জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস আজ

সড়কে নিরাপদে চলাচল প্রত্যেক মানুষের অধিকার। কিন্তু বেপরোয়া গতি, ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং, ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন, চালকের অদক্ষতা ও ট্রাফিক আইন অমান্যের কারণে প্রতিদিনই ঘটছে দুর্ঘটনা। এসব দুর্ঘটনায় প্রাণহানির পাশাপাশি বহু মানুষ আহত হচ্ছেন, কেউ কেউ হারাচ্ছেন স্বাভাবিক জীবনযাপনের সক্ষমতা। এমন বাস্তবতায় আজ ২২ অক্টোবর পালিত হচ্ছে জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস।
এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য—‘নিরাপদ সড়ক, সমৃদ্ধ দেশ—সবার আগে বাংলাদেশ’। সড়ক দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি কমানো, ট্রাফিক আইন মেনে চলার গুরুত্ব তুলে ধরা এবং সড়ক ব্যবহারকারীদের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোই দিবসটির মূল লক্ষ্য।
প্রতিদিন প্রাণহানির উদ্বেগজনক চিত্র
বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন সংস্থার হিসাবে পার্থক্য রয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্চ, বাংলাদেশের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত ‘বাংলাদেশে স্বাস্থ্য ও দুর্ঘটনা জরিপ ২০২২-২৩’-এর তথ্যের ভিত্তিতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিদিন গড়ে ৬৬ জনের মৃত্যুর কথা বলা হয়েছে। তবে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) এবং বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার হিসাবে মৃত্যুর সংখ্যা আলাদা। জরিপের পদ্ধতি, তথ্য সংগ্রহের উৎস ও হিসাবের সময়সীমার কারণে এ পার্থক্য হতে পারে।
বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতির তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ১২ বছরে দেশে ৬৯ হাজার ৪৪৮টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৯৫ হাজার ৭৬১ জন নিহত হয়েছেন। অর্থাৎ সংগঠনটির হিসাবে এ সময়ে প্রতিদিন গড়ে ২২ জনের প্রাণ গেছে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত দুর্ঘটনার খবর পর্যবেক্ষণ করে এসব তথ্য সংকলন করেছে সংগঠনটি।
দুর্ঘটনার পেছনে যেসব কারণ
সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হিসেবে অতিরিক্ত গতি, বিপজ্জনকভাবে ওভারটেকিং, উল্টো পথে যানবাহন চালানো, চালকের ক্লান্তি ও অদক্ষতা, ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন এবং ট্রাফিক আইন না মানার বিষয়গুলো চিহ্নিত করা হয়। পাশাপাশি সড়কের নকশাগত ত্রুটি, অপর্যাপ্ত সড়কচিহ্ন, ফুটপাত দখল এবং পথচারীদের নিরাপদে রাস্তা পারাপারের সুযোগের অভাবও দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ায়।
বিশেষ করে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা, মহাসড়কে দ্রুতগতির যানবাহনের সংঘর্ষ এবং পথচারীদের চাপা পড়ার ঘটনা প্রায়ই প্রাণহানির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। হেলমেট ও সিটবেল্ট ব্যবহার না করা, চালকের পর্যাপ্ত বিশ্রাম না নেওয়া এবং গাড়ির ফিটনেস পরীক্ষা যথাযথভাবে না হওয়াও ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
নিরাপদ সড়ক গড়তে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ
সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে শুধু সচেতনতামূলক প্রচার নয়, ট্রাফিক আইন কার্যকরভাবে প্রয়োগ, চালকদের প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা যাচাই, যানবাহনের ফিটনেস নিশ্চিত করা এবং ঝুঁকিপূর্ণ সড়ক চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় সংস্কার জরুরি। একই সঙ্গে পথচারীদের জন্য ফুটপাত ও নিরাপদ পারাপারের ব্যবস্থা, পর্যাপ্ত সড়কবাতি এবং দুর্ঘটনাপ্রবণ স্থানে কার্যকর নজরদারি বাড়ানো প্রয়োজন।
দুর্ঘটনার পর দ্রুত জরুরি চিকিৎসা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ। মহাসড়কের পাশে জরুরি চিকিৎসাকেন্দ্রগুলো কার্যকর করা, অ্যাম্বুলেন্স সেবা জোরদার এবং হাসপাতালগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ালে আহতদের দ্রুত চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হবে।
সচেতনতাই হোক প্রতিদিনের অঙ্গীকার
সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব শুধু সরকার বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নয়; চালক, যাত্রী, পথচারীসহ প্রত্যেকেরই রয়েছে দায়িত্ব। নির্ধারিত গতিসীমা মেনে চলা, ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং এড়িয়ে যাওয়া, হেলমেট ও সিটবেল্ট ব্যবহার এবং ট্রাফিক সংকেত অনুসরণ করার মাধ্যমে দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমানো সম্ভব।
জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবসের মূল বার্তা হলো—সড়কে শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে সারা বছর। পরিকল্পিত অবকাঠামো, আইনের কার্যকর প্রয়োগ এবং নাগরিক সচেতনতার সমন্বয়েই সড়ক দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি কমিয়ে নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করা সম্ভব।
ভোরের আকাশ/জেআ