বহুমুখী চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে নতুন সরকার

সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এরপর দিন অর্থাৎ ১৩ ফেব্রুয়ারি নতুন সরকার পেতে পারে বাংলাদেশ। কিন্তু এই সরকার শপথ নেওয়ার পরই বহুমুখী চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হবে। নির্বাচনের সপ্তাহখানেক পরেই শুরু হবে পবিত্র রমজান মাস। সাধারণত এই সময়ে দেশে পণ্যের দাম অনেক বেড়ে যায়। এতে ভোগান্তি পড়েন দেশের মানুষ। নতুন সরকারের প্রথম চ্যালেঞ্জ হবে বাজার দর নিয়ন্ত্রণ। যদিও এরই মধ্যে অনেক পণ্যের দাম বেড়ে গেছে।
এদিকে অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরে দেশে কর্মসংস্থান হয়নি বললেই চলে। উল্টো অনেক কলকারাখানা বন্ধ হয়ে গেছে। বেকার বেড়েছে এক লাখ ৬০ হাজার। ফলে নতুন কর্মসংস্থানে গুরুত্ব দিতে হবে সরকারকে। যদিও বিএনপি ও জামায়াত সরকারে গেলে বিপুল কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে বলে জানিয়েছে। নতুন সরকারের জন্য আরেকটি চ্যালেঞ্জ হবে পে-স্কেল বাস্তবায়ন। ১০৫ শতাংশ বেতন-ভাতা বাড়িয়ে পে-কমিশন প্রতিবেদন দাখিল করেছে।
অন্তর্বর্তী সরকার বলছে, নতুন সরকার এটা চাইলে বাস্তবায়ন করতে পারে। পে-স্কেল বাস্তবায়ন দাবিতে আন্দোলন শুরু হয়ে গেছে। অনেক স্থানে সরকারি কর্মচারীরা বিক্ষোভ করছেন। পে-স্কেল বাস্তবায়ন করতে যে বিপুল অর্থ লাগবে, সেই সংস্থান নেই। সুতরাং এটা বাস্তবায়ন করতে নতুন সরকারকে হিমশিম খেতে হবে। সেটা বাস্তবায়ন না হলে প্রথম দিকেই আন্দোলনের মুখে পড়বে সরকার। এডিপি বাস্তবায়ন তলানিতে পড়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে এডিপি বাস্তবায়ন হয়েছে মাত্র ১১ দশমিক ৭৫ শতাংশ। এর প্রভাব পড়েছে কর্মসংস্থান, অভ্যন্তরীণ চাহিদা এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে। চলতি অর্থবছরের প্রথম ৫ মাসে রাজস্ব ঘাটতি রয়েছে ২৪ হাজার কোটি টাকার বেশি।
নতুন বেকার ১ লাখ ৬০ হাজার: এক বছরের ব্যবধানে বেকার বেড়েছে এক লাখ ৬০ হাজার। ২০২৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বেকার সংখ্যা ২৬ লাখ ২০ হাজারে; যা ২০২৩ সালে ছিল ২৪ লাখ ৬০ হাজার। বেকারের মধ্যে ১৩ দশমিক ৫৪ শতাংশ স্নাতক ডিগ্রিধারী। এ ছাড়া দেশে কর্মে নিয়োজিত জনগোষ্ঠী কমেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) প্রকাশিত শ্রমশক্তি জরিপ ২০২৪’র চূড়ান্ত প্রতিবেদনে এসব তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদন বলছে, বেকারদের মধ্যে সর্বোচ্চ ১৩ দশমিক ৫৪ শতাংশ বিশ^বিদ্যালয় থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেছেন। উচ্চ মাধ্যমিক শেষ করা বেকারের ৭ দশমিক ১৩ শতাংশ। মাধ্যমিক পর্যায়ের পড়ালেখা শেষ করাদের হার ১ দশমিক ৯৬ শতাংশ। আনুষ্ঠানিক শিক্ষা নেই- বেকারত্ব ১ দশমিক ২৫ শতাংশ।
বন্ধ ৩৫৩ গার্মেন্টস: পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ বলছে, ১৪ মাসে সাভার, গাজীপুর, চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ ও নরসিংদীতে ৩৫৩টি কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে এক লাখ ১৯ হাজার ৮৪২ জন শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। সবচেয়ে বড় ধাক্কা লেগেছে সাভারে। সেখানে ২১৪টি কারখানা বন্ধ হয়েছে। এগুলোর মধ্যে ১২২টি স্থায়ীভাবে এবং ৯২টি অস্থায়ীভাবে বন্ধ। প্রায় ৩১ হাজার শ্রমিক কাজ হারিয়েছেন। গাজীপুরে ৭২টি কারখানা বন্ধ হয়ে ৭৩ হাজারেরও বেশি শ্রমিক বেকার হয়েছেন; যেখানে বেক্সিমকো গ্রুপের ১৩টি পোশাক কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হওয়া বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা দিয়েছে।
পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান বাবু বলেন, আমরা আসলে এক ধরনের অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। একেবারে যে খুব খারাপ অবস্থায় চলে গেছি, বিষয়টি এমন না। তবে এই ১৪ মাসে আরো ভালো করার সুযোগ ছিল। বিশেষ করে চীন ও ভারতের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের ফলে আমরা বেশ কিছু সুবিধা পেতে পারতাম। কিন্তু সেই সুযোগ আমরা হাতছাড়া করেছি। বিশেষ করে এক ধরনের অভিভাবক শূন্য অবস্থায় আমরা আছি। প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে দেখা করার জন্য আমরা বারবার চিঠি দিয়েছি; কিন্তু সেখান থেকে কোনো সদুত্তর বা দেখা করার সুযোগ পাইনি।
মূল্যস্ফীতি ও রমজানের বাজার: বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, গত নভেম্বর মাসে সার্বিক মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ২৯ শতাংশে। কয়েক মাস ধরে কিছুটা ওঠানামা হলেও মূল্যস্ফীতি আট শতাংশের ঘরেই অবস্থান করছে। সামনে রমজান মাস। খাদ্যপণ্যের দাম আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। নতুন সরকারের জন্য প্রথম বড় ধাক্কা হতে পারে এটি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারি ব্যয় বাড়ানো, বেতন-ভাতা বৃদ্ধির প্রত্যাশা এবং বাজার ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দিতে পারে।
উন্নয়ন ব্যয় ও বিনিয়োগে স্থবিরতা: অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সরকারি পরিচালন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। জনপ্রশাসনে সাধারণ ও ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি, বিভিন্ন ভাতা বৃদ্ধি, প্রশিক্ষণ কার্যক্রম সম্প্রসারণ এবং একাধিক কমিটি ও উদ্যোগের ফলে ব্যয়ের চাপ বেড়েছে। একইসঙ্গে নতুন বেতন কমিশন গঠনের কারণে সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে বেতন বৃদ্ধির প্রত্যাশাও তৈরি হয়েছে; যা ভবিষ্যতে ব্যয় আরও বাড়াতে পারে। উন্নয়ন ব্যয়ে দেখা দিয়েছে স্পষ্ট স্থবিরতা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়ন হয়েছে বরাদ্দের মাত্র ৬৭ দশমিক ৮৫ শতাংশ- যা দেড় দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে এডিপি বাস্তবায়ন হয়েছে মাত্র ১১ দশমিক ৭৫ শতাংশ। ফলে কর্মসংস্থান, অভ্যন্তরীণ চাহিদা এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে চাপ পড়েছে।
সাবেক অর্থসচিব মাহবুব আহমেদ বলেন, জিডিপি প্রবৃদ্ধি না বাড়লে কর্মসংস্থান বাড়বে না। এজন্য সরকারি-বেসরকারি উভয় বিনিয়োগই বাড়াতে হবে। তবে বিনিয়োগ বাড়াতে হলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি, প্রশাসনিক জটিলতা কমানো এবং নীতিগত স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা জরুরি। রাজনৈতিক বাস্তবতায় এগুলো সহজ কাজ নয়।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ’র (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, বিনিয়োগ না বাড়লে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে না। মানুষের প্রকৃত আয় বাড়বে না এবং বৈষম্য আরও গভীর হবে।
