সৌদি প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য সরকারের জরুরি বার্তা

বিদেশে বাংলাদেশি শ্রমজীবীদের প্রধান গন্তব্যস্থল সৌদি আরব। বর্তমানে প্রায় ৩৫ লাখ বাংলাদেশি কর্মরত আছেন মধ্যপ্রাচ্যের এই দেশটিতে, যাদের কাছ থেকে দেশে আসছে রেমিট্যান্সের বড় একটি অংশ। দেশের বাইরের এই গুরুত্বপূর্ণ শ্রমবাজারে কর্মরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য করণীয় ও বর্জনীয় নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা প্রকাশ করা হয়েছে সরকারের পক্ষ থেকে।
সোমবার (২ নভেম্বর) নিজেদের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে সৌদি প্রবাসীদের জন্য বিস্তারিত দিকনির্দেশনা সংবলিত জরুরি বার্তা প্রকাশ করেছে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়।
সরকারের পক্ষ থেকে সৌদি প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য দেওয়া দিকনির্দেশনাগুলো নিম্নরূপ—
বিদেশ যাত্রার আগে
১। ভিসা, নিয়োগকর্তা ও নিয়োগচুক্তি ভালোভাবে যাচাই করুন।
২। বিএমইটি ছাড়পত্র, প্রশিক্ষণ ও মেডিকেল টেস্ট সম্পন্ন করুন।
৩। পাসপোর্টসহ গুরুত্বপূর্ণ কাগজ দেশে ও নিজ হেফাজতে রাখুন।
৪। দালালের মৌখিক আশ্বাসে টাকা দেবেন না।
৫। ভিজিট ভিসায় কাজের জন্য যাবেন না।
৬। পাসপোর্ট নিয়োগকর্তা বা অন্য কারও কাছে রাখবেন না।
ইকামা ও কাগজপত্র
১। ইকামা সঙ্গে রাখুন ও Absher-এ মেয়াদ চেক করুন।
২। QIWA-তে নিয়োগচুক্তি ও ওয়ার্ক পারমিট যাচাই করুন।
৩। পাসপোর্টের মেয়াদ ৬ মাস বাকি থাকতে নবায়ন বা রিইস্যু করুন।
৪। না বুঝে বা সাদা কাগজে কখনো সই বা টিপসই দেবেন না।
৫। OTP ও পাসওয়ার্ড কাউকে দেবেন না।
৬। ইকামা নবায়ন নিয়োগকর্তার দায়িত্ব, কাউকে টাকা দেবেন না।
চুক্তি, বেতন ও অধিকার
১। নিয়োগচুক্তির কপি ও কাজের প্রমাণ সংরক্ষণ করুন।
২। ব্যাংকিং চ্যানেলে বেতন নিন, স্টেটমেন্ট সংরক্ষণ রাখুন।
৩। সমস্যা হলে মকতব আমল (১৯৯১১) বা দূতাবাসকে জানান।
৪। ‘স্কিল ভিসা’য় বা নিজ নিয়োগকর্তার বাইরে কাজ করবেন না।
৫। নিয়োগকর্তার সঙ্গে বিরোধ হলে কর্মস্থল থেকে পালাবেন না।
৬। কর্মবিরতি, ধর্মঘট বা কাজে বাধা দেবেন না।
চাকরি পরিবর্তন ও দেশে ফেরা
১। QIWA-প্ল্যাটফর্মে বৈধভাবে চাকরি ট্রান্সফার করুন।
২। দেশে ফেরার আগে জরিমানা ও ট্রাভেল ব্যান যাচাই করুন।
৩। দেশে ফেরার আগে মোবাইল সিম ও অ্যাকাউন্ট বন্ধ করুন।
৪। ৪০ হাজার রিয়াল বা এর বেশি নগদ/সোনা কাস্টমসে ঘোষণা করুন।
৫। অনুমোদনের আগে নতুন কাজে যোগ দেবেন না।
৬। ভিসা ইস্যু যাচাই না করে বিমানবন্দরে যাবেন না।
৭। Final Exit ভিসার নির্ধারিত মেয়াদ অতিবাহিত করবেন না।
৮। টাকার বিনিময়ে অন্যের সোনা বা মোবাইল বহন করবেন না।
জনসমক্ষে আচরণ
১। শালীন পোশাক ও ভদ্র আচরণ বজায় রাখুন।
২। লাইনে দাঁড়ান, বয়স্কদের সালাম দিন ও সম্মান করুন।
