ইস্কান্দার, তার স্ত্রী কানিজ ফাতেমা এবং ডা. জুবাইদা রহমানের বড় বোন শাহিনা খান বিন্দু। এ ছাড়া আরও উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা এ টি এম শামছুল ইসলাম, সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, নৌবাহিনী প্রধান অ্যাডমিরাল এম নাজমুল হাসান, বিমানবাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খাঁন প্রমুখ।
ভিভিআইপি লাউঞ্জে বাম পাশের গ্যালারিতে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিসেন্টসেন, যুক্তরাজ্যের হাইকমিশনার সারাহ কুক, চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন, ভারতের হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মা, পাকিস্তানের হাইকমিশনার ইমরান হায়দারসহ বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত-হাইকমিশনাররা উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানে শহীদ গোলাম নাফিজকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় রিকশায় হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া রিকশাচালক নুর মুহাম্মদও গ্যালারিতে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন।
যান্ত্রিক গোলযোগ অধিবেশনের শুরুই: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে স্পিকারের মাইকে হঠাৎ যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেওয়ায় অধিবেশন শুরুই করতে পারেননি স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ। এ সময় তিনি বিরতি ঘোষণা করেন। গতকাল সংসদ স্পিকার নির্বাচিত হয়ে শপথ নেওয়ার পর প্রথম অধিবেশনে সভাপতিত্ব করতে আসেন তিনি। কিন্তু মাইকে সমস্যার কারণে স্পিকার দুই মিনিটের সময় চান। এরপর যোহরের আযান শুনে তিনি ২০ মিনিটের বিরতি দেন। এদিনের নির্ধারিত অধিবেশন শুরুর কিছুক্ষণের মধ্যেই স্পিকারের মাইক্রোফোনে সমস্যা দেখা দেয়। স্পিকার কথা বলতে গেলে শব্দ বিভ্রাট এবং সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঘটনা ঘটে। সংসদ সচিবালয়ের কারিগরি দল দ্রুত মেরামতের চেষ্টা করলেও তাৎক্ষণিকভাবে সমস্যার সমাধান করা সম্ভব হয়নি।
স্পিকার অধিবেশনে যোগ দিয়ে বলেন, এই মহান সংসদের স্পিকার নির্বাচিত করার জন্য আমি প্রতিটি সংসদ সদস্যকে আমার আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। বর্তমানে একটি যান্ত্রিক গোলযোগের কারণে আমার কথা স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে না, তাই আমাদের কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে। আমার মূল মাইকটি বর্তমানে অকেজো থাকায় আমি হ্যান্ড মাইকে কথা বলছি। আশা করি, মূল মাইকটি শিগগিরই ঠিক হয়ে যাবে।
তিনি বলেন, আপনারা একটু ধৈর্য ধরুন। দীর্ঘ ১৭ বছর পর আমরা একটি কার্যকর সংসদ পেয়েছি। এই সংসদ গণতান্ত্রিক বক্তব্য শুনতে অভ্যস্ত, তাই কিছুটা অনভ্যস্ততা থাকতে পারে। আশা করি, দ্রুতই এই পরিস্থিতির অবসান হবে। সকাল থেকে সবকিছু ঠিকঠাক চললেও এখন হঠাৎ এই বিপত্তি দেখা দিয়েছে।
স্পিকার জানান, প্রকৌশলীরা জানিয়েছেন, দুই মিনিটের মধ্যেই যান্ত্রিক ত্রুটি সংশোধন হয়ে যাবে। তবে যেহেতু এখন আযানের সময় হয়েছে, তাই নামাজের সুবিধার্থে আমি অধিবেশন ২০ মিনিটের জন্য বিরতি ঘোষণা করছি। ধন্যবাদ।
