দাম নির্ধারণের পরও এলপিজি সংকট, ভোগান্তিতে গ্রাহক

সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে ৩৬৩ থেকে ৬৬৩ টাকা বেশি নিচ্ছেন বিক্রেতারা। সরবরাহ ঘাটতির পাশাপাশি অপারেটর ও ডিলার পর্যায়েও বাড়তি দাম নেওয়ার অভিযোগ।
সরকারিভাবে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) দাম নির্ধারণ করেও বাজারের অস্থিরতা নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছে না। দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে চলা সংকটের মধ্যে নতুন করে দাম নির্ধারণ করা হলেও নির্ধারিত মূল্যে রান্নার গ্যাস পাচ্ছেন না গ্রাহকেরা। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) নির্ধারিত ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ৮৩৭ টাকা। অথচ বাজারে তা বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকায়। সরবরাহ ঘাটতির পাশাপাশি আমদানি থেকে খুচরা বিক্রি পর্যন্ত সরবরাহব্যবস্থার বিভিন্ন স্তরে বাড়তি দাম নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে দেশের বিভিন্ন এলাকায় একই পরিস্থিতি দেখা গেছে। গ্রাহকদের অভিযোগ, সরকার দাম নির্ধারণ করলেও সেই দামে গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। অন্যদিকে ব্যবসায়ীদের দাবি, সরবরাহ সংকট ও অপারেটর পর্যায়ে বেশি দামে সিলিন্ডার কেনার কারণে তাঁদেরও বাড়তি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে।
নির্ধারিত দামের চেয়ে ৬৬৩ টাকা বেশি
রাজধানীর হাতিরপুল এলাকার এক গ্রাহক জানান, গত ২ অক্টোবর ৫০ টাকা ডেলিভারি চার্জসহ ১২ কেজির একটি সিলিন্ডার কিনতে তাঁর খরচ হয়েছে ২ হাজার ৫০০ টাকা। অথচ ওই সময় সিলিন্ডারটির সরকার নির্ধারিত দাম ছিল ১ হাজার ৫৮৫ টাকা।
বাড়তি দামে বিক্রির বিষয়টি স্বীকার করে ওই বিক্রেতা জানান, সরবরাহ সংকটের কারণে তাঁরও খরচ বেড়েছে। সর্বশেষ কেনা সিলিন্ডারপ্রতি তাঁর খরচ পড়েছে ২ হাজার টাকা। সেটি তিনি সর্বোচ্চ ২ হাজার ৩০০ টাকায় বিক্রি করছেন।
রাজধানীর মিরপুরেও একই চিত্র দেখা গেছে। সেখানে এক দোকানি ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম চেয়েছেন ২ হাজার ৪০০ টাকা।
মুন্সীগঞ্জের বিক্রেতা জাকির হোসেন জানান, গত ২০ সেপ্টেম্বরের পর তিনি আর গ্যাস পাননি। নতুন করে কবে গ্যাস সরবরাহ করা হবে, সে বিষয়ে ডিলারও নিশ্চিত করে কিছু জানাতে পারেননি। তবে নতুন সিলিন্ডার পেলে সেটির দাম পড়বে ২ হাজার ২০০ টাকা বলে জানান তিনি।
সরবরাহব্যবস্থার বিভিন্ন স্তরে বাড়তি দামের অভিযোগ
বিইআরসির নির্ধারিত মূল্য অনুযায়ী, অপারেটর কোম্পানির কাছ থেকে একজন ডিলার বা পরিবেশকের ১২ কেজির সিলিন্ডার কেনার কথা ১ হাজার ৭৪২ টাকায়। ডিলারের মুনাফা ৫০ টাকা এবং খুচরা বিক্রেতার মুনাফা ৪০ টাকা ধরে গ্রাহক পর্যায়ে সিলিন্ডারটির দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ১ হাজার ৮৩৭ টাকা।
কিন্তু বাস্তবে ডিলার পর্যায়েই নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি অর্থ নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
মুন্সীগঞ্জের গ্রিন এলপিজির ডিলার মোজাম্মেল জানান, গত ১৮ সেপ্টেম্বরের পর তাঁর কাছে আর গ্যাস সরবরাহ করা হয়নি। নতুন দাম নির্ধারণের পরও অপারেটর তাঁর কাছে প্রতি সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ৯৯০ টাকা চেয়েছে। অথচ নির্ধারিত মূল্য ১ হাজার ৭৪২ টাকা।
মোজাম্মেলের দাবি, সরবরাহ সংকটের কারণে সেপ্টেম্বরে ২০ হাজার সিলিন্ডার বিক্রির বিপরীতে তিনি সর্বোচ্চ ২ হাজার সিলিন্ডার পেয়েছেন। গ্যাসবাহী গাড়ি কয়েক দিন ধরে মোংলায় আটকে থাকায় পরিবহন ব্যয়ও বেড়েছে। এসব খরচ সামাল দিতে তাঁকে প্রতি সিলিন্ডার ২ হাজার ২০০ টাকা দরে বিক্রির প্রয়োজন হচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি।
এলপিজি ব্যবসায়ী সমিতিও অপারেটর পর্যায়ে বাড়তি দাম নেওয়ার অভিযোগ তুলে বিইআরসিকে চিঠি দিয়েছে। সমিতির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নতুন মূল্য নির্ধারণের পর বিভিন্ন অপারেটর ডিলারদের প্রতি সিলিন্ডার ১ হাজার ৭৪০ থেকে ২ হাজার টাকা পর্যন্ত দামে সরবরাহের প্রস্তাব দিয়েছে। তবে কয়েকটি কোম্পানি নির্ধারিত দামের চেয়ে কম দামেও সিলিন্ডার দিচ্ছে বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
সমিতির সভাপতি মো. সেলিম খান বিবিসি বাংলাকে বলেন, অপারেটরদের বাড়তি দাম এবং পরিবহনসহ অন্যান্য খরচ বেড়ে যাওয়ায় ডিলাররা নির্ধারিত দামে সিলিন্ডার বিক্রি করতে পারছেন না। তাঁর দাবি, এভাবে ব্যবসা চালিয়ে গেলে অনেক পরিবেশক পুঁজি হারাবেন এবং ঋণ পরিশোধেও সমস্যায় পড়বেন।
আমদানি প্রায় একই, তবু কেন সংকট?