৩। পুলিশ চাইলে শান্তভাবে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দেখান।
৪। রাস্তায় থুতু, পানের পিক ও ময়লা ফেলবেন না বা প্রস্রাব করবেন না।
৫। প্রকাশ্যে ঝগড়া, গালাগালি, মারামারি করবেন না।
৬। জাতি, দেশ বা গায়ের রং নিয়ে কটূক্তি করবেন না
শিশু, নারী ও প্রতিবেশী
১। অচেনা শিশুকে দূর থেকে সম্বোধন করুন বা সালাম নিন।
২। দৃষ্টি সংযত ও দূরত্ব বজায় রাখুন।
৩। হারানো শিশু পেলে নিরাপত্তাকর্মী বা পুলিশকে জানান।
৪। পুরুষ সদস্যের উপস্থিতিতে বাসায় কাজে প্রবেশ করুন।
৫। অপরিচিত বা প্রতিবেশীর বাড়িতে অনুমতি নিয়ে প্রবেশ করুন।
৬। বাচ্চাদের আদর, স্পর্শ, কোলে নেওয়া বা খাবার দেবেন না।
৭। নারীদের দিকে তাকিয়ে থাকা, পিছু নেওয়া, স্পর্শ করা বা অন্য কোনোভাবে হয়রানি করবেন না।
৮। অচেনা নারীর কাছে নম্বর চাওয়া বা মেসেজ পাঠাবেন না।
৯। মার্কেটে বা পার্কের ফ্যামিলি সেকশনে পুরুষরা একা ঢুকবেন না এবং প্রতিবেশীর বাড়িতে উঁকি দেবেন না।
ধর্ম ও সংস্কৃতি
১। নামাজের সময় কাজ বন্ধ রাখুন ও নামাজ আদায় করুন।
২। রমজানে দিনে প্রকাশ্যে খাওয়া-ধূমপান থেকে বিরত থাকুন।
৩। ডান হাতে খাবার ও জিনিস আদান-প্রদান করুন।
৪। মসজিদে মোবাইল নীরব রাখুন।
৫। ধর্ম, রাজপরিবার বা সরকার নিয়ে মন্তব্য ও পোস্ট করবেন না।
৬। মিছিল, সমাবেশ, ধর্মঘটে যাবেন না।
৭। তাবিজ-কবচ, তন্ত্র-মন্ত্র বা কবিরাজি করবেন না।
৮। মসজিদে কোনো ধর্মীয় সংগঠনের কার্যক্রম চালাবেন না।
ছবি, ভিডিও ও অনলাইন ব্যবহার
১। কোনো খবর শেয়ার করার আগে যাচাই করুন।
২। কঠিন পাসওয়ার্ড ও দুই ধাপের নিরাপত্তা কোড ব্যবহার করুন।
৩। শুধু অফিসিয়াল অ্যাপ ব্যবহার করুন।
৪। ভিপিএন ব্যবহারে বিরত থাকুন।
৫। অনুমতি ছাড়া শিশু, নারী, পরিবারের ছবি তুলবেন না।
৬। গুজব, অশ্লীল ভিডিও বা মিম ফরোয়ার্ড করবেন না।
৭। ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, প্রতিরোধ, আঘাতস্থল, নিরাপত্তা-সংবেদনশীল স্থানের ছবি-ভিডিও গ্রহণ, সংরক্ষণ ও শেয়ার করবেন না
সড়ক ও ট্রাফিক
১। বৈধ লাইসেন্স ও গাড়ির বিমা নিশ্চিত করুন।
২। সিটবেল্ট ও গতিসীমা মেনে চলুন।
৩। দুর্ঘটনায় নাজম ও পুলিশ রিপোর্ট নিন।
৪। ট্রাফিক সাইন অনুসরণ করুন।
৫। লাইসেন্স বা বিমা ছাড়া গাড়ি চালাবেন না।
৬। চালানোর সময় মোবাইল ব্যবহার করবেন না।
৭। ট্রাফিক জরিমানা বকেয়া রাখবেন না।
৮। নিজের গাড়ির দুর্ঘটনার পর ঘটনাস্থল ছেড়ে যাবেন না।
দুর্ঘটনা ও আহত ব্যক্তি
১। দুর্ঘটনা হলে ৯৯৭ (অ্যাম্বুলেন্স) বা ৯১১ ও ৯৯৯-এ ফোন করুন
২। উদ্ধারকারীদের জন্য পথ খালি রাখুন।
৩। সাক্ষী হলে যা দেখেছেন শুধু তা সত্যভাবে বলুন।
৪। প্রাণঝুঁকি না থাকলে আহত ব্যক্তিকে টেনে তুলবেন না।
৫। দুর্ঘটনাস্থলে ভিড় বা ছবি-ভিডিও করবেন না।
৬। আহত বা মৃতের মোবাইল-টাকায় হাত দেবেন না।
অর্থ, ঋণ ও সঞ্চয়
১। শুধু ব্যাংক ও অনুমোদিত এক্সচেঞ্জে টাকা পাঠান।
২। প্রতি মাসে কিছু সঞ্চয় করুন।
