গুম কমিশনের প্রতিবেদন
নিখোঁজদের ৬৮ শতাংশ বিএনপির, ২২ শতাংশ জামায়াতের

প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে গুম সংক্রান্ত কমিশন অব ইনকোয়ারি।
প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং জানায়, রোববার (৪ জানুয়ারি) বিকেলে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রতিবেদন জমা দেয় কমিশন।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন কমিশনের সভাপতি বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী, সদস্য বিচারপতি মো. ফরিদ আহমেদ শিবলী, নূর খান লিটন, নাবিলা ইদ্রিস ও সাজ্জাদ হোসেন। আরও উপস্থিত ছিলেন উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান ও প্রধান উপদেষ্টার মুখ্যসচিব সিরাজউদ্দিন মিয়া।
কমিশন জানায়, মোট ১৯১৩টি অভিযোগ গুম তদন্ত কমিশনে জমা পড়ে। এর মধ্যে যাচাই-বাছাই শেষে ১৫৬৯টি অভিযোগ সংজ্ঞা অনুযায়ী গুম হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। এর মধ্যে ২৮৭টি অভিযোগ ‘মিসিং অ্যান্ড ডেড’ ক্যাটাগরিতে পড়েছে।
এখনো অনেকে অভিযোগ নিয়ে আসছেন জানিয়ে কমিশন সদস্য নাবিলা ইদ্রিস বলেন, গুমের সংখ্যা চার থেকে ছয় হাজার হতে পারে।
বলপূর্বক গুমের পেছনে মূলত রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল বলে জানিয়েছেন কমিশন সদস্যরা। তারা বলেন, আমরা যে ডেটা পেয়েছি, তা দিয়ে প্রমাণিত যে এটি পলিটিক্যালি মোটিভিটেড ক্রাইম।
প্রতিবেদন থেকে কমিশন জানায়, গুমের শিকার ব্যক্তিদের মধ্যে যারা জীবিত ফিরেছেন তাদের মধ্যে ৭৫ শতাংশ জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মী, ২২ শতাংশ বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মী। যারা এখনো নিখোঁজ তাদের মধ্যে ৬৮ শতাংশ বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মী ও ২২ শতাংশ জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মী।
হাই প্রোফাইল গুমের ঘটনায় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, শেখ হাসিনার প্রতিরক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিক, তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান সরাসরি সম্পৃক্ত ছিলেন বলে প্রমাণ পাওয়া গেছে।
এই মামলার মধ্যে উল্লেখযোগ্য বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী, হুম্মাম কাদের চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমেদ, চৌধুরী আলম, জামায়াত নেতা সাবেক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবদুল্লাহিল আমান আযমী, ব্যারিস্টার মীর আহমদ বিন কাসেম, সাবেক রাষ্ট্রদূত মারুফ জামান।
কমিশন সদস্যরা জানান, সাবেক প্রধানমন্ত্রী নিজে অনেকগুলো গুমের ক্ষেত্রে সরাসরি নির্দেশদাতা।
তাছাড়া গুমের শিকার ব্যক্তিদের ভারতে রেন্ডিশনের (আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই গোপনে হস্তান্তর) যে তথ্য পাওয়া গেছে তাতে করে এটি স্পষ্ট হয় যে, সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের নির্দেশেই এগুলো হয়েছে।
অক্লান্ত পরিশ্রম ও দৃঢ় মনোবলের জন্য গুম তদন্ত কমিশনের সদস্যদের ধন্যবাদ জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি বলেন, এটি একটি ঐতিহাসিক কাজ। জাতির পক্ষ থেকে আমি এই কমিশনের সকলকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি।
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, বাংলাদেশের সব প্রতিষ্ঠানকে দুমড়ে মুচড়ে দিয়ে গণতন্ত্রের লেবাস পরে মানুষের ওপর কী পৈশাচিক আচরণ করা যেতে পারে, সেটার ডকুমেন্টেশন এই রিপোর্ট।
মানুষ কত নিচে নামতে পারে, কত পৈশাচিক হতে পারে, কত বীভৎস হতে পারে— এটা তার ডকুমেন্টেশন। যারা এই ভয়ংকর ঘটনা ঘটিয়েছে, তারা আমাদের মতোই মানুষ।
নৃশংসতম ঘটনা ঘটিয়ে তারা সমাজে স্বাভাবিক জীবনযাপন করছে। জাতি হিসেবে এই ধরনের নৃশংসতা থেকে আমাদের চিরতরে বের হয়ে আসতে হবে। এই নৃশংসতা যেন আর ফিরতে না পারে, সেই প্রতিকারের পথ খুঁজে বের করতে হবে।
রিপোর্টগুলো সহজ ভাষায় মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে আহ্বান জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা। এ ছাড়া কমিশনকে প্রয়োজনীয় সুপারিশমালা ও ভবিষ্যতের করণীয় পেশ করার বিষয়েও নির্দেশ দেন প্রধান উপদেষ্টা।
এ ছাড়া, আয়নাঘরের পাশাপাশি যেসব জায়গায় বিচারবর্হিভূত হত্যাকাণ্ড ও লাশ গুমের ঘটনা ঘটেছে, সে জায়গাগুলো ম্যাপিং করতে নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা।
প্রধান উপদেষ্টাকে বিশেষভাবে ধন্যবাদ জানান গুম তদন্ত কমিশনের সদস্যরা। প্রধান উপদেষ্টার দৃঢ় অবস্থান ছাড়া এ কাজ সম্পন্ন হতো না উল্লেখ করে তারা বলেন, ‘আপনি দৃঢ় ছিলেন বলেই আমরা পেরেছি। আপনি সবসময় আমাদের যা কিছু প্রয়োজন ছিল সেই সহায়তা দিয়েছেন। আপনিই আমাদের মনোবল দৃঢ় করেছেন।’
ভোরের আকাশ/নি. ব