দাউদ আলীর টোকিও-লন্ডন অধ্যায় ঘিরে কূটনৈতিক মহলে আলোচনা

একই কূটনীতিক, দুই দেশ, দুই ভিন্ন সময়। ব্যবধান ১৭ বছরের।
২০০৯ সালে লন্ডন থেকে দেশে ফিরতে হয়েছিল দাউদ আলীকে। ১৭ বছর পর ২০২৬ সালে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জাপান সফরের আগে টোকিও থেকে ঢাকায় ফিরেছেন তিনি।
দুই ঘটনার প্রেক্ষাপট আলাদা হলেও তার কূটনৈতিক জীবনের এ দুটি অধ্যায় নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
জাপানে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত দাউদ আলীকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের টোকিও সফরের আগে ঢাকায় ফিরিয়ে আনার সিদ্ধান্ত ঘিরে কূটনৈতিক মহলে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
বিশেষ করে, যে রাষ্ট্রদূত জাপান সরকারের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর সফর নিয়ে আলোচনা ও সমন্বয়ের দায়িত্বে ছিলেন, সেই সফরের আগমুহূর্তে তাকে কেন ঢাকায় ফিরতে হলো, সে বিষয়ে এখনো সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
লন্ডন থেকে টোকিও: ২০০৯ সালে লন্ডনে বাংলাদেশ হাইকমিশনে কাউন্সেলর ও হেড অব চ্যান্সারি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন দাউদ আলী।
সে সময় বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে সহায়তার অভিযোগে তাকে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছিল। ওই ঘটনায় তার বিরুদ্ধে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই) একটি প্রতিবেদনও দেওয়া হয়েছিল। ওই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে তাকে ঢাকায় ফিরিয়ে আনা হয়। পরে তাকে ফরেন সার্ভিস অ্যাকাডেমির ভাইস প্রিন্সিপাল পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল।
সেই ঘটনার ১৭ বছর পর আবারও একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সময়ের আগে দেশে ফিরতে হলো তাকে। এবার তার কর্মস্থল জাপান। আর প্রেক্ষাপট প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের টোকিও সফর।
প্রধানমন্ত্রীর সফরের আগেই প্রত্যাবর্তন: জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির আমন্ত্রণে আগামী ২৬ থেকে ২৯ অক্টোবর জাপান সফর করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ২৭ অক্টোবর দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। সফরে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) বাস্তবায়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আলোচনায় আসতে পারে।
এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ সফরের আগে গত ১৫ অক্টোবর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের চিঠিতে দাউদ আলীকে ঢাকায় ফিরতে বলা হয়। নির্দেশনা অনুযায়ী তিনি দেশে ফিরেছেন। তার অনুপস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রীর সফরের প্রস্তুতি ও কূটনৈতিক সমন্বয়ের দায়িত্ব পালনের জন্য পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব (দ্বিপক্ষীয় বিষয়াবলি) নজরুল ইসলামকে টোকিও পাঠানো হয়েছে।
সাবেক ও বর্তমান কূটনীতিকদের কেউ কেউ উচ্চপর্যায়ের সফরের ঠিক আগে সংশ্লিষ্ট দেশের রাষ্ট্রদূতকে সরিয়ে রাখার বিষয়টিকে অস্বাভাবিক বলে মন্তব্য করেছেন। একজন সাবেক কূটনীতিক বাংলানিউজকে বলেন, কোনো দেশে প্রধানমন্ত্রীর সফরের প্রস্তুতি ও দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রদূতের অভিজ্ঞতা এবং স্থানীয় পরিস্থিতি সম্পর্কে ধারণা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, দুই দেশের সম্পর্কের বিভিন্ন দিক তিনি সবচেয়ে ভালো জানেন ও বোঝেন।
এদিকে দাউদ আলীকে ঢাকায় ফিরিয়ে আনার কারণ সম্পর্কে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আনুষ্ঠানিকভাবে এখনো কিছু জানায়নি। মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র শহীদুল করীম এ বিষয়ে অবগত নন বলে গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন।
টোকিও-লন্ডন অধ্যায় ঘিরে প্রশ্ন: দাউদ আলীর কূটনৈতিক জীবনের লন্ডন ও টোকিও অধ্যায় পাশাপাশি রাখলে একটি প্রশ্ন সামনে আসে—দুই ঘটনার মধ্যে কোনো যোগসূত্র রয়েছে, নাকি ভিন্ন পরিস্থিতিতে নেওয়া দুটি পৃথক প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের কাকতালীয় মিল এটি? তবে ২০০৯ সালের ঘটনা এবং ২০২৬ সালে জাপান থেকে তার প্রত্যাবর্তনের পরিস্থিতি এক নয়।
দাউদ আলী ২০২৪ সালের ১২ ডিসেম্বর জাপানে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এর আগে তিনি রোমানিয়ায় বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত ছিলেন। পররাষ্ট্র ক্যাডারের ১৫তম ব্যাচের এই কর্মকর্তা কূটনৈতিক জীবনে লন্ডন, টোকিও ও প্রিটোরিয়াসহ বিভিন্ন বাংলাদেশ মিশনে দায়িত্ব পালন করেছেন। চলতি বছরের ৭ ডিসেম্বর তার অবসরোত্তর ছুটিতে যাওয়ার কথা রয়েছে।
চাকরিজীবনের শেষ প্রান্তে এসে ১৭ বছর আগে লন্ডন থেকে প্রত্যাবর্তন এবং এবার টোকিও থেকে দেশে ফেরা-দাউদ আলীর কূটনৈতিক জীবনের এ দুটি ঘটনা নতুন করে আলোচনায় এসেছে। তবে এবার তাকে ফিরিয়ে আনার সিদ্ধান্তের প্রকৃত কারণ এখনো স্পষ্ট নয়।
ভোরের আকাশ/ এনউব