৩। বিল ও ঋণ সময়মতো পরিশোধ করুন।
৪। অনুমোদিত সিলিংয়ের (সীমা) মধ্যে টাকা পাঠান।
৫। হুন্ডিতে টাকা পাঠাবেন না।
৬। নিজের সিম, কার্ড বা অ্যাকাউন্ট অন্যকে দেবেন না।
৭। অন্যের ঋণের জামিনদার হবেন না।
৮। অন্যের নামে ব্যবসা করবেন না।
কমিউনিটি ও ক্যাম্প জীবন
১। কমিউনিটির সঙ্গে সদ্ভাব রাখুন, দেশের সুনাম অক্ষুণ্ণ রাখুন।
২। অনুষ্ঠান বা সভার আগে অনুমতির নিয়ম জেনে নিন।
৩। ময়লা নির্দিষ্ট স্থানে ফেলুন, অন্যের পথ আটকে পার্কিং নয়।
৪। অনুমতি ছাড়া চাঁদা বা অর্থ সংগ্রহ করবেন না।
৫। ব্যাচেলর ক্যাম্প বা বাসায় নারী অতিথি আনবেন না।
৬। আতশবাজি ফোটাবেন না, গাছ কাটবেন না ও শিকার করবেন না।
ওষুধ ও মাদক
১। দেশ থেকে ওষুধ নিয়ে আসতে SFDA-এর অনুমতি নিন।
২। ওষুধের প্রেসক্রিপশন ও মূল প্যাকেট সঙ্গে রাখুন।
৩। SFDA-এর অনুমতির লিংক https://cds.sfda.gov.sa
৪। অন্যের দেওয়া প্যাকেট, ব্যাগ ও ওষুধ বহন করবেন না।
৫। মদ ও জুয়া থেকে দূরে থাকুন। মাদকে মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত হতে পারে।
৬। প্রেসক্রিপশন বহির্ভূত ও অতিরিক্ত পরিমাণে ওষুধ আনবেন না।
স্বাস্থ্য ও কর্মস্থলের নিরাপত্তা
১। গরমের সময় প্রচুর পানি পান করুন ও গরমে ছায়ায় বিশ্রাম নিন।
২। হেলমেট, সেফটি বেল্ট ও সুরক্ষাসামগ্রী ব্যবহার করুন।
৩। বিদ্যুৎ ও অগ্নি নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করুন।
৪। ১৫ জুন থেকে ১৫ সেপ্টেম্বর দুপুর ১২টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত রোদে কাজ করবেন না।
৫। বন্ধ ঘরে চুলা জ্বালিয়ে ঘুমাবেন না।
৬। বৈদ্যুতিক লাইন বা সকেটে ধারণক্ষমতার বেশি লোড দেবেন না।
উমরাহ-হজ, পরিবার ও বিয়ে
১। নুসুক অ্যাপে অনুমতি নিয়ে উমরাহ-হজ ও জিয়ারাহ করুন।
২। বিয়ে আইনসম্মতভাবে নিবন্ধন করুন।
৩। সন্তানের জন্মনিবন্ধন করুন।
৪। অনুমতি ছাড়া হজ করবেন না বা হাজি বহন করবেন না।
৫। গোপন বা নিবন্ধনহীন বিয়ে করবেন না।
৬। বিয়ে বহির্ভূত সম্পর্কে জড়াবেন না।
বিপদে পড়লে
১। জরুরি অবস্থায় ৯১১ ও ৯৯৯ নম্বরে ফোন করুন।
২। দূতাবাসের শ্রমকল্যাণ উইংয়ে যোগাযোগ করুন।
৩। প্রয়োজনে দূতাবাসের অনুবাদ ও আইনি সহায়তা নিন।
৪। না বুঝে আরবি কাগজে সই করবেন না।
৫। পুলিশের সঙ্গে তর্ক ও ঝগড়ায় লিপ্ত হবেন না।
৬। সমস্যা সমাধানের জন্য কোনো দালালকে টাকা দেবেন না।
জরুরি নম্বর
৯১১ (রিয়াদ, মক্কা, মদিনা ও পূর্বাঞ্চল)। ৯৯৯ (অন্যান্য অঞ্চল)। অ্যাম্বুলেন্স ৯৯৭। অগ্নি ৯৯৮। ট্রাফিক ৯৯৩। শ্রম অভিযোগ ১৯৯১১। দূতাবাসের শ্রমকল্যাণ ৮০০১০০০১২৫, কনস্যুলার ৮০০১০০০১২৬। প্রবাসবন্ধু ১৬১৩৫।
পরিশেষে বিজ্ঞপ্তিতে সৌদি প্রবাসীদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলা হয়েছে, বৈধভাবে থাকুন, আইন মেনে চলুন, লেনদেনে প্রমাণ রাখুন, বিপদে একা সিদ্ধান্ত না নিয়ে দূতাবাস ও কর্তৃপক্ষের সাহায্য নিন।
ভোরের আকাশ/এনএস