তিনি বলেন, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, অবকাঠামোগত দুর্বলতা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, কর ব্যবস্থার চাপ, উচ্চ সুদহার, চুক্তি বাস্তবায়নের দুর্বলতা এবং জ্বালানি সংকট বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত করছে।
রাজস্ব ঘাটতি: ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি হয়েছে প্রায় ৯২ হাজার ৬২৬ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে এনবিআরের লক্ষ্যমাত্রা ৪ লাখ ৯৯ হাজার কোটি টাকা। তবে প্রথম পাঁচ মাসেই লক্ষ্যের তুলনায় ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২৪ হাজার কোটি টাকার বেশি।
এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুল মজিদের মতে, রাজস্ব বোর্ড পুনর্গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও বাস্তবায়নের সুস্পষ্ট রোডম্যাপ না থাকায় কাক্সিক্ষত সংস্কার হয়নি। ফলে নিম্ন করভিত্তি, অস্বচ্ছ প্রশাসন এবং দুর্বল কর ব্যবস্থার মধ্যেই রাজস্ব আহরণ করতে হচ্ছে। এগুলো নতুন সরকারের জন্য বড় প্রতিবন্ধকতা হয়ে থাকবে।
ব্যাংক ও আর্থিক খাত: ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ ৬ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকার বেশি; যা মোট ঋণের ৩৬ শতাংশের বেশি। ১৭টি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ৫০ শতাংশের ওপরে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে একীভূত ব্যাংক; সেখানে সরকারের প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকার মূলধন সহায়তা। এই খাতকে পুনরুজ্জীবিত করা, আমানতকারীদের আস্থা ফেরানো এবং খেলাপি ঋণ আদায় নিশ্চিত করা নতুন সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) বলছে, নতুন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে বিনিয়োগ পুনরুদ্ধার ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ।
ঋণফাঁদের ঝুঁকি: সিপিডির সম্মানীয় ফেলো ড. মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, জাতীয় বাজেটে ঋণ পরিশোধ এখন দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ব্যয়ের খাতে পরিণত হয়েছে। এটা শিক্ষা খাতকেও ছাড়িয়ে গেছে। এতে ঋণফাঁদের ঝুঁকি বাড়ছে। বর্তমান মূল্যস্ফীতি সাময়িক নয়, এটি কাঠামোগত রূপ নিয়েছে। কেবল মুদ্রানীতি কঠোর করে খাদ্য মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। সরবরাহ পক্ষের সংস্কার, বাজার ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করা এবং সিন্ডিকেট ভাঙার মতো কঠোর পদক্ষেপ জরুরি।
বিশ্ববাজারের সুফল নেই দেশে: বিশ্ববাজারে চাল, চিনি ও ভোজ্যতেলের দাম কমেছে। তবে দেশের বাজারে এর প্রভাব পড়েনি। উল্টো অনেক পণ্যের দাম বেড়েছে। উৎপাদনে ঘাটতি না থাকার পরও চালের দাম উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। সিপিডির মতে, বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং প্রভাবশালী ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের কারণে ভোক্তারা আন্তর্জাতিক মূল্য কমার সুফল পাচ্ছেন না।
যা পাচ্ছে নতুন সরকার: একদিকে রিজার্ভ ও বিনিময় হারে কিছুটা স্থিতিশীলতা এসেছে; অপরদিকে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, কম বিনিয়োগ, রাজস্ব ঘাটতি, ব্যাংক খাতের গভীর ঝুঁকি এবং বাড়তে থাকা সামাজিক চাপ রয়েছে। রাজনৈতিক বাস্তবতা ও সামাজিক প্রত্যাশার মধ্যে ভারসাম্য রেখে অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধার হবে অন্যতম চ্যালেঞ্জ।
ভোরের আকাশ/এসএইচ