বাংলাদেশে এলপিজির ৯৮ শতাংশের বেশি বেসরকারি কোম্পানির মাধ্যমে আমদানি করা হয়। বিইআরসির তথ্য অনুযায়ী, দেশে ৩২ থেকে ৩৩টি কোম্পানির লাইসেন্স থাকলেও এলপিজি আমদানি করছে ১০ থেকে ১২টি কোম্পানি।
এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, গত সেপ্টেম্বরে দেশে ১ লাখ ৫৬ হাজার মেট্রিক টন এলপিজি আমদানি হয়েছে। আগস্টে আমদানির পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৫৮ হাজার মেট্রিক টন। অর্থাৎ দুই মাসে আমদানির পরিমাণ প্রায় একই থাকলেও বাজারে সরবরাহ সংকট কেন তৈরি হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
আমদানিকারক ও অপারেটরদের কেউ কেউ বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম, পরিবহন ব্যয় ও প্রিমিয়াম বেড়ে যাওয়ায় এলপিজির খরচ বেড়েছে। আবার যেসব কোম্পানি নিজেরা আমদানি না করে অন্য অপারেটরদের কাছ থেকে গ্যাস কিনে বোতলজাত করে, তারাও পর্যাপ্ত সরবরাহ পাচ্ছে না বলে অভিযোগ করেছে।
গ্রিন এলপিজির মহাব্যবস্থাপক (জিএম) আহসান হাবিব হিরো বিবিসি বাংলাকে জানান, তাঁর প্রতিষ্ঠান গত দুই বছর ধরে সরাসরি এলপিজি আমদানি করছে না। অন্য অপারেটরদের কাছ থেকে গ্যাস কিনে বোতলজাত করে সরবরাহ করে তারা। সেপ্টেম্বরে ২ হাজার টন চাহিদার বিপরীতে মাত্র ১৫০ টন গ্যাস পেয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
অন্যদিকে, এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক দাবি করেন, আমদানির কোটা এবং লাইসেন্স পেতে বিভিন্ন অনুমোদনের বাধ্যবাধকতা সরবরাহব্যবস্থাকে জটিল করেছে। দীর্ঘমেয়াদি আমদানি চুক্তির সুযোগ সীমিত থাকায় আন্তর্জাতিক বাজার থেকে গ্যাস সংগ্রহের খরচও বেড়েছে বলে জানান তিনি।
তবে আমদানির পরিমাণের সঙ্গে বাজারে সরবরাহ ঘাটতির সম্পর্ক এবং কোথাও মজুত করে বাড়তি মুনাফা করা হচ্ছে কি না, সে বিষয়ে প্রশ্নের নিষ্পত্তি হয়নি। কয়েকটি কোম্পানি বিজ্ঞাপন দিয়ে মজুতের অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
নির্ধারিত দাম কার্যকর করতে অভিযান
এলপিজির নির্ধারিত দাম কার্যকর করতে জ্বালানি মন্ত্রণালয় দেশের সব জেলা প্রশাসককে নির্দেশনা দিয়েছে। জেলা প্রশাসকেরা ডিলারদের সঙ্গে আলোচনা করার পাশাপাশি বিভিন্ন স্থানে অভিযানও পরিচালনা করছেন।
অন্যদিকে, বিইআরসি জানিয়েছে, আমদানির তথ্য বিশ্লেষণ করে সংকটের কারণ অনুসন্ধানে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। মাঠপর্যায়ে পরিদর্শনের মাধ্যমে পরিস্থিতি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তবে আমদানি, বোতলজাতকরণ, পরিবেশক ও খুচরা বিক্রির বিভিন্ন স্তরে বাড়তি দামের অভিযোগের মধ্যেও সাধারণ গ্রাহকের ভোগান্তি কমেনি। সরকার নির্ধারিত দাম থাকলেও সেই মূল্যে রান্নার গ্যাস না পাওয়ায় কার্যত কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকছে মূল্যনিয়ন্ত্রণ। সংকটের প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান, সরবরাহব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং নির্ধারিত দাম কার্যকর করাই এখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
ভোরের আকাশ/জেআ