খামেনির মৃত্যুতে সংসদে শোকপ্রস্তাব: ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা ও শিয়া মুসলিম ধর্মগুরু আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ আলী হোসেইনী খামেনির মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছে বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ। গতকাল ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের অধিবেশনে এই শোকপ্রস্তাব সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়। অধিবেশনের শুরুতেই আয়াতুল্লাহ খামেনির কর্মময় জীবন ও রাজনৈতিক সংগ্রামের ওপর ভিত্তি করে একটি বিস্তারিত শোকপ্রস্তাব উত্থাপন করা হয়। প্রস্তাবে বলা হয়, খামেনির মৃত্যুতে বিশ্ব একজন মহান নেতা, বিচক্ষণ ব্যক্তিত্ব ও প্রভাবশালী ধর্মীয় নেতাকে হারিয়েছে। তার বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করে শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি আন্তরিক সহমর্মিতা প্রকাশ করে সংসদ।
শোকপ্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়, ১৯৩৯ সালের ১৯ এপ্রিল ইরানের মাশহাদে জন্মগ্রহণ করেন আলী খামেনি। ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি ৮৬ বছর বয়সে তিনি শাহাদাৎ বরণ করেন। তার মৃত্যুতে ইরানে ৭ দিনের সরকারি ছুটি ও ৪০ দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করা হয়েছে। তার শিক্ষাজীবন ও রাজনৈতিক উত্থান নিয়ে বলা হয়, মাশহাদের ইসলামী বিদ্যালয়ে প্রাথমিক শিক্ষা শেষে তিনি নাজাফ ও কোমের উচ্চতর শিক্ষা কেন্দ্রে ধর্মতাত্ত্বিক পড়াশোনা করেন। সেখানে থাকাকালীন আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির সান্নিধ্যে আসেন এবং শাহ শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনে জড়িয়ে বেশ কয়েকবার কারাবরণ করেন। ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর খামেনি ইরানের রাষ্ট্রীয় কাঠামো গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তিনি ১৯৮০ সালে প্রতিরক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন এবং ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় ইসলামী বিপ্লবী বাহিনীর (আইআরজিসি) তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে কাজ করেন। ১৯৮৯ সালে খোমেনির মৃত্যুর পর তিনি ইরানের সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচিত হন। তার অধীনে আইআরজিসি একটি শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়।
সংসদীয় রেওয়াজ অনুযায়ী, এই শোকপ্রস্তাবটি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ভাষান্তর করে ইরানের প্রয়াত নেতার শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের কাছে প্রেরণ করা হবে।
কড়া নিরাপত্তায় সংসদের প্রথম অধিবেশন: কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও কঠোর নজরদারির মধ্য দিয়ে আজ বসতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন। অধিবেশনকে ঘিরে সংসদ ভবন ও আশপাশের এলাকায় নেওয়া হয়েছে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ব্যবস্থা। এরই মধ্যে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সংসদ সদস্য, কুটনীতিকবৃন্দ এবং আমন্ত্রিত অতিথিরা সংসদ ভবনে আসতে শুরু করেছে। গতকাল সকাল ৭টা থেকেই জাতীয় সংসদ এলাকা ও আশপাশের সড়কে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। সংসদ ভবনের বিভিন্ন গেটে পুলিশ, সেনাবাহিনী ও বিজিবি সদস্যরা চৌকি বসিয়ে সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন। প্রবেশপথে তল্লাশি ও কঠোর নজরদারি চালানো হচ্ছে। সংসদ ভবনে প্রবেশের ক্ষেত্রে কর্মকর্তা-কর্মচারীদেরও কড়া যাচাই-বাছাইয়ের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। সন্দেহজনক মনে হলে জিজ্ঞাসাবাদও করা হচ্ছে। নিরাপত্তার অংশ হিসেবে সকাল থেকেই ফার্মগেটের খামারবাড়ি মোড় থেকে মিরপুরমুখী সড়ক বন্ধ রাখা হয়েছে। এছাড়া বিজয় সরণি মেট্রো স্টেশন থেকে ফার্মগেটমুখী সড়কে যান চলাচল সীমিত করা হয়েছে।
ভোরের আকাশ/এসএইচ